নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজিবি) সৌদি আরবফেরত এক শীর্ষ নেতাসহ তিনজনকে রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার নিকুঞ্জ-২-এর বড় মসজিদসংলগ্ন মাঠ থেকে গত বুধবার তাদের গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে তাদের চার দিনের রিমান্ডেও নিয়েছে সিটিটিসি। গ্রেপ্তার তিনজন হলেন মো. আতিকুল্লাহ ওরফে আসাদুল্লাহ ওরফে
জুলফিকার (৪৯), মো. বোরহান উদ্দীন রাব্বানী (৪২) ও নাজিমউদ্দিন ওরফে শামীম (৪৩)। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা সংগঠনের কর্মকাÐ নিয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ তথ্য দিয়েছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার (পুলিশ সুপার পদোন্নতিপ্রাপ্ত) সাইফুল ইসলাম।
সিটিটিসির অন্য এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আতিকুল্লাহ আফগানফেরত যোদ্ধা ও বোমা বিশেষজ্ঞ। তার বিরুদ্ধে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি আরও জানান, ১৯৯৬ সালে হুজিবির শীর্ষ নেতা গোপালগঞ্জের আবদুল হান্নান ওরফে মুফতি হান্নান যে কমিটি করেছিলেন সেই কমিটির সাংগাঠনিক সম্পাদক ছিলেন আতিকুল্লাহ। ১৯৯৭ সালে তিনি পাকিস্তান যান। সেখানে ১৫ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেন। পরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থেকে আফগানিস্তানে যুদ্ধ করার জন্য ১৫ সদস্যের একটি দল পাঠানো হয়, সেই দলের সদস্য হিসেবে আতিকুল্লাহ আফগানিস্তানের কান্দাহারে গিয়ে তালেবানের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ করার সময় তিনি পায়ে আঘাত পাওয়ার পর কাবুলে ফিরে যান। সেখানে এক রাতের জন্য ওসামা বিন লাদেন, মোল্লা ওমর ও আয়মন আল জাওয়াহিরির ‘মেহমান’ হিসেবে থাকার সুযোগ পান। তাদের সঙ্গে তার বৈঠকও হয়েছিল। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, পরে ২০০৭ সালে তত্ত¡াবধায়ক সরকার আমলে তিনি দুবাই হয়ে সৌদি আরবে গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। সেখান থেকে সাংগঠনিক কাজে একাধিকবার পাকিস্তান যান।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তানি ও আফগান জঙ্গিদের কায়দায় খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটানো আবদুল হান্নান ওরফে মুফতি হান্নান ও তার দুই সহযোগীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে ২০১৭ সালে সিলেটে গ্রেনেড হামলা মামলায়। হান্নান ও তার দলের জঙ্গিরা ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ওই গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে। এর আগে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ওই বোমা হামলায় জঙ্গি সুজনসহ ১০ জন নিহত হন। এ ঘটনায় দায়ের মামলায় মুফতি হান্নানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বলা হয়, বিশ শতকের শেষ বছর যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে হরকাতুল জিহাদের বোমা হামলার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার সূচনা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাসহ হরকাতুল জিহাদের ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যার পেছনে মূল ব্যক্তি হিসেবে মুফতি হান্নানকে দায়ী করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের জেলা গোপালগঞ্জেই মুফতি হান্নানের বাড়ি। পাকিস্তানের মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে তার জঙ্গিবাদে হাতেখড়ি। আফগানিস্তান সীমান্তে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
সিটিটিসি সূত্র আরও জানায়, দীর্ঘদিন বিদেশে আত্মগোপনে থেকে গত মার্চ মাসে বাংলাদেশে ফিরে আসেন মুফতি হান্নানের আস্থাভাজন আতিকুল্লাহ। এসেই সংগঠনের পুরনো সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। পাশাপাশি কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের জামিনের মাধ্যমে বাইরে বের করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছিলেন। এছাড়া নতুন সদস্য সংগ্রহ করে সংগঠনের কার্যক্রম চালুর চেষ্টা করছিলেন। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড জোরদারের জন্য তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে সফর করেন এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়েছেন। পাকিস্তান, দুবাই ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার শামীম ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি এবং রাব্বানী ফেনী জেলার দায়িত্বশীল নেতা। তারা তিনজন কাশ্মীর ইস্যু ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সদস্য সংগ্রহের কাজ করছিলেন।