ছেলেবেলার দুর্গা বড়বেলার দুর্গা

এখন বিকেল হবে হবে করছে। একটু আগে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। অদ্ভুত সুন্দর এক আলো সারা আকাশ জুড়ে। লোকে এই আলোকেই বলে কনে দেখা আলো। ঢাকের শব্দে মনে পড়ে যাচ্ছে আজ পুজো শুরু। পুজো আর যাই করুক না করুক কীভাবে যেন ছোটবেলাটাকে ফিরিয়ে দেয়। থাকতাম এক মফস্বল শহরে। তখনো তার গা থেকে গ্রাম গ্রাম গন্ধটা যায়নি।

তখন পুজোর বৈভব ছিল না। আন্তরিকতা ছিল। মাইকে বাংলা গান ভেসে আসত। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, মান্না দে সব মিলিয়ে কৈশোর বেলায় ধর্ম নয়, উৎসবের আনন্দে পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই বেশ একটা উত্তেজনা অনুভব করতাম। বন্ধুরা অনেকেই নতুন নতুন জামা জুতো কিনে দেখাত। আমি একটু দুশ্চিন্তায় থাকতাম জামাটামা আদৌ হবে কিনা তাই নিয়ে। মায়ের মুখে অস্পষ্ট একটা ছায়া ঠিক টের পেতাম। নিজের জন্য নয়, মা আসলে মন খারাপ করতেন বাবা আর আমার নতুন পোশাক হবে কিনা তা ভেবে। বাবা ছিলেন বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া পূরণ না হলে বাড়ির লোকজন কোনো কিছু কিনবে না, এই ছিল তার মনোভাব। মা একটু গজগজ করলেও বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন ।

সত্যি কথা বলতে কি ওই ছোট বয়সে আমিও কেমন বুঝে গিয়েছিলাম যে আনন্দ উৎসবেরও শ্রেণিবৈষম্য আছে। এখন যেমন লিখছি তখন ঠিক অতটা স্পষ্ট বুঝতাম না। কিন্তু এটা মনে হতো টাকা থাকা না থাকা সমাজে মানুষে মানুষে পার্থক্য তৈরি করে। বন্ধুবান্ধব সেজেগুজে প্যান্ডেলে যাচ্ছে। আমি বসে আছি বাবা কোনো সুখবর আনবেন সেই আশায়। পুজো শুরুর আগের সন্ধ্যায়, প্রায় প্রতি বছর বাবা আসতেন মালিকপক্ষকে দাবি মানাতে বাধ্য করে। মুখে বিজয়ীর হাসি। মার মুখেও স্বস্তি। পরের দিন বাজারে গিয়ে নতুন জামাকাপড় কেনার মধ্য দিয়ে এক বৃত্ত সম্পূর্ণ হতো।

পুজো এখন বড় ইভেন্ট। পুজো আসার অনেক আগেই জানতে পারি তিনি আসছেন। টিভিতে ঘোষণা হতে থাকে যে পুজো এই এলো বলে। রাস্তায় কোথাও কোথাও ঢল নামে কেনাকাটার। হাউসিং এর পুজোতেও চলে প্রতিযোগিতা।

এখন কলকাতার দুর্গাপুজো একাধারে করপোরেট অন্যদিকে আবার রাজনৈতিক হাতিয়ার। বিভিন্ন পুজোম-পে সেলিব্রিটি বিচারক আসেন সেরা পুজো বাছতে। কোনটা সেরা ম-প, শ্রেষ্ঠ প্রতিমা, কোনটা সেরা অসুর। সব উপলক্ষ মাত্র। আসলে বিজ্ঞাপনের, প্রোডাক্ট বিপণনের কৌশল। পুজো এখানে সর্বজনের কাছে পৌঁছে যাওয়ার মাধ্যম। এই একই কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও চলে নিজের নিজের দলীয় কর্মসূচি প্রচারের জন্য পুজোর দিনগুলো বেছে নেওয়া। অধিকাংশ বড় বারোয়ারি পুজো এখন শাসক ঘনিষ্ঠ নেতাদের দখলে। আগে যে পুজো নিয়ন্ত্রণ করত সিপিএম, এখন তা তৃণমূলের। বিজেপি এবার রে রে করে দখল রাজনীতিতে নেমে পড়েছে।

