আবার একটা সন্তান দেব তাকে নিরাপত্তা দেবেন?

‘আমার তো আরও একটি সন্তান আছে, আমি সব সময় চাইব যে আমার সন্তান উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। কিন্তু আমি কীভাবে আপনার এই বুয়েটে দেব। আমি তো বুঝতে পারছি না, আপনি যখন আমার সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে পারলেন না। আমি আবার আর একটা সন্তান দেব তাকে কীভাবে নিরাপত্তা দেবেন তিনি?’ আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মা রোকেয়া খাতুন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর রায়ডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই বুয়েট ভিসি সাইফুল ইসলামকে উদ্দেশ করে তার ক্ষোভ ও হতাশার কথাগুলো          

 দেশ রূপান্তরকে বলছিলেন। এর আগে গত বুধবার বিকেলে আবরারের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে রায়ডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে পড়েন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য সাইফুল ইসলাম। পরে উপাচার্য আবরারের বাড়িতে না ঢুকেই পুলিশ প্রহরায় এলাকা ছাড়েন।

বুয়েটকে দেশের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এত দিন জানলেও তা ভুল ছিল উল্লেখ করে অঝোরে কাঁদতে থাকেন রোকেয়া খাতুন। পরে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে একটানা বলে চলেন, ‘স্কুল-কলেজের গ-ি শেষ করে আমার ছেলেকে যখন বুয়েটে ভর্তি করে হলে উঠিয়ে দিয়ে আসি, তখন আমি ছেলেকে বলেছিলাম, বাপগো এখন থেকে তুমি তোমার নিজের বুদ্ধি অনুসারে চলবা। আমি জানি বিশ্ববিদ্যালয়ের যিনি ভিসি তিনিই সর্বপ্রধান। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে যত স্টুডেন্ট থাকে তিনি সকল স্টুডেন্টের পিতৃতুল্য। সেখানকার সব সন্তানের পিতা তিনি। সব ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তার। আমি তাই দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট, সেখানে কোনো কলহ নাই, কোনো মারামারি নাই, রাহাজানি নাই। আমি সেই কারণে ওই ভিসি সাহেবের হাতে ওখানে ছেলেকে ভর্তি করে দিয়ে আসলাম। যেন আমার ছেলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির হাতে বা এখানকার যারা আছেন সবার সাথে সুরক্ষিত থাকবে। ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। কিন্তু আমি তো সেই সন্তান হারায়ে ফেলিছি।’

ঢাকায় অনুষ্ঠিত আবরারের জানাজায় বুয়েট ভিসির অনুপস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার সন্তান যখন হারায়ে গেছে, আমার সন্তান যখন মারা গেছে ওখানে সংবাদ পাওয়ার পরও ভিসি সাহেব তার কাছে ছুটে যায় নাই। যখন জানাজা হয়েছে তখনো তিনি যান নাই। আবার যখন তিনি সুদূর ঢাকা থেকে ২৫৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কুষ্টিয়ায় আসছিলেন, তখন আমি বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম যে হয়তো তিনি আমার কাছে আসবেন। আমি তার সাথে সাক্ষাতে বলব যে আমার আবেদন, আপনার হাতে সন্তান দিয়ে আসছিলাম, আমি তো আপনার কাছ থেকে সন্তান ফিরে পেলাম না, পেলাম লাশ। আমি আর কী বলতে পারি বলেন? আমি হয়তো তার কাছে বলব যে আমি চাই আমার সন্তান যেভাবে বুয়েট থেকে লাশ হয়ে আমার কাছে ফিরে আসছে, আর যেন কোনো মায়ের সন্তান তার বুকে লাশ হয়ে ফিরে না যায়। আমি তার কাছে আমার মনের কষ্টের কথা, যে আমার সন্তান তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকাকালে কোনো দিন কোনো সময় তার সাথে কোনো খারাপ আচরণ করে থাকে। হয়তো আমি তার কাছ থেকে জানতে পারব যে আমার সন্তান কেমন ছিল। সন্তান আমার ফুল ফোটার আগেই ঝরে গেল, অথচ কেন এমনটি হলো? হয়তো আমি তার কাছে জানতে পারব, সেই সাথে আমার সন্তানের জন্যি ক্ষমা চেয়ে নেব। ওনার কাছে আমার আকুল আবেদন ছিল, অন্তত আমার দুঃখ-কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘবের জন্য উনি উদ্যোগ নেবেন। অথচ তার কিছুই হলো না। আমি অত্যন্ত দুঃখিত এবং হতাশ হয়েছি যে তিনি আমার সাথে দেখাটা না করেই চলে গেলেন।’

