হেইডেন ওয়ালশের স্বপ্নপূরণ

হেইডেন রাশিদি ওয়ালশ জুনিয়ারের উত্থানটা সিনেমার সেই গল্পের মতো। নায়ক এক রকম মনস্থির করে ছুটলেন গন্তব্যে। কিন্তু পরক্ষণে সিদ্ধান্ত পাল্টে ভিন্নপথ নিলেন। এতে পাল্টে যায় জীবন। নায়কের দ্বিতীয় সিদ্ধান্তই হয়ে যায় সঠিক।

তেমনটাই ঘটেছে ২৭ বছর বয়সী হেইডেনের জীবনে। যোগ দিতে যাচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাম্পে। কিন্তু মাটি থেকে ৩৬ হাজার ফিট ওপরে বিমানে বসেই চিন্তা করলেন- না, কানাডায় টি-টোয়েন্টি লিগ খেলতে যেতে হবে। সেখান থেকে এবার বার্বাডোজ টাইড্রেন্টসে। লেগস্পিন অলরাউন্ডার হিসেবে দলের শিরোপা জয়ে রাখলেন দারুণ ভূমিকা। আর সেই পারফরম্যান্সই সুযোগ করে দিল উইন্ডিজ ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলে। সত্যিই সিনেমার মতোই!

ঘটনা গত জুলাইয়ে। হেইডেনের কাছে দুটি বিমান টিকিট। ক্যারিবিয়ান দ্বীপ সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস থেকে দুটোর ট্রানজিটই মিয়ামিতে। একটি টিকিট মিয়ামি থেকে যাবে লস অ্যাঞ্জেলেসে, যেখানে হবে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের মাসব্যাপী ক্যাম্প। আরেকটি টিকিট মিয়ামি থেকে হেইডেনকে নিয়ে যাবে টরোন্টোতে, যেখানে ‘গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি কানাডা’ টুর্নামেন্ট। ভ্যানকুবার নাইটসের হয়ে চুক্তিবদ্ধ হেইডেন। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড থেকে হেইডেনকে বলা হয় এক বছরের চুক্তি পেতে হলে ক্যাম্পে যোগ দিতেই হবে। তখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় থাকা হেইডেন নিশ্চিত হতে চাইলেন চুক্তির ব্যাপারে। যুক্তরাষ্ট্রে খেলার জন্য তার সঙ্গে চুক্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হলেই তিনি আসবেন, নইলে না। কিন্তু বোর্ড থেকে বলা হলো– আগে ক্যাম্পে যোগ দাও। বোর্ডের প্রতিশ্রুতি মতো মনকে মানিয়ে নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের পথেই পা বাড়ালেন হেইডেন। টরোন্টোর টিকিটকে ব্যাগে রেখে লস অ্যাঞ্জেলেসের টিকিট রাখলেন হাতে। সেন্ট কিটসের শহর বেসেটেরের বিমানবন্দর থেকে উঠে গেলেন মিয়ামির বিমানে। বিমানে ওঠার আগে স্ত্রীর সিদ্ধান্ত চাইলেন। প্রিয়তমা জানালেন –যারা তোমাকে সম্মান দিচ্ছে না তাদের পা বাড়ানোর দরকার নেই। তবুও কিছু সময় নিলেন হেইডেন। সেন্ট কিটস থেকে মিয়ামি তিন ঘণ্টার পথ। আটলান্টিকের ওপর বিমানের ওই মুহূর্তকে বেছে নিলেন ভাবার মোক্ষম সময় হিসেবে। যাওয়ার পথে ভাবছেন হেইডেন - অর্থেরও তো প্রয়োজন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পে গেলে সেই নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু কানাডার টুর্নামেন্টে খেললে বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ আয় সম্ভব। যেই ভাবা সেই কাজ, মিয়ামি নেমে লস অ্যাঞ্জেলেসের টিকিট রাখলেন ব্যাগে আর ব্যাগ থেকে টরোন্টোর টিকিট বের করলেন। চলে আসলেন ভ্যানকুবার নাইটসের ডেরায়। এরপর আর পেছনে ফিরতে হয়নি হেইডেনকে।

তিন মাস পর এই রবিবার যখন বার্বাডোজের হয়ে সিপিএল ফাইনালের আগে জানালেন, ‘বিশ্বাস করুন, আমার জীবনে আগে কখনই এমন পরিস্থিতি আসেনি। এতটা দ্বিধা হয়নি কোনো কিছু নিয়ে যেটা গত তিন মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দল ও কানাডার টি-টোয়েন্টি লিগ নিয়ে হয়েছিল। সেন্ট কিটস থেকে আমি দুটি সিট বুক করে মিয়ামি যাই। আমাকে বাড়তি ডলার গেছে। মিয়ামি গিয়ে সিদ্ধান্ত নিই লস অ্যাঞ্জেলেস নয় টরোন্টোতেই যাব। ওই সময় আমি জানতামও না যে বার্বাডোজে ডাক পাব, এই মৌসুমে সিপিএলের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হব বা এতটা ভালো যাবে। কিন্তু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমাকে এতটা দেওয়ার জন্য। আমি এখন উইন্ডিজ দলের সেরা একাদশে থাকার স্বপ্নে বিভোর এবং জায়গাটা পেলে তা পাকা করার চেষ্টা করব।’