কলকাতায় এলেই শুনতে পাবেন ওটা অমুক দাদার আর এটা তমুক দাদার। শহরের রাস্তা বন্ধ করে প্যান্ডেল। বলার নেই। দাদা আছেন পেছনে। একঘণ্টার পথে যেতে পাঁচ ঘণ্টা লাগছে। অ্যাম্বুলেন্সও রোগী নিয়ে জ্যাম জটে দাঁড়িয়ে। কিন্তু কিস্যু বলার নেই। দাদার পুজো যে। কোটি কোটি টাকার বাজেট লগ্নি হচ্ছে দাদাদের পুজোয়।

একটা সময় ছিল যখন পুজোর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন জমিদার জোতদারেরা। বস্তুত অবিভক্ত বাংলায় সবচেয়ে প্রাচীন বারোয়ারি পুজো প্রচলন করেছিলেন তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। ৫০০ বছরের সেই আদি পুজো দেখতে একবার সস্ত্রীক গেছিলাম পুটিয়ার কাছে তাহিরপুরে। কংসনারায়ণ বছরে দুবার মোটে তাহিরপুরের জমিদারি দেখতে আসতেন। দোলের দিন। আর এই দুর্গাপুজোয়। এসে প্রথম দেখা করতেন খাজান্জিবাবুর সঙ্গে। সারা বছর কতটা খাজনা আদায় হয়েছে খোঁজখবর নিতে। প্রজাদের অধিকাংশ গরিব মুসলিম ও নিম্নবর্গের হিন্দু। তাদের কষ্টার্জিত অর্থে উৎসবের বান ডাকত গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ এলাকায়। তাহেরপুরের মতোই কমবেশি পুব বাংলার ছবি ছিল এক। জমিদারদের অনেকেই সারা বছর থাকতেন কলকাতায়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গে বিরোধিতা করেছিলেন বর্ণ হিন্দুদের এই অংশ। নিজেদের রাজস্ব হারানোর ভয়ে। পরবর্তী সময়ে, ১৯৪৭-এ তারাই আবার বাংলা ভাগ সমর্থন করেছিল। মুসলমান আধিপত্য মেনে নিতে হবে এই আশঙ্কায়।

কলকাতা এখন তুমুলভাবে মাতোয়ারা পুজো নিয়ে। টিভিতে মূল খবর একটাই-পুজো। অথচ এবারের মতো অর্থনৈতিক মন্দা কোনোদিন আমরা দেখিনি। তেল পেট্রল ডিজেল রান্নার গ্যাসের দাম প্রায় রোজ বাড়ছে। দর্জি মহল্লায় বিষাদের ছায়া। জরি ও সোনা শিল্পের হাল খারাপ। সংগঠিত অনেক শিল্পেই ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা প্রবল। তবু পশ্চিমবঙ্গ মেতে আছে পুজো নিয়ে। যতই শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হোক না কেন কলকাতায় পুজোর রমরমা শুরু হয়েছে ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে লর্ড ক্লাইভের বাহিনীর কাছে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার হারের পরে। যখন শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব ধুমধাম করে নিজের প্রাসাদে পুজো করলেন। সেখানে নিমন্ত্রিত হয়ে সপার্ষদ এলেন ক্লাইভ। তখনো তিনি লর্ড শিরোপা পাননি। বাংলায় জন্ম নিল নতুন এক মুৎসুদ্দি পুঁজির। বস্তুত এই পুঁজিই নানা চেহারায় আজকের আধুনিক নব্য বাবু বিলাসের জন্ম দিয়েছে। সংস্কৃতিবিহীন এই পুজোয় বৈভব বেশি। আন্তরিকতা কম।

