লালন বলেছিলেন, ‘জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে...।’ তবু মৃত্যুর ১২৯ বছর পরও লালনের জাত, ধর্ম একটি বহুল চর্চিত বিষয়। কেউ বলেন লালন ছিলেন হিন্দু, কারও দাবি ইসলাম ধর্মকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। তবে, ভক্তদের মাঝে তিনি সাঁই, ফকির, মহাত্মা বিশেষণেই পরিচিত। লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ায় তার মাজারে শুরু হয়েছে লালন উৎসব। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের আজ দ্বিতীয় দিন। জাত-পাত, ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সহজ জীবনের দর্শন ছড়িয়ে দেওয়া সাধক লালনকে নিয়ে লিখেছেন
কেউ জানে না জন্ম কোথায়
ফকির লালন শাহ কবে কোথায় কার ঘরে কীভাবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই তথ্য কারোরই জানা নেই। নিজের শিষ্যদের কাছেও তিনি এ বিষয়ে খুব কমই বলতেন। বাংলা ১২৯৭ সালের পহেলা কার্তিকে তিরোধানের পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘হিতকরী’ পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধে লালনের মৃত্যু সংবাদ প্রকাশিত হয়। পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ছিলেন মীর মশাররফ হোসেন। নিবন্ধে স্পষ্ট করেই লেখা ছিল, ‘ইঁহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছুই বলিতেন না। শিষ্যেরা তাঁহার নিষেধক্রমে বা হয় অজ্ঞতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারে না।’ নিবন্ধটিতে এও জানানো হয়, সাধারণ মানুষের ধারণা অনুযায়ীÑ লালন ফকির জাতিতে কায়স্থ ছিলেন। কুষ্টিয়ার অধীন চাপড়া ভৌমিক বংশীয়রা তার জাতি।
এই ধরনের দাবি করা হয়েছিল লালনের জীবদ্দশায়ই কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি পত্রিকায়। লালনের মৃত্যুর আট বছর আগে ১৮৭২ সালে ওই পত্রিকার ‘জাতি’ নামে একটি নিবন্ধে লেখা হয়Ñ ‘লালন শা নামে এক কায়স্থ আর এক ধর্ম্ম আবিষ্কার করিয়াছে। হিন্দু মুসলমান সকলেই এই সম্প্রদায়ভুক্ত।’
প্রচলিত মতে
লালনের জন্ম, জাতি, ধর্ম বিষয়ে খুব বেশি প্রামাণ্য দলিল না থাকায় সেই সময় থেকে লালনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত মতই বর্তমানে আলোচিত। সেই মত অনুযায়ী, লালনের জন্ম হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২৪৫ বছর আগে ১৭৭৪ সালে। ১১৬ বছরের দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন তিনি। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামেই লালনের জন্ম। কুষ্টিয়া সে সময় অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার একটি মহকুমা। কুমারখালী ছিল ইউনিয়ন। গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ভাড়ারা গ্রামের এক হিন্দু পরিবারে লালনের জন্ম। তার বাবা ছিলেন শ্রী মাধব কর আর মা ছিলেন শ্রীমতি পদ্মাবতী। শৈশবেই বাবাকে হারায় লালন। ফলে সংসারের দায়দায়িত্ব পড়ে লালনের কাঁধে। মা-ছেলের সংসারে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে এসেছিলেন লালনের স্ত্রী। মায়ের সেবার কথা ভেবেই বিয়ে করেছিলেন তিনি।
কথিত আছে, আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় মা আর স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়ারা গ্রামেরই দাসপাড়ায় নতুন করে বসতি গড়েন লালন। লেখাপড়া শেখা হয়নি তার। তবে শৈশব থেকেই গান-বাজনার প্রতি টান ছিল।
জানা যায়, পুণ্যলাভের আশায় যৌবনের শুরুতে গ্রামের মানুষের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন লালন। সে সময় রাস্তাঘাটের সুব্যবস্থা না থাকায় মানুষ পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিত এ দুর্গম পথ। গঙ্গাস্নান সেরে বাড়ি ফেরার পথে আকস্মিকভাবে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন লালন। রোগের যন্ত্রণায় চলৎশক্তিহীন হয়ে পথিমধ্যেই জ্ঞান হারান তিনি। সঙ্গীরা ভাবলÑ লালন মরে গেছে! অগত্যা কী আর করা? তার মুখাগ্নি করে দেহটি নদীর জলে ভাসিয়ে দেয় তারা। সঙ্গীরা বাড়ি ফিরে তার মা ও স্ত্রীকে লালনের করুণ মৃত্যুর কথা জানায়। কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। নদীর জলে ভাসতে ভাসতে লালনের দেহটি পাড়ে গিয়ে ঠেকে। এক নারী কলসি নিয়ে নদীতে জল আনতে গিয়ে লালনকে দেখতে পান। তার চোখের পাতা, হাত-পা তখনো নড়ছে। লালনকে নদী থেকে তুলে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান ওই নারী। কথিত আছে, ওই নারী ছিলেন মুসলিম। তার বংশের নাম ছিল কারিকর। তার সেবা শুশ্রষা পেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন লালন। তবে বসন্ত রোগে তার এক চোখ নষ্ট হয়ে যায় এবং মুখে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। সুস্থ হয়ে নতুন জীবন পাওয়া লালন তার গ্রামে ফিরে যান। লালনকে ফিরে পেয়ে তার মা আর স্ত্রীর আনন্দ দেখে কে?
