প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভুটানকে টার্গেট করে দ্রæত আন্তর্জাতিক করা হচ্ছে সৈয়দপুর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর। এজন্য ৯১৩ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। এর আগে জনমত সৃষ্টি করা হবে। কোনো বাধা ছাড়াই জমি অধিগ্রহণের জন্য স্থানীয়দের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে সৈয়দপুর যাচ্ছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মাহবুব আলী ও সচিব মহিবুল হক। এ সময় তারা বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক হলে স্থানীয়দের সুবিধার বিষয়টি তুলে ধরবেন।
বাংলাদেশের স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা থেকে নেপালের স্থলসীমান্ত কাঁকরভিটার দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার। আর ভুটানের দূরত্ব ৬৮ কিলোমিটার। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সৈয়দপুরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করলে তা ব্যবহার করবে নেপাল ও ভুটান। আর ভারতের বিরাট অংশও এই বিমানবন্দর ব্যবহার করবে। তবে এই বিমানবন্দরের ব্যবসায়িক প্রতিদ্ব›দ্বী হতে পারে ভারতের বাগডোগরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কারণ বাগডোগরা বিমানবন্দর শিলিগুড়ি থেকে ১৬ কিমি দূরে
অবস্থিত। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরের জেলাগুলোর যাত্রীসেবা দেয়। বিমানবন্দরটি জলপাইগুড়ি শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার ও দার্জিলিং শহর থেকে ৫৮ কিমি দূরে। বাগডোগরা থেকে কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই ও গুয়াহাটি শহরে বিমান যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়া এই বিমানবন্দর থেকে ভুটানের থিম্পু ও থাইল্যান্ডের ব্যাংককের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরটি থেকে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখের বেশি যাত্রীসেবা পাওয়া যায়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাগডোগরা বিমানবন্দরের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ওখানে সব প্লেন ল্যান্ড করতে পারে না। রাতে বিমানবন্দর ব্যবহারে সমস্যা আছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরের এসব সমস্যা নেই। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ভুটান। কারণ আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা কারিগরি কোনো কারণে থিম্পু বিমানবন্দরে বিমান নামতে না পারলে তখন বিমানগুলোকে দিল্লি বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এসব কারণে ভুটান অনেক আগে থেকেই সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক করার প্রস্তাব দিয়েছে। তাছাড়া নেপালও এই বিমানবন্দর ব্যবহার করবে। যদিও কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কাছে আরও দুটি বিমানবন্দর নির্মাণ করছে নেপাল। মূলত ভুটান ও নেপালকে টার্গেট করেই এই বিমানবন্দরের কাজ এগিয়ে চলছে। তবে ভারতও এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে।’
সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করার কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করার জন্য গত ২৪ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করা হয়েছে। সভায় জানানো হয়েছে, সৈয়দপুর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিকমানের করার জন্য প্রায় ৯১৩ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে নীলফামারীতে ৫৪৯ ও দিনাজপুরে ৩৬৪ একর জমি। এসব জমির মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ১১, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪৯, সৈয়দপুর সেনানিবাসের ২৩ ও রেলওয়ের ১ একর রয়েছে। এসব জমি বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার অনুক‚লে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভ‚মি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সামরিক ভ‚মি ও ক্যান্টনমেন্ট অধিদপ্তরের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সৈয়দপুর সেনানিবাসের ২৩ একর জমি হস্তান্তরে তাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে তাদেরকে সমপরিমাণ জমি দিতে হবে। সভায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরের সঙ্গে জাতীয় মহাসড়ক আরএইচডিএন-৫-এর সঙ্গে সংযোগের জন্য দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার কাছে আড়িয়াল বিলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জমি অধিগ্রহণের সময় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, এবার যেন তা না হয় সেজন্য স্থানীয়দের মধ্যে জনমত সৃষ্টি করা হবে। ২০১২ সালে আড়িয়াল বিলের জমি অধিগ্রহণের সময় সাধারণ মানুষ ওখানে বিমানবন্দর নির্মাণের বিরোধিতা করেছিল। যদিও পরে তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে সেখানেই বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছিল। তাতে সাড়া দেয়নি সরকার।
মন্ত্রী-সচিবের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠেয় সভায় নীলফামারী ও দিনাজপুরের সব সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধি, উভয় জেলার ডিসি, পুলিশের এসপি, দিনাজপুর, সৈয়দপুর ও পার্বতীপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উপস্থিত থাকবেন।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপায়ণের জন্য রানওয়ে, ড্রামপেট, অ্যাপ্রোচ লাইট, ট্যাক্সিওয়ে, প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল বিল্ডিং, কার্গো টার্মিনাল বিল্ডিং, কন্ট্রোল টাওয়ার, পাওয়ার হাউজ, পাম্ম হাউজ, ফায়ার স্টেশন, রাডার স্টেশনসহ ৩৩ ধরনের স্থাপনা দরকার হয়। এ কারণেই ৯১৩ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর হিসেবে তৈরি করার জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে। বিমানবন্দরের নকশার কাজ এর মধ্যেই শেষ হয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে হাবে পরিণত করা। পুরোপুরি আন্তর্জাতিকমানে পরিণত হতে আরও তিন-চার বছর সময় লাগবে। এই বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নানাভাবে বাংলাদেশ সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে লাভবান হতে পারে। এই বিমানবন্দরকে প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে হবে। ভিসা ছাড়া ভ্রমণের ক্ষেত্রে এয়ারসাইট ট্রান্সফার পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতে পারে। বিমানবন্দর চালু করার আগে এ বিষয়ে নীতিমালা করতে হবে। প্লেন ল্যান্ড করলে এর নেভিগেশন চার্জ, হ্যান্ডলিং চার্জ, পার্কিংসহ আরও কিছু চার্জ বিমান সংস্থাগুলোকে দিতে হবে। যে বিমান সংস্থার প্লেন ল্যান্ড করবে, তারা এসব চার্জ পরিশোধ করবে। কোনো কারণে যাত্রীদের সৈয়দপুর থাকতে হলে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। একটা কর্মযজ্ঞ সৃষ্টি হবে বিমানবন্দর ঘিরে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাবে। শুধু নেপাল ও ভুটানই উপকৃত হবে না, ভারতের নিকটবর্তী কয়েকটি রাজ্যও উপকৃত হবে।;