বিলম্ব হলেও সরকার দ্রুত জুয়াড়িদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটা খুবই আনন্দের কথা। যদিও জনগণ প্রতিদিনই চোখ রাখছে যে কোথায় গিয়ে এর শেষ হয়। জনগণ আশঙ্কা করেছিল সম্রাটকে ধরা হবে না। কিন্তু সেটাও মিথ্যে বলে প্রমাণিত হলো। সম্রাট ধরা পড়েছে। ঢাকা শহরকেন্দ্রিক জুয়ার সঙ্গে যুক্ত যারা তারা ধরা পড়ছেন যদিও আরও অনেক রাঘব-বোয়াল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এতো গেল ঢাকার বিষয়। ঢাকার বাইরে গ্রামাঞ্চলে ক্রিকেটকে ঘিরে নিম্নবিত্ত মানুষদের একটা সর্বগ্রাসী জুয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। শোনা যায় ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কায় এই জুয়া আরও জনপ্রিয়। টেলিভিশন সেটের সামনে বসে গ্রামবাংলার চায়ের দোকানে দেখা যায় জুয়াড়িদের রমরমা আসর বসেছে। সেখানে প্রতিটি বলে বলে জুয়া হচ্ছে এবং অনেক পরিবারই সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। গত দুই ঈদে গ্রামবাংলার জামা-কাপড়ের ব্যবসায়ীদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তাদের ব্যবসায় মন্দার কারণ ক্রিকেট জুয়া। এই ক্রিকেট জুয়া বড় বড় শহরেও চালু আছে। বড় জুয়াড়িরা একেবারে খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং দেখা যায় খেলোয়াড়রা এই জুয়াড়িদের ফাঁদে পড়ে খেলায় অনেক বড় বড় অপরাধ করে বসে। যেহেতু দেশে সামাজিক শাসন অনুপস্থিত তাই গ্রামবাংলা এইসব জুয়াড়িদের জন্য একেবারে অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে নানা সময়ে অভিযান করে থাকে, কিন্তু কোন পথে যে মাদক চলে আসে তা বলা মুশকিল। মাদক এবং জুয়া গ্রামবাংলায় একেবারে সমার্থক হয়ে উঠেছে। একটি যেন আরেকটির ভাই। জুয়ায় লাভ হলে মাদক কেনে, জুয়ায় লোকসান দিলেও মাদক কেনে। আসলে জুয়া একটি প্রবণতা, মানুষের দ্রুত ভাগ্য উন্নয়নের প্রচেষ্টা। এই প্রচেষ্টাতে সাফল্যের চাইতে ব্যর্থতাই বেশি।
তবুও মহাভারতে যেমন সত্যবান যুধিষ্ঠির পাশা খেলতে গিয়ে তার স্ত্রী দ্রৌপদীকে হারান, শুধু দ্রৌপদীকে নয় সবকিছুই হারান। তেমনি অনেক রাজা-জমিদারও তার সম্পত্তি-অর্থ বিলিয়ে দেয় জুয়া ও মাদকের পেছনে। যে কারণে সমাজে যুগ যুগ ধরে জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। এইসব লোককে সামাজিকভাবে ঘৃণা এবং নানান ধরনের আইনকানুন তৈরি করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় জায়গাটি ছিল সমাজ। আমরা ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি কোথাও কোনো গাছের নিচে অথবা দোকানের পেছনে তাসের জুয়া খেলা হতো। যদি গ্রামের কোনো মুরব্বি কাছাকাছি চলে আসে তাহলে জুয়াড়িরা একযোগে দৌড়ে পালাত। যদি কেউ জুয়াড়ি হিসেবে চিহ্নিত হয় তবে তার কাছে কারও মেয়ে বিয়ে দেওয়া অথবা তার সন্তান-সন্ততির ক্ষেত্রেও একধরনের অবরোধ গড়ে উঠত। কিন্তু সমাজে দুর্বৃত্তায়ন হওয়ার ফলে এসব আর কোনোভাবেই হচ্ছে না। বরং অবৈধভাবে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সমাজে শ্রদ্ধাভাজন হয়ে পড়েছে। এটাই হয়েছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। সমাজ যদি ভেঙে