আবরারের মৃত্যুর অসহনীয় ভার

কুষ্টিয়ার জেলা শহরে বেড়ে ওঠা আবরার ফাহাদ এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পড়তে এসেছিল দেশের সেরা এক বিশ্ববিদ্যলয়ে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার শুধু পড়ালেখাতেই মেধাবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশ ও দশকে নিয়ে ভাবতে শেখা এক স্বপ্নবান তরুণ। সম্ভবত এই স্বপ্নই তার কাল হলো।  ফেইসবুকে নিজের মতপ্রকাশের কারণে নির্মমভাবে পিটিয়ে খুন করা হলো তাকে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনা ঘটল বিশ্ববিদ্যালয়ে তারই আবাসিক হলে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে শোকে মুষড়ে পড়া আবরারের পরিবারের সঙ্গে যেমন শোকাহত দেশের মানুষ, তেমনি এই নির্মম হত্যার বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের ছাত্রসমাজ। 

রবিবার রাতে বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেন বুয়েট ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সোম ও মঙ্গলবার ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক কয়েকটি চুক্তির সমালোচনা করে ফেইসবুকে আবরারের স্ট্যাটাসের জের ধরে তাকে ডেকে নেন ছাত্রলীগ নেতারা। আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আর খুনিদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশিরভাগ পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সোম ও মঙ্গলবার ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনায় বারবার এই প্রশ্ন সামনে উঠে আসছে কেন স্বাধীন মতপ্রকাশের দায়ে শিক্ষার্থীকে প্রাণ দিতে হবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ আর সাধারণ মানুষের আলোচনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের পাশাপাশি চলছে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লাগামহীন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী আর বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের মতো অনেক সচেতন নাগরিকই বলছেন, পুরান ঢাকায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হাতে বিশ্বজিৎ হত্যা কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে আবু বকর সিদ্দিক হত্যার বিচার হলে আজ আবরার ফাহাদকে এভাবে প্রাণ দিতে হতো না। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার ও চাঁদাবাজির অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অপসারণ করা হয়।  নানা অপকর্মের দায়ে দেশজুড়ে তুমুল সমালোচনার মুখে থাকা ছাত্রলীগ এখন আবরার হত্যার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্নের মধ্যে পড়ল।  

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এটা প্রতীয়মান যে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন একটা অস্বাভাবিক সময় পার করছে। একের পর এক বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও বিক্ষোভ চলছেই। এসব দুর্নীতি ও অনিয়মে উপাচার্যসহ অনেক শিক্ষকের জড়িত থাকার প্রমাণও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। দুর্নীতি-অনিয়মের পাশাপাশি নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অগ্রহণযোগ্য দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন অনেকেই। সর্বশেষ গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমন আন্দোলন-বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন জ্ঞানচর্চা তথা শিক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজনীয় মুক্ত পরিসর হিসেবে তৈরি করার বদলে নিয়ন্ত্রিত বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। চলতি বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের বিশেষ সভায় ‘ছাত্রছাত্রী শৃঙ্খলাবিধি’ হালনাগাদ করে যে অধ্যাদেশ জারি করে তাকে অনেকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্বকারী বিতর্কিত ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। সমালোচকরা বলছেন, এটা রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকারে হস্তক্ষেপের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীন মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে অপসারণের পরও যদি ছাত্রলীগ সুস্থ রাজনীতির ধারায় না ফেরে তাহলে তাদের ফেরাবে কে? এভাবে স্বাধীন মতপ্রকাশ করে যদি দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রাণ দিতে হয় তাহলে দেশবাসীর স্বপ্ন খুন করার দায় নেবে কে?

কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আবরার ফাহাদের মা-বাবার আর্তনাদ ও কান্নার শব্দই সকলের কানে বাজছে।  বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানকে পড়তে পাঠিয়ে মফস্বলের এই মা-বাবা স্বপ্নের যে জাল বুনেছিলেন তা সন্ত্রাসীদের হামলায় ধূলিসাৎ হলো। কোনো বিচারেই কি এর প্রতিবিধান সম্ভব? তবুও বিচার প্রয়োজন। যারা পিটিয়ে সহপাঠীকে হত্যার অমানবিক মানসিকতায় পৌঁছে গেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অত্যন্ত জরুরি। সঙ্গে জরুরি সেই রাজনীতির বদল যা শিক্ষার্থীদের হত্যাকারীতে পরিণত করে। আমরা আবরারের মা-বাবা পরিজনদের সমবেদনা জানাই।  আবরারের মৃত্যুর অসহনীয় ভার লাঘব করতে সরকার যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করবে এই প্রত্যাশা করি।