ভয়তন্ত্রের রাহু

শাসকরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। সব সত্য না হলেও, কিছু সত্য তো বটেই। ইতিহাসের বাঁকে-বাঁকে এর প্রমাণ আছে। গ্যালিলিও বলেছিলেন, পৃথিবী নয়, সূর্যই স্থির। সূর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী ঘুরছে। কিন্তু মহাক্ষমতাধর চার্চ তা মানল না। কেননা, এই সত্য মেনে নিলে বাইবেলে লেখা সত্য উল্টে যায়। তাই, গ্যালিলিওর জবান বন্ধ করে দেওয়া হয়। গৃহবন্দি করা হয়। তার লেখার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। তিনি যে সত্যকে প্রচার করেছেন, সেটিকে মিথ্যা বলে ঘোষণা না দিলে ধর্মদ্রোহিতার দায়ে তার প্রাণ যাবে বলে সাফ জানিয়ে দেয় রাজা ও চার্চের ভয়তন্ত্র।

গ্যালিলিও বুদ্ধিমান। তিনি জানতেন, দেহ থেকে প্রাণটা চলে গেলে সত্য বলার জন্য না থাকবে মুখ, ভাবার জন্য না থাকবে মাথা। তাই, জনসম্মুখে নিজেকে ভুল বলে ঘোষণা করে তিনি প্রাণে বেঁচেছিলেন। কিন্তু ব্রুনোর ভাগ্য প্রসন্ন ছিল না। ধর্মদ্রোহিতার দায়ে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। ব্রুনোকে বলা হয়, বিজ্ঞানের জন্য প্রথম শহীদ। আমি বলি, সত্যের শহীদ। কালে কালে পৃথিবীতে সত্যের শহীদ হয়েছেন বহু মানুষ। জবরদখলকারী ব্রিটিশদের খেদানোর লড়াইয়ে শহীদ হন ক্ষুদিরাম-সূর্যসেন-ভগৎ সিং-চন্দ্রশেখর-আজাদরা।

কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে রাজনৈতিক পাণ্ডার হাতে কোনো নাগরিকের মৃত্যু অকল্পনীয়। গণতান্ত্রিক দেশে রোমহর্ষক তেমন কাণ্ড ঘটলে, সেটি মধ্যযুগীয় বর্বর ভয়তন্ত্রের আমলে সংঘটিত ঘটনার চেয়েও অধিক জঘন্য ও ঘৃণ্য বলে বিবেচিত হয়।

সাম্রাজ্যের ভয়তন্ত্রে রাজা বা শাসক থাকে ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু গণতন্ত্রের ক্ষমতা কাঠামো ভয়তন্ত্রের একেবারে বিপরীত। এই ব্যবস্থায় নাগরিকদের ইচ্ছাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থায় রাজার মতোন ওপর থেকে নাজিল হওয়ার নীতি নেই। এখানে জনতাই সিদ্ধান্ত নেবে কাকে তারা নেতা এবং সেবক হিসেবে রাখবে আর কাকে রাখবে না। ভয়তন্ত্রের রাহু থেকে গণতন্ত্রই মানুষকে দিয়েছে মুক্তি। যদিও এটিই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা কি না তা নিয়ে কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, নিয়ন্ত্রণবাদিতা, ভয় দেখানো, নিপীড়ন করা ও অন্যের টুঁটি চেপে ধরে জবান বন্ধ করে দেওয়া গণতন্ত্র অনুমোদন করে না।

ভয়তন্ত্রের ঝাধারীরা আতঙ্ক দেখিয়ে রুদ্ধ করতে চায় প্রশ্নকারীর মুখ। ভয় দেখিয়ে তারা চুরমার করে দিতে চায় স্বাধীনতাকামীর স্বপ্ন। ভয় উৎপাদন করতেই ষোড়শ শতকে ইতালিতে ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়। ভয় দেখিয়ে ব্রিটেনের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতেই চতুর্দশ শতকে কেটে টুকরো-টুকরো করে রাজ্যের চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় স্বাধীনতাকামী স্কটিশ বীর উইলিয়াম ওয়ালেসের দেহ। একই ধরনের ভয় ব্রিটিশরা ভারতেও দেখিয়েছে। সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবে পরিচিত ভারতের প্রথম স্বাধীনতা-সংগ্রামে অংশ নেওয়া সৈনিকদেরও ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়েছে ইংরেজ শাসকরা। আজকের পুরান ঢাকায় যে বাহাদুর শাহ পার্ক, সেখানেও তখন জনসম্মুখে প্রকাশ্যে সৈনিকদের ঝোলানো হয় ফাঁসিকাষ্ঠে।