এই সিপিএল সত্যিই দারুণ কেটেছে হেইডেনের। সাকিব আল হাসানদের দল বার্বাডোজের হয়ে ১৩ ম্যাচের মধ্যে দলের হয়ে মাত্র ৯ ম্যাচ খেলেছেন লেগস্পিন করা এই ক্রিকেটার। অথচ এই ক’ ম্যাচেই ৮.২৮ ইকোনমি রেটে ২২ উইকেট নিয়েছেন, যা টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ। টুর্নামেন্ট সেরার স্বীকৃতি পেয়েছেন। হেইডেনের নিকটতম উইকেট শিকারি ইমরান তাহির। তবে গায়ানা আমাজন ওয়ারিয়র্সের এই লেগি হেইডেন থেকে ৬ উইকেট পেছনে। এই পারফরম দিয়ে তো ক্যারিবীয় নির্বাচকদের নজর কেড়েছেন।

সিপিএলে দ্বিতীয়বারের মতো ডাক পেয়ে ভালো করার আত্মবিশ্বাস রেখেছিলেন হেইডেন। তাই দলে জামেল ওয়ারিক্যান ও অ্যাশলে নার্সদের মতো স্পিনার থাকা সত্ত্বেও বসে থাকতে হয়নি এই লেগস্পিনারকে, ‘বার্বাডোজে উইন্ডিজ জাতীয় দলের নয়জন ক্রিকেটার আছেন। সেখানে আমি একজন যার নিশ্চিত কোনো ক্রিকেটীয় দেশ নেই। বছরে হাতে গুনে দু-তিনটি ম্যাচ খেলি। তবুও আমি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। জানতাম একবার মাঠে নামলে কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। এই আত্মবিশ্বাসই আমাকে অনেক এগিয়ে নিয়েছে।’

নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসটা শুরু থেকেই ছিল হেইডেনের। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোতেও ভয় লাগেনি তার। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে মোট ৮ টি-টোয়েন্টি ও একটি ওয়ানডে খেলা হেইডেন জানান, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেটকে যথেষ্ট সম্মান করেছি। ওদের হয়ে খেলতে চেয়েছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কোচ পুবুদু দেশনায়েকে আমাকে অনেক পছন্দ করতেন। তার সময়ই আমি টানা টি-টোয়েন্টি খেলি। কিন্তু তিনি সরে যাওয়ার পর সব পাল্টে যায়। তারা (বোর্ড) আমাকে আগের মতো কদর করছিল না। তাই আমাকে এক বছরের চুক্তির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। এমন অবস্থায় আমি কি-ই বা করতে পারতাম। কানাডার টুর্নামেন্টের চুক্তি হারানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি খুব করে চেয়েছিলাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে। তাই যুক্তরাষ্ট্রকেও মানা করতে পারিনি। কিন্তু যখন আমার স্ত্রী আমাকে হৃদয়ের ডাক শুনতে বলল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যাওয়ার ব্যাপারে সাহস জোগাল তখন আমার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে যায়।’

কিন্তু উইন্ডিজে এত সহজেই কী করে চলে এলেন হেইডেন? নিয়ম অনুযায়ী কোনো ক্রিকেটারকে এক দেশের হয়ে খেলার পর অন্য দেশের জাতীয় দলে খেলতে হলে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। ওই সময়ে খেলতে ইচ্ছা করা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলতে হবে। কিন্তু এখানে একটু ব্যতিক্রম আছে। আইসিসির সহযোগী দেশ থেকে টেস্ট খেলুড়ে দেশের হয়ে খেলতে চাইলে এই নিয়ম নেই। তাছাড়া হেইডেনের বাবা-মা অ্যান্টিগার বংশোদ্ভূত। বাবা প্রয়াত হেইডেন ওয়ালশ সিনিয়রও লিওয়ার্ড আইল্যান্ডের হয়ে ফার্স্টক্লাস ক্রিকেট খেলতেন। তাই নিজের যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও অ্যান্টিগা পাসপোর্টের ভিত্তিতে উইন্ডিজ জাতীয় দলে ডাক পাওয়াটা সহজ হয়ে গেল এই স্পিনারের জন্য।

স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় হেইডেন ওয়ালশ জুনিয়র বলেছেন, ‘মনে পড়ে যাচ্ছে বাড়ির আঙিনায় আমি আর আমার ভাই বাবার সঙ্গে ক্রিকেট খেলার কথা। ভাবতাম কীভাবে উইন্ডিজ দলে খেলতে পারি। আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হলোৃ’।

স্বপ্ন তো পূরণ হলো। এখন দেখার কতটা দ্যুতি ছড়াতে পারেন হেইডেন ওয়ালশ জুনিয়র।