না যেত তাহলে একটা স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে উঠত। সামাজিক শাসনের জায়গাটি এখন দখল করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক। এই বাহিনীর লোকদের মধ্যেই সরষের ভেতর ভূত থাকার বিষয়টি জায়গা করেছে। ফলে কোথাও কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। যেসব দেশে এসব নিষিদ্ধ সেসব দেশে প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ থাকলেও গোপনে নানাভাবে এর কাজকর্ম চলতে থাকে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে মদ জুয়া নিষিদ্ধ থাকলেও গোপনে এসব বেচাকেনা চলতেই থাকে। তাতে লাভ হয় যারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের। কিন্তু ক্ষতি হয় সরকারের কারণ সে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
দেখা গেছে যেসব ক্যাসিনোতে জুয়া খেলা হচ্ছে তার সঙ্গে মদেরও একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। বিদেশের যেকোনো ক্যাসিনোতে বিনামূল্যে মদ সরবরাহ করা হয়। এর কারণ হচ্ছে মদ খাওয়া বেসামাল লোকগুলো অতিদ্রুত লাভ-লোকসান বিবেচনা না করেই ঝুঁকে পড়বে জুয়ায়। এমনও জানা গেছে বাংলাদেশের জুয়াড়িরা নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে, ইংল্যান্ড, আমেরিকায় একরাতে পাঁচকোটি টাকা লোকসান দেয়। তাদের জন্য বিনা অর্থে বিমানে যাতায়াত, পাঁচতারা হোটেলে রাত্রিযাপন এবং মার্সিডিজ গাড়িতে যাতায়াতের ব্যবস্থাও করা হয়। পাঁচ কোটি টাকা হেরে যাওয়া বুকের পাটা যাদের আছে তাদের কী পরিমাণ অবৈধ অর্থ আছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু যারা বৈধ অর্থের মালিক সারা মাস চাকরি-বাকরি করে বৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করেন তারাও যে জুয়া খেলেন না, তাও নয়। তবে তাদের খেলার দৌড় শতকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অন্যদিকে অবৈধ অর্থ উপার্জনকারীদের অবলীলায় প্রতি রাতে লক্ষ লক্ষ টাকা জুয়া খেলতেও দ্বিধা নেই। তাদের কাছে জুয়া কোনো হারজিতের ব্যাপার নয়, জুয়া একটি ভালোবাসার নাম। ভাগ্যের খেলা সব জায়গায় আছে। এ মানুষের আদিম প্রবণতা। ব্যবসা-বাণিজ্য, সৃজনশীল কাজ জীবনের উন্নতি-অবনতি অনেকটাই জুয়ার। কিন্তু সেই জুয়া নিয়তি নয়। তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে অর্থ যুক্ত হয়। যেমন সিনেমা। একটি সিনেমায় কোটি টাকা লগ্নি করা হয়। দেখা যায় কোটি টাকার বিনিময়ে লক্ষ টাকাও এলো না। আবার কারও কারও কোটি টাকার বিনিময়ে বহু কোটি টাকা এসে গেল। কোনো নায়কের ছবি চলল না, তার পারিশ্রমিক কমে গেল। আবার কোনো নায়কের একটি ছবিতেই বিপুল জনপ্রিয়তা এসে গেল। এই যে ভাগ্যের খেলা এটা নিয়েও একধরনের জুয়ায় মেতে ওঠে টাকা লগ্নিকারী প্রযোজকরা।