অত্যাচারী শাসকের প্রধান হাতিয়ার ভয়। এ ক্ষেত্রে দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ নেই। হোক সেটি খ্রিস্টের জন্মের আগে বা জন্মের দুই হাজার বছর পরের ঘটনা। খ্রিস্টের জন্মের অর্ধশতকেরও বেশি সময় আগে রোমান শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় স্পার্টাকাস নামের এক দাস। বিদ্রোহী স্পার্টাকাসের সহযোদ্ধা ও অনুসারীদের তখন পথের দুধারে ক্রুশবিদ্ধ করে তিলে-তিলে মারা হয়। এ ঘটনার প্রায় দুই হাজার বছর পর ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কসহ ভারতের নানা জায়গায় বিদ্রোহীদের ঝুলিয়ে রাখা হয় ফাঁসিকাষ্ঠে। সময়ের ব্যবধান দুই হাজার বছর। কিন্তু জনমনে ভয় উৎপাদনে শাসকের কায়দা-কৌশল অভিন্ন।

তবে, গণতন্ত্রের ভয়ের কোনো স্থান নেই। গণতন্ত্র আর ভয়তন্ত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুটি একসঙ্গে চলে না। ইতিহাসে এর প্রমাণ আছে। ১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তান যখন গণতন্ত্রের আড়ালে ভয়তন্ত্র কায়েম করে, তখন ফুঁসে ওঠে পূর্ব বাংলা। তার প্রমাণ ৫২, ৬৬ ও ৬৯। সাম্রাজ্যের নাগপাশে বন্দি থাকা ভীত প্রজা আর গণতন্ত্রের স্বাদ পাওয়া স্বাধীন নাগরিকের মনোভঙ্গি এক নয়। গণতন্ত্রে নাগরিকের ইচ্ছার গুরুত্বই সর্বাধিক। নাগরিকরা সম্মিলিতভাবে চাইলে এমনকি কোনো দেশের মানচিত্রও বদলে দিতে পারে। সেই বদলেরই সাক্ষী ১৯৭১। বুলেট দিয়ে ভয় দেখিয়ে প্রতিবাদমুখর জনতাকে যে দাবিয়ে রাখা যায় না, তারই প্রমাণ ১৯৭১।

কিন্তু এই স্বাধীন দেশেও দেখছি শুধু ভয়েরই চাষাবাদ! কালে কালে সরকার বদল হয়। তবু, গণতন্ত্রের মোড়কে দেখি আদতে ভয়েরই সংস্কৃতি। সাপের মতোন খোলস পাল্টে নব-নব রূপে নাগরিকের দুয়ারে এসে ঘাপটি মেরে থাকে ভয়ের কালনাগ।

বুয়েটে নিহত শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মৃত্যু বাংলাদেশের চোখের সামনে পুনরায় তুলে ধরেছে ভয়তন্ত্রের ভয়ালস্বরূপ। হত্যা, নৃশংসতা ও ভয়ের নাগপাশ বাংলাদেশকে বেঁধে রেখেছে আজ বহুকাল। শিক্ষাঙ্গনে কখনো তাণ্ডব চালিয়েছে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির। কখনো তাণ্ডব চালিয়েছে ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাস রণক্ষেত্র হয়েছে। ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে ক্যাডারদের সূতিকাগার। ক্যাম্পাসে বন্দুকবাজি, বোমাবাজি এবং একদল ক্ষমতায় এলে আরেক দলকে পিটিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া করার ‘ঐতিহ্য’ চলছে বহুকাল।

বাংলাদেশ কখনো পেয়েছে চট্টগ্রামে শিবিরের ব্রাশফায়ারে নিহত আট ছাত্রলীগকর্মীর লাশ, কখনো পেয়েছে নিহত সনির নিথর দেহ। বাংলাদেশকে কখনো কাঁদিয়েছে বিশ্বজিৎ, কখনো আবু বকর। এই তালিকায় যুক্ত হওয়া নতুন নাম আবরার। মানুষের শিরদাঁড়া হিম করে দিয়েছে আবরার হত্যাকাণ্ড। কেননা, এটি নিছকই হত্যাকাণ্ড নয়। এই খুন বিদ্যমান ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতার দলিল। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, পীড়ন করতে-করতে নাকের ডগায় দম এনে আবরারকে সিঁড়িতে ফেলে রাখে পা-ারা। তারপর ছেলেটির মৃত্যু হলে সেই হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে বইয়ে দিতে আবরারকে মাদক-ব্যবসায়ী সাজাতে চেয়েছিল খুনিরা। খুনিদের এই পরিকল্পনা জানাজানি হলে অন্য ছাত্ররা আবরারের রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে পাহারা দিয়েছে। আবরার হত্যার সঙ্গে কিছুটা তুলনা চলে পুড়িয়ে মারা নুসরাত হত্যাকাণ্ডের। নুসরাতের হত্যা-পরিকল্পনাকারী নিজের বাহুবল ও অর্থবলে স্থানীয় সমাজের প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানকে ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেছিল। ক্ষমতা থাকলে প্রশাসন, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করে নির্বিঘ্নে ভয়ের সাম্রাজ্য কায়েম করার দৃষ্টান্ত নুসরাত হত্যাকাণ্ড।

ভয়তন্ত্র মানুষকে কতটা বোবা বানিয়ে রাখে, তারই প্রমাণ আবরার। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সবার চোখের সামনে ক্ষমতার কাছঘেঁষা-মানুষরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পীড়ন করেছে। সবাই তা মুখ বুজে সয়েছে। এটা তো শুধু বুয়েটের চিত্র নয়। বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একই চিত্র বিরাজমান। আরও বিস্তৃতভাবে বললে, একই চর্চাই সারা দেশে বিদ্যমান। ক্যাসিনো-কাণ্ড তার জ্বলন্ত উদাহরণ। সেখানেও পাওয়া গেছে টর্চারের সরঞ্জাম।

আশার কথা হচ্ছে, ক্ষমতাকেন্দ্রের উচ্চপর্যায় থেকে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করার আশ্বাস এসেছে। তবে, এখানে এটিও বলা দরকার, বিচার নিশ্চিত হবে বলে যখন বারবার আশ্বাস দিতে হয়, তখন তা থেকেই বোঝা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো সুবিচার নিশ্চিত হয় না। সনি হত্যার বিচার যে আজও হয়নি, মানুষ তা মনে রেখেছে

এখন প্রশ্ন, এই হত্যা ও বিচারহীনতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? আমার মতে, রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতাচর্চা এবং ভয় উৎপাদনের রাজনীতি করার পথ বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া, কাজীর গরুর মতোন কিতাবে না রেখে আইনের শাসনকে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। এই দুটি বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশে একসঙ্গে কয়েকটি পক্ষকে জাগরূক থাকতে হবে। সেই জেগে থাকাদের তালিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে নিতে হবে কঠিন অবস্থান। এই দেশের সব দুর্গতির পেছনে অন্যতম মূল কারণ দুর্নীতি। গণমাধ্যম গণতন্ত্রের প্রহরী। সাংবাদিকরা একাট্টা হলে ভয়তন্ত্র নিজেই ভয়ে পড়বে।গ

জেগে থাকার তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হলো, নাগরিক। ‘বড়ভাইগিরি’ দেখাতে কোনো সিনিয়র যদি জুনিয়রকে ‘ওই সালাম দিলি না কেন’ বলে শাসায় বা কেউ যদি র‌্যাগকে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কের ‘মিষ্টতা বাড়ানোর উপায়’ বলে যুক্তি দেয় তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে সবাই মিলে তাকে চিহ্নিত করুন। কেননা, সেই হতে পারে পোটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য অপরাধী এবং অপরাধের পোষক। কারণ সেও বহন করছে অসুখের বীজ। সুযোগ পেলে এই বীজই এক দিন ডালপালা মেলে মহীরুহ হয়ে নিপীড়ক ও খুনি হয়ে উঠবে। শুধু খুনিকে নিয়ে কথা বলে সমস্যার সমাধান হবে না। যে ব্যবস্থা খুনি ও নিপীড়ক তৈরি করে সেই ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে হবে। ব্যবস্থার বদল না হলে ‘ক’-এর জায়গায় ‘খ’ আসবে, ‘খ’-এর জায়গায় ‘গ’ আসবে। আর আবরারের মায়ের জায়গায় দেখা যাবে অন্য কোনো মায়ের আহাজারি। অতএব, একক ব্যক্তি বা ঘটনা নয়, সিস্টেম বা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে হবে। তবেই হয়তো গণতন্ত্র

লেখক

কবি ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ

afroja.shoma@gmail.com