দারুণ ব্যস্ত সময় কাটছে জামাল ভুঁইয়ার। ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলে এসে বিশ্রামের সুযোগ পাননি। দেশে ফিরেই শেখ কামাল ক্লাব কাপ খেলতে চলে এসেছেন চট্টগ্রামে। সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব থেকে ধারে খেলছেন স্বাগতিক চট্টগ্রাম আবাহনীর হয়ে। এরই ফুরসতে জাতীয় দল নিয়ে আলাপচারিতায় অনেক কথাই বললেন হোটেল লবিতে। বলেছেন অধিনায়কত্ব নিয়েও।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জামালের পায়ের কারিকুরিও পাল্টে গেছে অনেকটাই। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জাতীয় দলের মাঝমাঠের স্তম্ভ হিসেবে। অথচ একটা সময় এই ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ডেনিশ। আততায়ীর গুলিতে শেষ হয়ে যেতে বসেছিল তার ক্যারিয়ার। অদম্য ইচ্ছেশক্তি তাকে কেবল মাঠেই ফেরায়নি, কঠোর পরিশ্রম আর মনঃসংযোগে এখন জাতীয় দলের প্রাণকেন্দ্রও তিনি।
বদলে যাওয়া বাংলাদেশ নিয়ে ব্যাপক উন্মাদনা ফুটবলভক্তদের মাঝে। জামালের নেতৃত্বে এই বাংলাদেশ এর মধ্যেই নিজেদের ফুটবল সামর্থ্যরে প্রমাণ রেখেছেন বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্রথম তিন ম্যাচে। ইংলিশ কোচ জেমি ডে’র আস্থাই কেবল আদায় করে নেননি জামাল, সেই সঙ্গে দারুণ এক জুটি গড়ে জাতীয় দলের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছেন আত্মবিশ্বাস। সুবাদে বাংলাদেশ এখন বুক চিতিয়ে খেলতে পারে যে কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে।
শনিবার জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন যেতেই বললেন, ‘আমি আসলে জানি না অধিনায়ক হয়ে আমি কতটা আলোচনায় এসেছি। এর কারণ আমি টিভিও দেখি না, স্থানীয় পত্রিকাও পড়ি না। তবে আমি খুশি যে এই দায়িত্ব আমাকে আরও বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছে। এখন আমি আরও নিবেদিত মাঠে ও মাঠের বাইরে।’
জাতীয় দলের আর্মব্যান্ডটা জামালের বাহুতে উঠেছে খুব বেশি দিন হয়নি। গত বছর এশিয়ান গেমসে সিনিয়র কোটায় খেলার সুবাদে দলকে নেতৃত্ব দেন। তার চোখ ধাঁধানো এক গোলে কাতারকে হারিয়ে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিতীয় পর্বে নাম লেখায় বাংলাদেশ। এর পর থেকে তার ওপর আস্থা রেখেছেন কোচ জেমি ডে।
অধিনায়কত্বটা জামালও উপভোগ করছেন। তবে মনে করেন এটা অনেক বড় দায়িত্ব, ‘যখন আপনি একটি দলের অধিনায়ক হবেন, তখন আপনাকে কেবল বললেই চলবে না, মাঠে অনেক কিছুই করে দেখাতে হবে। আবার অনেক কিছু করাও যাবে না। কেবল মাঠ নয়, মাঠের বাইরেও একজন অধিনায়কের অনেক দায়িত্ব। আপনাকে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে ভেবেচিন্তে। কারণ দল যখন ব্যর্থ হবে তখন তার দায়ভার প্রথম আপনার ওপর এসে পড়বে।’
কাতার ও ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ যে ফুটবল খেলেছে তা ছিল প্রত্যাশারও বেশি কিছু। এর রহস্যটা খোলাসা করেছেন জামাল, ‘অধিনায়ক হিসেবে আমি সতীর্থদের একটা কথাই বলেছি, জাতীয় দলের জার্সিতে যদি তুমি ভালো খেলো তবে দেশে-বিদেশের ক্লাবগুলো তোমার দিকে নজর দেবে। তারা বুঝতে পারবে বাংলাদেশও লড়াকু ফুটবল খেলতে পারে। তা ছাড়া আমাদের দলের এখন যারা খেলছে তারা সবাই প্রায় তরুণ। তারা চায় কিছু করে দেখাতে। তারা কোচের দিক নির্দেশনা মেনে চলে এবং চেষ্টা করে নিজের সেরাটা দিয়ে দিতে। ধরে নিতে পারেন ভালো খেলার পেছনে এটাও একটা বড় কারণ।’
ফুটবলারদের এই পরিবর্তনে কোচ জেমি ডে’র কৃতিত্ব দেখছেন জামাল, ‘জেমি দায়িত্ব নিয়ে দলটিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছেন। আমাদের খাদ্যাভ্যাস, ফিটনেসে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছেন। এখন আমরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করি। আমর এখন যে পরিকল্পনায় খেলি সেটা পুরোপুরি আলাদা। কোচ যেহেতু নিজেই তরুণ। আর কিছুদিন আগেও খেলেছেন, তিনি জানেন কীভাবে ফুটবলারদের নিয়মের মধ্যে আনা যায়। তা ছাড়া তিনি আমাদের সামর্থ্য সম্পর্কেও ভালো ধারণা রেখে তার কৌশল সাজান। আসলে জেমির অধীনে আমরা এখন বেশ গোছানো একটা দল।’
ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের রাস্তায় হঠাৎ বন্দুকধারীর চারটে গুলি যখন শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, জামাল তখন ভেবেই নিয়েছিলেন আর ফুটবল খেলা হবে না তার। সেই জামালই ফুটবলের টানে নিজেকে গড়ে তুলেছেন ইস্পাত দৃঢ় মানসিকতায়। দারুণ আত্মবিশ্বাসী এই জামালের হাতে তাই অনায়াসেই তুলে দেওয়া যায় বাংলাদেশের পতাকা।