‘চায়না’ ভিসি সাইফুল ইসলাম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের কাছে ‘চায়না ভিসি’ নামে পরিচিত। গতকাল শুক্রবার বুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত তিন বছরে ভিসিকে ক্যাম্পাসে খুব কম সময়ই দেখা গেছে। বিভিন্ন সময়ে দাবি-দাওয়া নিয়ে গেলে প্রতিবারই তার কার্যালয় থেকে বলা হয়, তিনি চীনে রয়েছেন। এভাবে তিনি ‘চায়না ভিসি’ হিসেবে পরিচিতি পান। তাছাড়া ভিসির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক দায়িত্বে অবহেলা, শিক্ষার্থীদের এড়িয়ে চলা, তৃতীয় ব্যক্তি মারফত সংশ্লিষ্টপক্ষের দাবি মীমাংসার চেষ্টাসহ নানা অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বুয়েটের ওয়েবসাইটের তথ্য, ২০১৬ সালের ২৩ জুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। একই বছরের ২৪ মে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বুয়েট ও দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ভিসি অধ্যাপক খালেদা একরাম। এরপর ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন ছাত্রলীগের পিটুনিতে গত রবিবার নিহত আবরার ফাহাদ। চার বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া ভিসি সাইফুল ইসলামের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছর ২২ জুন। তবে এখনই তার পদত্যাগ দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা।

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বর্তমান ভিসির মেয়াদে গত তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও দুটি বড় ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। এর একটিতেও প্রশাসনিক দক্ষতা দেখাতে পারেননি তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভিসি বরাবরই শিক্ষার্থীদের এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও খুব কম। যেকোনো ইস্যুতে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে প্রশাসনের অন্যদের পাঠান। গত জুন মাসের আন্দোলন ছাত্রলীগ নেতাদের দিয়ে প্রশমিত করার চেষ্টা করেন তিনি। এতে শিক্ষার্থীরা আরও বিক্ষুব্ধ হন। ওই ঘটনায় টানা সাত দিন বুয়েট অচল ছিল। কিন্তু ভিসির দেখা পাওয়া যায়নি। তার কার্যালয় থেকে বলা হয়েছিল, বিশেষ সফরে তিনি চীনে রয়েছেন। পরে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করেন।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি বছর ট্যুরে গিয়ে নদী বা সাগরে সাঁতার কাটতে নেমে আমাদের অনেক ছাত্র মারা যান। আমরা অনেকবার ভিসি স্যারের কাছে দাবি নিয়ে গেছি, ক্যাম্পাসে একটি সুইমিংপুল স্থাপনের জন্য। কিন্তু কোনো সময় তাকে পাওয়া যায়নি। গত তিন বছরে আমরা তাকে ক্যাম্পাসে দেখেছি খুব কম সময়। তার অফিসে গেলেই বলে, ভিসি স্যার চীনে আছেন।’

সদ্য বিএসসি পাস করা ইইই বিভাগের এক ছাত্র দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৭ সালের অক্টোবরে ক্যাম্পাসে গাঁজা সেবনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে বুয়েটের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর ওই ঘটনার বিচারসহ আট দফা দাবি দিয়েছিল শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা দেখা করতে গেলে তখনো ভিসির কার্যালয় থেকে বলা হয়েছিল, তিনি চীন সফরে রয়েছেন। ওই শিক্ষার্থী রসিকতা করে বলেন, ‘কিছু হইলেই স্যার চায়নায় চলে যান। তিনি আসলেই চায়নায় যান নাকি মিথ্যা বলেন আল্লাহ জানেন!’

ওয়াটার রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, চলতি বছর ২২ মে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক পদে নিয়োগ পান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম মিয়া। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, ওই নিয়োগে স্বচ্ছতা ছিল না। নিয়োগটি হয়েছে তড়িঘড়ি করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যাপক কাশেমের আগে পদটিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের অধ্যাপক সত্যপ্রসাদ মজুমদারকে জোর করে সরানো হয়েছে। এ নিয়ে আন্দোলনের পর অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে ওই পদে বসানো হয়।

বুয়েট শিক্ষার্থীরা বলছেন, অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে এ পদে বসানোর নেপথ্যে ছিল ছাত্রলীগ। কারণ তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে এ বিষয়ে মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।