পুঁজিবাদী দেশে এসব ঘটনাকে নিয়তি নির্দিষ্ট বলে মনে করা হয়। তাই সিনেমায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন মাজার বা মন্দিরে যাতায়াত করেন কখনো হস্তরেখাবিদ বা জ্যোতিষীর কাছে যাতায়াত করেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে তারা ভাগ্যের কাছে ভিক্ষা প্রত্যাশা করেন। কিন্তু ঢাকা শহরে ক্যাসিনো সম্রাটদের সঙ্গে জুয়া মদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং পেশিশক্তিও যুক্ত হয়ে গেছে। তাদের নিজস্ব টর্চার সেলের সন্ধানও পাওয়া গেছে। সম্রাটের স্ত্রীর সাক্ষাৎকারে তিনি আনন্দের সঙ্গেই বললেন তার স্বামীর একটিই নেশা আছে তা হলো জুয়া। কিন্তু এও স্বীকার করলেন যে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী। এখন তিনি প্রায়ই সিঙ্গাপুরে যান এবং একজন বিদেশিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। মাঝে মাঝে কাকরাইলের অফিসে গিয়ে তিনি দেখা করেন এবং টাকা-পয়সা নিয়ে আসেন। তার কথা থেকেই বোঝা যায় জুয়া, নারী এবং ঠিকাদারি অর্থ এসব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত পারিবারিক জীবন তার। সমস্যা হচ্ছে এখানে যে এটা শুধু সম্রাটের নয় যারাই রাজনৈতিকভাবে একধরনের শক্তি অর্জন করেন তারা এইসব সংসর্গে এসে গেলে তাদের চারদিকে একটা অদ্ভুত আঁধারের বলয় গড়ে তোলেন। সেই জগতে পঙ্গপালের মতো ঝাঁপ দেয় অনেক তরুণ-তরুণী। আমি একজন তরুণকে চিনি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ-তে ফার্স্টক্লাস পেয়েছে। সে কোনো চাকরির চেষ্টা করেনি, বিসিএস পরীক্ষা দেয়নি বরং রাজনৈতিক নেতার অলিখিত একান্ত সচিব হয়েছে। এটা কোনো সরকারি চাকরি নয়, আমি একজন অভিভাবকের মতো তাকে প্রশ্ন করলামÑ তুমি একজন ভালো ছাত্র, চাকরির চেষ্টা করছ না কেন? সে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যা বললÑ তাতে বোঝা গেল সে চাকরি করবে না। বরং একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছে, যে সুযোগে তার কোটি টাকা হয়ে যাবে।
হঠাৎ করে আমার মনে পড়ে গেল যদি সে কোনো ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত নাও হয় ৯৩,৬০৬ জন কোটিপতির একজন হতে পারে ঋণখেলাপি। কাজেই সে যে অশ্রম উপায়ে অর্থ উপার্জনের কথা ভাবছে তাও অমূলক কিংবা ভুল চিন্তা নয়। এইসঙ্গে আমরা স্মরণ করতে পারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কোটি টাকার চাঁদাবাজির বিষয়টি। বিষয়টির যদিও সত্যতা প্রমাণিত হয়নি তবুও এই ধরনের ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। ১৯৭১ সালে আমার সামনে-পেছনে ডানে-বায়ে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বহু মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। কেউ কেউ তাদের স্বপ্নের কথা বলেও গেছেন। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পরেও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘসময় ধরে লড়াই করেছি। সেই লড়াইয়ের অনেক ভালো ফলও হয়েছে। কিন্তু যখন এইসব প্রবণতা দেখি, মুখ্য হয়ে ওঠে অর্থ উপার্জন এবং ভোগবিলাস, তখন মর্মাহত হই এবং আশার আলো খুঁজতে থাকি। সেই আশার আলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বর্তমান অভিযান। ওয়ান-ইলেভেনের শুরুটা ভালোই ছিল কিন্তু শেষে তা চরম তিক্ততার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এ আয়োজন যেহেতু রাজনৈতিক তাই শেষ পর্যন্ত আশা করব একটা কিছু হবে। সমাজ কিছুটা নিরাপদ হবে।
লেখক
নাট্যব্যক্তিত্ব ও কলামনিস্ট
mamunur530@gmail.com