ধনবান ক্যাসিনো পরিচালকদের একজনের কুড়ি কিংবা একুশটি বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টের খবর বেরিয়েছে। তিনি ভাগ্যবান, নিজ মালিকানাধীন যেকোনো একটি বাড়ির ঠিকানা তিনি স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তার পিতা বা পিতামহকে পথের ভিখারি মনে করা ঠিক হবে না। আগে যদি থেকেও থাকেন এমন গুণধর পুত্র ও দৌহিত্র পিতা ও পিতামহকে ভিটেবাড়ি কিনে তাতে এমনকি প্রাসাদ তৈরি করে দিলে সেটিও স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন। ভীষণ ব্যতিক্রম বনখেকো ওসমান গনি। যাদের হাতে তার উত্থান, ওসমান গনির বখরা পেয়ে তারা স্থায়ী ঠিকানার অধিকারী হলেও তার মায়ের দৈন্যদশার ছবি গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের ১৬৩ দশমিক ০৫ মিলিয়ন মানুষের (২০১৯ সালের একটি অনুমিত হিসাব) অধিকাংশেরই বাস গ্রামবাংলায়। কেবল ঢাকা শহরের ২০ দশমিক ৬২৮ মিলিয়ন (২ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার) মানুষের কজনের, সিকি ভাগেরও কি স্থায়ী ঠিকানা আছে?
অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেও সঠিক পরিসংখ্যানটি আমি বের করতে পারিনি। ঢাকার বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। বস্তি কি স্থায়ী ঠিকানা? জন্মনিবন্ধন ফরম থেকে শুরু করে পাসপোর্ট ফরম প্রতিটিতেই স্থায়ী ঠিকানা চাওয়া হয়েছে। চাকরি-বাকরি থেকে প্রায় সর্বত্রই স্থায়ী ঠিকানার দৌরাত্ম্য। যেখানে অস্থায়ী ঠিকানাও অনেকের নেই, সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাই তো তখন বড় ভরসা :
ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু
ঠিকানার সন্ধান
আজও পাও নি? দুঃখ যে দিলে করব না অভিমান
ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু
পথে পথে বাস করি
কখনো গাছের তলাতে
কখনো পর্ণকুটির গড়ি
...
বন্ধু ঘরের খোঁজে পাই নাকো পথ
তাইতো পথের নুড়িতে গড়ব
মজবুত ইমারত।
আদ্যনাথের মেমোর ঠিকানা পাবার পথ বাতলে দিয়েছেন সুকুমার রায় :
ঠিকানা চাও? বলছি শোন, আমড়াতলার মোড়ে
তিনমুখো তিন রাস্তা গেছে তারি একটা ধরে
চলবে সিধে নাক বরাবর ডানদিকে চোখ রেখে
চলতে চলতে দেখবে লোকে রাস্তা গেছে বেঁকে।
দেখতে সেথায় ডাইনে বাঁয়ে পথ গিয়েছে কত
তারি ভেতর ঘুরবে খানিক গোলকধাঁধার মত।
সুকুমার রায় এখানেই থামেননি, আরও অনেক ঘুরিয়ে আবারও আমড়াতলার মোড় ছুঁইয়ে যেখানে খুশি সেখানে যেতে বলেছেন। আমরা অনেকেই আদ্যনাথের চেয়ে ভালো অবস্থায় নেই।
২. আমি এক সময় ভাগ্যবান স্থায়ী ঠিকানাধারীদের একজন ছিলাম। পিতামহের স্থায়ী বাসস্থান ছিল, পিতামাতারও একটি স্থায়ী শহুরে আবাসন ছিল। পিতামহের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত ছিলই না। পিতামাতার ঠিকানাই স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে সব ধরনের ফরম ও দলিল-দস্তাবেজে ব্যবহার করতে থাকি। এক যুগ আগে এই শহুরে আবাসনটি বিক্রি হয়ে যাওয়ায় আমরা স্থায়ী ঠিকানাবিহীন হয়ে পড়ি। পরবর্তী সময়টি অতিবাহিত হয় ভাড়াবাড়িতে কিংবা সরকারি কোয়ার্টারে। স্থায়ী ঠিকানার ঘরে ‘নেই’ লেখার পর সংকট শুরু হয়। আমার এই সন্তানের জন্মের সে সনদ ডাক্তার দিয়েছেন তাতে যথাযথভাবেই পূর্বতন ঠিকানা ব্যবহার করি। কিন্তু যখন সিটি করপোরেশন প্রদত্ত প্রকৃত আইনসম্মত সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে যাই ‘নেই’ লেখার সমস্যায় পড়ে যাই। কর্মকর্তা বললেন, কম্পিউটার এমনভাবে প্রোগ্রাম করা স্থায়ী ঠিকানার ঘর খালি থাকলে বা নেই লিখলে কোনো আউটপুটই বের হবে না। কিন্তু তাদের জন্মসনদ আমাকে পেতেই হবে, নতুবা পরীক্ষায় বসতে পারবে না। কর্মকর্তাই পরামর্শ দিলেন, একটা ঠিকানা বসিয়ে দিন, এখন থেকে তো কেউ আর চেক করতে যাচ্ছে না, সমস্যা হবে না। শেষ পর্যন্ত তিনিই সদয় হয়ে চিকিৎসকের দেওয়া জন্মসনদের ঠিকানাটাই বসিয়ে দেন, যদিও সে ঠিকানার ন্যূনতম দাবিদার হওয়ার সুযোগ নেই।
জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানকালে আমার তখনকার বর্তমান ঠিকানা সরকারি আবাসনে হলেও, এটিই তাতে উঠে এসেছে। পাসপোর্ট নবায়নের সময় স্থায়ী ঠিকানার কলাম শূন্য রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে জমা দিই। এখানে সদয় কর্মকর্তা বললেন, পুরনো পাসপোর্টের ঠিকানাটাই রাখুন তাতে ঝামেলা কম হবে। স্থায়ী ঠিকানা বদলালে পুনরায় পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন লাগবে। কিন্তু পুরনোটি রাখা পুরোপুরি অনৈতিক হবে মনে করে স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানাই বসিয়ে দিলাম এবং নবায়িত পাসপোর্টও পেলাম। কার্যত আমার এখন কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। কিন্তু কম্পিউটার গ্রহণ করছে না, আউটপুট নিচ্ছে না, এসব কারণে কিছুটা মিথ্যাচারে বাধ্য হচ্ছি।
২০১৩ সালে বিশ্ব বসতি দিবসে সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখেছি ঢাকায় ৪৪ ভাগ নাগরিক গৃহহীন, এদের ৩৫ ভাগ বস্তিবাসী আর ৮ থেকে ৯ ভাগ ভাসমান রাস্তায়, রেললাইনের পাশে কিংবা পার্কে রাত কাটান। এ অবস্থায় রাতারাতি জাদুকরি পরিবর্তন আশা করছি না; কিন্তু স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে যে সমস্যা সেটা থেকে উত্তরণ হোক এটা তো আশা করতে পারি।
স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় কনস্টেবল পদের সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি কুলাউড়া আর কমলগঞ্জের দুই তরুণ কলিম এবং রাজু। মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যানও বলেছেন এটা স্পষ্টত মানবাধিকার লঙ্ঘন। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় চাকরি পাননি ময়মনসিংহের এক নারী শ্রাবণী দত্ত। স্থায়ী ঠিকানার আইনি ব্যাখ্যাটি স্পষ্ট : নিজের বা পিতা কিংবা পিতামহের স্থাবর সম্পত্তির ঠিকানাই হবে স্থায়ী ঠিকানা। এক বা দু পুরুষ নয়, তিন-চার পুরুষ ধরেও যে ঠিকানাহীন গৃহহীন মানুষ রয়েছে তা সম্ভবত রাষ্ট্রের বিবেচনায় নেই। কেবল বাংলাদেশে নয়, প্রতিবেশী ভারতের স্থায়ী ঠিকানার অভাবে বৈষম্যের ঘটনা ঘটছে। তবে ভারতে সহজীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অনুমোদিত কার্ডের লিখিত ঠিকানাই স্থায়ী ঠিকানা বিবেচনা করা হচ্ছে।
‘স্থায়ী ঠিকানার আনন্দ’ বিজ্ঞাপনে এ কথা লিখে ডেভেলপার ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা যাদের উৎসাহিত করতে পারছেন, তাদের অনেকেরই ঠিকানা আছে। কিন্তু ঠিকানাহীন ‘ঠিকানা কেনার মতো সম্বলহীন’ মানুষের জন্য এই বিজ্ঞাপন আসলে বেদনার। এই বেদনা লাঘবের জন্য এবং বাধ্য হয়ে স্থায়ী ঠিকানা বলতে গিয়ে কম-বেশি মিথ্যাচার করতে হচ্ছে তাদের সহায়তা করতে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় কর্ম থেকে ‘স্থায়ী ঠিকানা’ বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে অনুরোধ করছি। বর্তমান ঠিকানার সঙ্গে সর্বোচ্চ পূর্ববর্তী পাঁচ বছর একজন নাগরিক কোন কোন ঠিকানায় ছিলেন এটুকু জানাই সরকার ও রাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট।
বিখ্যাত দার্শনিক ডায়োজেনিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪১২-৩২৩ অব্দ) গ্রিসের করিন্থ শহরে একটি পরিত্যক্ত মদের পিপেতে বাস করতেন। তিনি আলেকজান্ডারকেও ধমক দিয়ে তার সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সে আমলে ডায়োজেনিসকে কোনো ফরম পূরণ করে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় সেবা গ্রহণ করতে হয়নি। একালের দার্শনিককে ফরম পূরণ করতে হয়, ঠিকানা বসাতে হয়। ছড়ায় সেই বৃদ্ধা বাস করতেন জুতোর ভেতর দেয়ার ওয়াজ অ্যান ওল্ড লেডি হু লিভড ইন অ্যা শু। পিপে কিংবা জুতো ঠিকানায় বসানোর সুযোগ নেই।
যেখানে শত শত মিয়ানমার নাগরিক বাংলাদেশের ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র-পাসপোর্ট ইত্যাদি পেয়ে যাচ্ছেন, সেদিকটায় বরং জোর নজরদারি দরকার এ দেশের ভ‚মিহীন, গৃহহীন, ভাড়াটে, অসমর্থ, দরিদ্রজন এবং স্থায়ী ঠিকানাহীন কিন্তু সমর্থ নাগরিক অবশ্যই রেহাই পেতে পারেন।
আবারও স্পষ্ট করে বলি : সব ধরনের ফরমে আবেদনকারীর স্থায়ী ঠিকানার কলামটি বিলুপ্ত হোক।
লেখক
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট