‘প্রতিহিংসা আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়’

গত সোমবার মুম্বাইয়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সভায় সর্বসম্মতভাবে ৪৭ বছর বয়সী সৌরভ গাঙ্গুলিকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। তার আগে বেশ নাটকও হয়েছে তার প্রেসিডেন্ট হওয়া না হওয়া নিয়ে। শেষ পর্যন্ত সৌরভকে সর্বসম্মতভাবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত করা হয়। ভারতীয় ক্রিকেটের বড় দুঃসময়ে অধিনায়কের দায়িত্ব নিয়ে সফল হয়েছিলেন সৌরভ। এবার বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও সফল হওয়ার সুযোগ তার সামনে। দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ভারতীয় বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হওয়া সৌরভের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কলকাতার দৈনিক সংবাদ প্রতিদিনের প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য। ওই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলোÑ

এমন অর্জনকে কীভাবে দেখছেন?

সৌরভ : খুব ডিফিকাল্ট, চ্যালেঞ্জিং। ২০০০ সালে যখন ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন হয়েছিলাম তখনো একটা ভগ্নদশার মধ্যে টিমটা ছিল। এখন প্রশাসনের শীর্ষে এলাম। এখনো একটা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লাম। আমার এই রেসপনসিবিলিটিটা হিউজলি চ্যালেঞ্জিং যে বোর্ডকে আমি নতুন দিশা দেখাতে পারি কিনা। তাকে বর্তমান অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারি কিনা।

বোর্ড প্রেসিডেন্ট আপনার বদলে যদি শচিন (টেন্ডুলকার) হতেন তবে তার কাছে কী আশা করতেন?

সৌরভ : প্রথম চাহিদা থাকত ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটকে রক্ষা করা। গত তিন বছর সিওএ-র হাতে বোর্ড ছিল। তারা ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটারদের অবস্থার খুব উন্নতি ঘটিয়েছে বলে মনে করি না। পারিশ্রমিক হয়তো বাড়িয়েছে কিন্তু সেটা যথেষ্ট না। আজও আমাদের দেশে ফার্স্টক্লাস ক্রিকেট আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে গ্যাপটা বিশাল। চাইতাম সেটা শচিন যথাসম্ভব ব্যালান্স করবে। দুই- দেশে টেস্ট ম্যাচ ক্রিকেটের পরিবেশ বদলাবে। টেস্ট ক্রিকেটকে ইন্টারেস্টিং আমাদের করতেই হবে। খালি মাঠে এভাবে টেস্ট ক্রিকেট হয়ে যাবে এটা অসহ্য।

আপনি নাইট ক্রিকেট কলকাতাতে চালু করেছিলেন। এখানে নাইট টেস্ট চালু করবেন? যা আজ পর্যন্ত খেলতে রাজি হয়নি ভারত।

সৌরভ : টেস্ট ক্রিকেটের অ্যাট্রাকশন ফিরিয়ে আনতে যা যা দরকার করব।

মানে আপনি করবেন না। শচিনের কাছে চাইবেন?

সৌরভ : (হাসি) হ্যাঁ, ঠিক তাই। থার্ড যেটা বলতে যাচ্ছিলাম আইসিসিতে ভারতের পজিশন বেটার করার চেষ্টা করব। এ মুহূর্তে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। তিন-চার বছর ধরে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। অথচ আমরা হলাম বিশ্বক্রিকেট বাণিজ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। এটাকে ঠিক করতেই হবে। ফোর্থ, যত স্টেক হোল্ডার ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত আছে তাদের রিয়েল ভ্যালু ফর মানি দিতে হবে। সেটা স্টার স্পোর্টস হোক বা অন্য কেউ। এটা বোর্ডের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

বলছেন গোটা বোর্ডের আমুল মেকওভার দরকার?

সৌরভ : ঠিক তাই। সামগ্রিক মেকওভার দরকার। বললাম না ২০০০ সালে যে পরিস্থিতি হয়েছিল মোটামুটি তাই।

ভারতীয় টিম গত সাত বছর আইসিসির কোনো নকআউট টুর্নামেন্ট জেতেনি। এটাকে অ্যাড্রেস করবেন না?

সৌরভ : হ্যাঁ, অ্যাড্রেস করতে হবে কেন সেমিফাইনাল বা ফাইনাল থেকে আমরা ট্রফি জিততে পারছি না। রাস্তা বার করতে হবে সেখান থেকে ট্রফি জেতার। বিশ্বকাপে যেমন সেমিফাইনালে হেরে গেলাম কিন্তু সেটা বাদ দিলে টিম দারুণ খেলেছে। এছাড়া আমার মনে হয় না দল নিয়ে চিন্তার কারণ আছে।

দরকার হলে বিরাট আর শাস্ত্রিদের টিমসহ মিট করবেন?

সৌরভ : মিটিং হতে পারে পারফরম্যান্স আরও ভালো করার ব্যাপারে কিন্তু সিরিয়াস কোনো বিষয় নিয়ে নয়।

সাধারণভাবে মনে করা হচ্ছিল বোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনার কর্মজীবন হবে অমিতাভ বচ্চনের ছবির সেকেন্ড হাফের মতো। আপনি যেমন শাসকের প্রচুর অত্যাচার সহ্য করেছেন ঠিক সেভাবে বোর্ড প্রেসিডেন্ট হয়ে আপনার মনে প্রতিহিংসা মেটানোর সহজতম পথ কি খুলে দেয়নি?

সৌরভ : কী বলছেন! একেবারেই না। একটা কথা মনে রাখবেন। আমি ১০০ টেস্ট আর ৩০০ ওয়ানডে খেলা ক্রিকেটার, যে কৃতিত্বটা গোটা দেশে মাত্র তিনজনের আছে। এর সঙ্গে দুশোর ওপর দলকে নেতৃত্ব দেওয়া। আমার রাস্তায় অনেক কষ্ট ছিল কিন্তু সেগুলো আমাকে তেতো করে দিতে পারেনি। ক্রিকেটার হিসেবে আমার স্যাটিসফ্যাকশন কেড়ে নিতে পারেনি। আমি যথেষ্ট খুশির সঙ্গে এতগুলো ক্রিকেটিং অ্যাচিভমেন্ট নিয়ে রিটায়ার করেছি। প্রতিহিংসার অ্যাঙ্গেলটা আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না।

আপনার নতুন অফিস কোথায় হবে, বীরেন রায় রোড টু ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম?

সৌরভ : না সিএবিতেও বসতে পারি।

সেটাতেও তো কনফ্লিক্ট হতে পারে?

সৌরভ : আমি সিএবির কাজে না ঢুকলেই তো হলো।

কালকের রাতকে (সোমবার) কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আপনার ক্যারিয়ারে কোনো ক্রিকেট ম্যাচে হেরে গিয়েও জিতে যাওয়ার এমন ড্রামা দেখেছেন?

সৌরভ : এর চেয়ে বেশি ড্রামা দেখেছি ইডেনে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচে। অত বড় ফলোঅনে পড়েও ম্যাচ জেতা। অ্যাডিলেডে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট। লাইভ ক্রিকেট ম্যাচের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। তবে এটা মানতেই হবে আমার জীবনের একটা সাইকেল কাল (সোমবার) রাত্রে পূর্ণ হলো। ইন্ডিয়ান ক্যাপটেন থেকে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট। আজ পর্যন্ত এমন এক্সাম্পল নেই।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার মনোনয়ন পাচ্ছেন না জেনে তীব্র অভিমানে হোটেল রুমে গিয়ে নাকি প্রায় শুয়েই পড়েছিলেন?

সৌরভ : না শুয়ে পড়িনি। আমি একবার নিচে বেরিয়ে গিয়ে আবার ডিনারে যোগ দিই। তখন আনুরাগ ঠাকুর চেঞ্জ হওয়ার কথাটা বলল। সবাই আমাকে চাইছে। আমার অদ্ভুত লেগেছে চোখের সামনে পরিস্থিতি পুরো বদলে যেতে দেখে।