গুরুর সঙ্গে দেখা
লালন জীবিত ফিরে আসায় হইচই পড়ে যায় তার গ্রামে। লোকেরা তাকে দলবেঁধে দেখতে আসে। আসে সমাজপতিরাও। তাদের কথা হলো লালনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং সে মুসলমানের হাতে জল খেয়েছে। তাকে আর এই সমাজে থাকতে দেওয়া হবে না।
ধর্মের অজুহাতে সমাজ থেকে বিচ্যুত লালন মনোকষ্টে তার মা ও স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গ্রাম ছাড়েন। সর্বস্ব হারানো লালনের সঙ্গে এ সময়ই সিরাজ সাঁইয়ের যোগাযোগ ঘটে। সিরাজ সাঁই ছিলেন কাহার সম্প্রদায়ের একজন সাধক। তার সংস্পর্শেই লালনের মধ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তার সূত্রপাত ঘটে। সিরাজ সাঁইকে গুরু হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি।
লালনের ধারণা মতে, গুরু ঈশ্বরেরই প্রতিচ্ছায়া। গুরুকে ভক্তি শ্রদ্ধা জানালে তা ঈশ্বরকেই জানানো হয়। গুরু ছাড়া কোনো সাধনই সিদ্ধ নয়। গুরুর নির্দেশেই তিনি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রামে আস্তানা গড়েন।
জানা যায়, প্রথমদিকে লালন ছেঁউড়িয়া গ্রামের কালীগাঙের পাড়ে গহিন বনের মধ্যে একটি আমগাছের নিচে ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। জঙ্গল থেকে তিনি খুব কমই বেরিয়ে আসতেন।
এই সাধক পুরুষের কথা একে একে ছেঁউড়িয়া গ্রামের সবাই জেনে যায়। এই গ্রামের বাসিন্দারা ছিল কারিকর সম্প্রদায়ের। তারা লালনের একটি আখড়া বাড়ি তৈরি করে দেয় এবং অনেকেই তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। আধ্যাত্মিক সাধক লালন সাঁইয়ের সাধনার কথা কিছুদিনের মধ্যেই দূর-দূরান্তেও ছড়িয়ে পড়ে। শিষ্যদের নিয়ে তিনি প্রায়ই পার্শ্ববর্তী পাবনা, রাজশাহী, যশোর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গানের মধ্য দিয়ে তার মতবাদ ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। সহজ কথায় জীবনের মর্মমূলে আঘাত করা লালনের গানের বাণী আলোড়িত করে মানুষকে। হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে শুরু করে।
যেখানে সাঁইর বারাম খানা
অসহায় আর দিকভ্রান্ত মানুষ লালনের সংস্পর্শে এসে নতুন দিশা খুঁজে পায়। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণহীন সমাজের কথাই ছিল লালনের গানের মূল কথা। নিজের আখড়ায় নির্দ্বিধায় তিনি যে কোনো মানুষকেই ঠাঁই দিতেন। এভাবে নিজের শিষ্যদের নিয়ে গড়ে ওঠে লালনের আলাদা সমাজ।
জানা যায়, মৃত্যুর সময় লালনের দশ হাজার শিষ্য ছিল। শিষ্যদের মধ্যে তিনি বাউল ভাবধারা ছড়িয়ে দেন। জীবন, জগৎ, শরীর, সম্পর্ক নিয়ে শিষ্যদের নানা জিজ্ঞাসায় গানের মধ্য দিয়ে উত্তর দিতেন। কথিত আছে, মনের মধ্যে ভাবের উদয় হলে তিনি ‘পোনা মাছের ঝাঁক’ বলে হাঁক ছাড়তেন। এই ডাক শুনে শিষ্যরা তার পাশে একতারা, ডুগডুগি নিয়ে এসে ভিড় জমাত। নতুন একটি গানের জন্ম হতো এভাবে। লেখাপড়া জানা কোনো কোনো শিষ্য এসব গান লিখে রাখারও চেষ্টা করত। তবে, বাউল সাধকরা গান লিখে রাখায় বিশ্বাসী নয়। লালনের সংস্পর্শে বাংলায় বাউল মতাদর্শ ব্যাপক প্রসারলাভ করে। এই মতাদর্শ কোনো পৃথক ধর্ম নয়, বরং সৃষ্টিকর্তাকে অনুধাবনের একটি পথ মাত্র।
বাউলদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক রয়েছে। গৃহকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিও বাউল সাধনা অনুসরণ করতে পারে। তবে বাউলদের প্রধান অংশটি সংসারত্যাগী ও সহায় সম্পদহীন। দিনের বেলা তারা একতারা হাতে ভিক্ষাবৃত্তি করে, গান বাঁধে, সাধারণ মানুষকে তাদের গান শুনিয়ে বেড়ায়। রাত নামলে তারা তাদের আখড়ায় ফিরে আসে। সেখানে যৌথ তত্ত¡লোচনা, ভজন-সাধনা হয়। বাউলরা মসজিদেও যায় না, মন্দিরেও না। তারা শরিয়তও মানে না, শাস্ত্রও মানে না। গুরুবাদী হওয়া সত্তে¡ও তারা কোনো পীর বা স্বামীর দ্বারস্থ হয় না। নারীদের নিয়ে তারা আখড়াতেই রাত্রিযাপন করে, সুফীরা যা করেন না। বাউলদের কাছে নারীরা সাধনারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে নারীদের সঙ্গে একত্রে বাস করলেও সন্তান ধারণ করা তাদের নিষিদ্ধ।
যে ধর্ম লালনের
শিষ্যরা দাবি করত, প্রায় ১০ হাজার গান রচনা করে গেছেন লালন। তবে, গবেষকরা বলেন, লালনের গানের সংখ্যা সহস্রাধিক। তার অসংখ্য গান কেউ লিপিবদ্ধ করেনি। মানুষের মুখে মুখেই শত বছর পাড়ি দিয়েছে এসব গান। তার জীবদ্দশায় কোনো গানই ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়নি। লালনের মৃত্যুর পর শুরু হয় তার গান সংগ্রহের কাজ। এখন পর্যন্ত তার অনেক গান প্রকাশিত হয়নি এবং আরও অনেক অনেক গান সম্ভবত চিরতরে হারিয়ে গেছে। লালনের গানের কোনো নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপি আজও পাওয়া যায়নি। যেগুলো পাওয়া যায় সেগুলো হয় প্রতিলিপি নতুবা প্রতিলিপির প্রতিলিপি। বাংলা সাহিত্যের সুখ্যাত লেখক শ্রীঅন্নদাশঙ্কর রায় বাউল-সাধনার বিভিন্ন উৎসধারার অনুসন্ধান করে দেখিয়েছেন- ইসলামি সুফিবাদ, হিন্দু বৈষ্ণববাদ আর বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনা এই তিন স্রোত এসে বাউলধারায় মিশেছে। গানে গানে লালন বলেছেন, ‘পারে কে যাবি, নবীর নৌকাতে আয়।’
আবার লালনের গানে বৈষ্ণবধারার প্রভাব লক্ষ করা যায় গোরা অর্থাৎ চৈতন্য মহাপ্রভু এবং কৃষ্ণের উল্লেখে। কৃষ্ণের আকুতি প্রকাশ করতে তিনি যেমন গেয়েছেন-
‘আর আমারে মারিস নে মা/বলি মা তোমায় চরণ ধরে/ননি চুরি আর করব না।’
লালনের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী এই তিন ধর্মীয় মতধারার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ধারাটি হলো সহজিয়া পথ। মানুষের মধ্যেই পরমকে দেখার, অনুধাবন করার পথ। লালন কখনো সেই পরমকে বলেছেন ‘মনের মানুষ’, কখনো বলেছেন ‘অচিনপাখি’, কখনো ‘অজানা মানুষ’, কখনো বা ‘অধরা চাঁদ’। লালন গেয়েছেন- ‘মিলন হবে কত দিনে?/ আমার মনের মানুষেরও সনে।’
সহজিয়া মতাদর্শ অন্যুায়ী, মানুষ নিজেকে অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরকে জানতে পারে। সামগ্রিকভাবে মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়। লালনের সাধনা ধর্মীয় নয়, মানবিক। তিনি পরমাত্মার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়তে চেয়েছেন, কিন্তু পরলোক সম্বন্ধে ছিলেন উদাসীন। স্বর্গে যাওয়ার জন্য তার কোনো ব্যাকুলতা নেই, নরকে যাওয়ার ভীতিও নেই তার মাঝে।
লালন আর তার শিষ্যরা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মের নামে শোষণের নিন্দা করেছেন। বর্ণবাদ আর ধর্মীয় ভেদাভেদের বিরুদ্ধে গান গেয়েছেন। হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে সেতু নির্মাণকে তারা নিজেদের আরাধ্য করেছেন। লালনের গান দেহকেন্দ্রিক। তিনি বিশ্বাস করেন এই মানবদেহের মধ্যেই সব আছে। এই দেহের মধ্যেই ভাবের মানুষ, মনের মানুষ, অচিন পাখি বাস করে। লালন মানবদেহকে কখনো ‘ঘর’ কখনো ‘খাঁচা’ আবার কখনো ‘আরশীনগর’ নামে ডেকেছেন। এ বিষয়ে তিনি গেয়েছেনÑ আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে/ তাকে জনম-ভর একদিন দেখলাম নারে...
মানবতাবাদী মতাদর্শ প্রচার করতে গিয়ে লালনের শিষ্যরা নানা রকম বিপদের মুখে পড়েছেন। তৎকালীন হিন্দু ও মুসলমান দুই ধর্মেরই উঁচু জাতের সমাজপতিরা তাদের বিপক্ষ অবস্থান নেয়। বিভিন্ন জায়গায় তারা বাউলদের মাথার চুল কেটে, হাতের একতারা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তবুও বাউলরা তাদের আদর্শ থেকে পিছিয়ে যায়নি। বিশেষ করে লালনের মৃত্যুর পর বাউল নির্যাতনের সংখ্যা বেড়ে যায়। বাউল শীতল শাহ্ ও ভোলাই শাহ্’র মৃত্যুর পর এমন নির্যাতন আরও বাড়ে।
ভক্ত মলম শাহ্ কারিকরের দেওয়া ১৬ বিঘা জমিসহ লালনের আখড়াবাড়ি ১৯৪৫ সালের ১১ ডিসেম্বর নিলামে উঠে যায়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে লালনের ভক্ত ইসমাইল শাহ ১০৭ টাকা ৪ আনায় ওই আখড়াবাড়ি লালনের নামে কিনে নেন। এভাবে যুগে যুগে ভক্তরাই লালনকে বাঁচিয়ে রেখেছে তাদের মনের মণিকোঠায়।
ভক্তদের প্রতি তিনি নির্দেশনা দিয়েছিলেন মৃত্যুর পর যেন কোনো ধর্মীয় শাস্ত্র অনুযায়ী তার শেষ কৃত্যানুষ্ঠান করা না হয়। যে ঘরে তিনি বাস করতেন সেই ঘরেই গর্ত করে তার লাশটিকে মাটিচাপা দিতে বলেছিলেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, সেই ঘরেই লালনকে সমাহিত করা হয় কোনো ধর্মীয় শাস্ত্র ছাড়াই।
সাধক দরবেশ হয়েও সংসার বিবাগী হননি লালন। সংসারের প্রতি তার টান ছিল। জানা যায়, এক মুসলিম নারীর সঙ্গে তিনি সংসার ধর্ম পালন করেছিলেন। ভক্তদের দেওয়া জায়গায় পানের বরজ করেছিলেন সংসার চালানোর জন্য। মৃত্যুর আগে পালিত কন্যা পিয়ারীর সঙ্গে ভোলাই শাহ্’র বিয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১২৯৭ সালের ১ কার্তিক) শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫ টায় ১১৬ বছর বয়সে মরমী সাধক লালন শাহ মৃত্যুবরণ করেন। কথিত আছে, যেদিন ভোরে তিনি পৃথিবী ছেড়ে যান সেদিনও সারা রাত ধরে আখড়ায় বাউল গান নিয়ে শিষ্যদের সময় দিয়েছেন। ভোর ৫টায় তিনি সকল ভক্তের উদ্দেশে বলেছিলেন ‘আমি চলিলাম’। এই কথার আধা ঘণ্টা পরই তিনি অনন্তলোকে যাত্রা করেন।