নতুন করে আবার কোন বিপদের মুখে পড়ি : আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় শোকের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে পুরো রায়ডাঙ্গা গ্রাম। গোটা এলাকায় এখন বিরাজ করছে একধরনের থমথমে পরিবেশ। পারিপাশির্^কতাই বলে দেয় সেখানে কিছু একটা ঘটেছে। আবরারদের বাড়ির বাইরের প্রধান ফটকে এখনো কিছু চেয়ার পাতা আছে অভ্যাগতদের বসার জন্য। গতকাল বেলা তিনটায় সেখানে গিয়ে দেখা যায় চেয়ারগুলোর একটিতে বসে আছেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। পাশেই বসে চাচা আমিরুল ইসলাম ও ছোট ভাই ঢাকা কলেজের ছাত্র আবরার ফায়াজসহ কয়েকজন। চারদিকে সুনসান নীরবতা। এর আগে বুয়েটের ভিসির আগমনকে কেন্দ্র করে গত বুধবার সেখানে দিনভর দেখা উত্তেজনাময় চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য। এ সময় আবরারের বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি প্রথমে ইতস্তত বোধ করেন। তখন চাচা আমিরুল বলে ওঠেন, ‘কেন বলবেন না? আজ মিডিয়ার জন্যই ফাহাদের এই করুণ পরিণতির কথা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ফাহাদ হত্যার বিচার দেশবাসীর দাবি হয়ে গেছে।’

ভাইয়ের এমন কথার পরও বরকত উল্লাহ অনুরোধ করেন তার কোনো বক্তব্য না নিতে। তিনি বলেন, ‘দেখুন, আপনারা আমাদের এমন কোনো কথা প্রকাশ করবেন না, যাতে আমরা নতুন করে আবার বিপদের মুখে পড়ি।’

এ সময় পাশেই বসে থাকা আবরারের ভাই ফায়াজ বলে ওঠেন, ‘আব্বা, তুমি আমার জন্য এত চিন্তা কোরো না। তুমি মনে কোরো না যে এই হতভাগা দেশে আমি পড়ে থাকব।’

পরিবারের সদস্যদের নীরবতার কারণ জানতে চাইলে ফায়াজ বলেন, ‘আমার পরিবার থেকে আমাকে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আমি যেন এমন কোনো কথা না বলি যাতে ভাই হত্যার বিচার পাওয়ায় বাধা হয়।’

পরে বাড়িতে না ঢুকেই বুয়েট ভিসির চলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বরকত উল্লাহ বলেন, ‘আমার সাথে তো তবু কবরস্থানে জিয়ারত করার সময় দেখা হয়েছে। ফাহাদের মা বরং খুব কষ্ট পাইছে। যদিও সে দুমড়েমুচড়ে গেছে। তবুও আপনি ওর সাথে একটু কথা বলে যান।’ তবে বাড়ির ফটকে দাঁড়ানো এক আত্মীয় বাধা দিয়ে বলেন, ‘না, ফাহাদের মা অসুস্থ। উনি কথা বলতে পারবেন না।’ কিন্তু বরকত উল্লাহ বাড়ির মধ্যে গিয়ে ঘুরে এসে অনুমতি দেন ভেতরে গিয়ে রোকেয়া খাতুনের সঙ্গে কথা বলার।