এখানে দর্শক মোটের ওপর তিন ধরনের। প্রথম গোষ্ঠী সচ্ছল মধ্যবিত্ত। তারা একটু সকাল সকাল যান। জ্যাম জট এড়াতে। তাছাড়া বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি পার্ক করা মুশকিল এটাও একটা কারণ। এনারা মূলত যান ইতিমধ্যেই যে পুজো প্রাইজটাইজ পেয়েছে বা সংবাদমাধ্যমে তারকা পুজো বলে স্বীকৃতি পেয়েছে সেগুলোয়। এই যেমন একডালিয়া এভারগ্রিন, সুরুচি সংঘ, চেতলা অগ্রণী বা শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব ইত্যাদি। প্রত্যেক পুজোর পেছনে শাসক দলের নেতা মন্ত্রী সরাসরি যুক্ত। মধ্য ও উচ্চবিত্তের লোকজন সপরিবারে সেখানে যান। এবং সেলফি তোলেন। ভাবটা আমরা হাবিজাবি মন্ডপে গিয়ে সময় নষ্ট করি না। এই শ্রেণি আবার ঈষৎ আস্তে ঠাকুরের মূর্তির সৌন্দর্য, প্যান্ডেলের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করেন। এরা প্রাচীন বারোয়ারি পুজোয় ভিড় করেন। বাগবাজার ১০০ বছরের পুরনো। সেখানে যাওয়া একধরনের স্ট্যাটাস সিম্বলও বটে। আজকাল কলকাতায় ফ্যাশন হচ্ছে বনেদি বাড়ির ঠাকুর দর্শন। শোভাবাজারের দেব বাড়িতে যাওয়া উচ্চবিত্ত শ্রেণির অবশ্য কর্তব্য। সম্ভবত এ এক নস্টালজিয়া। আহ, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম। কঠিন বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে অতীতে ডুব দেওয়া।

দ্বিতীয় ধারার দর্শক মূলত গ্রাম মফস্বলের। লোকাল ট্রেনে করে এসে বিকেল বিকেল কলকাতায় এসে সারা রাত ঠাকুর দেখে ভোর ভোর ফিরে যাওয়া। এরা অধিকাংশই নিম্নবিত্তের। স্বভাবে, নবারুণ ভট্টাচার্য যারা পড়েছেন তারা বুঝবেন, একদম ফ্যাতাড়ুর মতো। কথাবার্তা, আচরণে সামান্য হিংস্র। দলবেঁধে মন্ডপে ঘুরতে ঘুরতে রাস্তায় নেমে অস্থায়ী স্টলে চা ঘুগনি ডিমভাজা খেয়ে এরা এক একজন মিঠুন চক্রবর্তী, অজয় দেবগন বা অক্ষয় কুমার হয়ে যান। অন্তত মনে মনে। আর একদল আছেন যারা প্যান্ডেলে যান বা না যান লাইন দিয়ে ভালো কোনো রেঁস্তোরায় তাদের খাওয়া চাই-ই চাই। রাত যত বাড়ে তত বাড়তে থাকে ভিড়। উন্মাদনাও। পুজোর ভিড়ে জন্ম নেয় কত নতুন প্রেম। আবার তা কিছুদিন পর ভেঙেও যায়। বয়স্ক দম্পতি মনে মনে ভাবেন আগামী বছর এরকম একসঙ্গে স্বামী স্ত্রী প্যান্ডেলে আসতে পারব তো! পুজোর সময়টুকু একধরনের মুক্তির বার্তা বয়ে আনে। গতানুগতিক দিন যাপন থেকে সাধারণ মানুষ কিছুটা মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নিতে পারেন, এটুকুই যা বাঙালির তথাকথিত শ্রেষ্ঠ উৎসবের পাওয়া।

লেখক

ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

datidersoumitra786@gmail.com