ভোলার বোরহানউদ্দিনে ফেইসবুকে মহানবী (সা.)-এর অবমাননা করে বক্তব্য প্রচারের সূত্র ধরে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একদল মানুষের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষে চারজন নিহত ও পুলিশসহ দেড়শতাধিক আহত হয়েছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক যুবকের ফেইসবুক আইডির মেসেঞ্জার থেকে গত শুক্রবার মহানবীকে (সা.) নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য ছড়ানো হয়। পুলিশ বলছে, গত শুক্রবার রাতে ওই যুবক থানায় এসে তার ফেইসবুক আইডি হ্যাকড হওয়ার অভিযোগ করে জানায় যে, তার ওই হ্যাকড হওয়া আইডি থেকে এরকম বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। ঘটনার পর পুলিশ ওই যুবককে হেফাজতে নিয়ে তার সাহায্যে আইডি হ্যাক ও মহানবীকে (সা.) অবমাননা করে বক্তব্য প্রচারের অভিযোগে গত শনিবার শাকিল শরীফ (২০) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে।
গতকাল রবিবার বেলা ১১টার দিকে শুরু হয়ে দফায় দফায় চলা এই সংঘর্ষে নিহতরা হলেন মাহাবুব রহমান (৩০), মাহফুজ পাটোয়ারী (২৩), মিজান (৩০) ও শাহীন (২৮)। আহতদের মধ্যে ৪৭ জনকে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে আরও ৩৫ জনকে। এছাড়া বুকে ও হাতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক পুলিশ সদস্যকে হেলিকপ্টারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়রা দেশ রূপান্তরকে জানায়, গত শুক্রবার মহানবীকে (সা.) নিয়ে কটূক্তির পর গতকাল রবিবার বেলা ১১টার দিকে বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মাঠে ‘সর্বস্তরের তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ওই বিক্ষোভ মিছিলটি না করার জন্য বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মসজিদের ইমাম মাওলানা জালাল উদ্দিন এবং বাজার মসজিদের ইমাম মাওলানা মিজানকে পুলিশ অনুরোধ জানায়। এছাড়া সাধারণ মানুষ আসার আগেই বিক্ষোভ কর্মসূচি বন্ধ ঘোষণা করতে বলে পুলিশ। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ওই দুই ইমাম সকাল ১০টার দিকে কর্মসূচিতে অংশ নিতে রওনা হওয়া সব মানুষ আসার আগেই দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে বিক্ষোভ মিছিলটি শেষ করেন। কিন্তু ততক্ষণে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ ঈদগাহ ময়দানে এসে জড়ো হন। তারা ‘নবী অবমাননা’ ও ‘আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তিকারীর ফাঁসি চাই’ সেøাগান দিয়ে সমাবেশস্থলে আসেন। একপর্যায়ে তারা ওই দুই ইমামের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সেখানে মোতায়েন পুলিশ সদস্যদের ওপর চড়াও হয়। তখন পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে ওই মসজিদের ইমামের কক্ষে আশ্রয় নেন। এসময় উত্তেজিত মানুষ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকলে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে সেখানে জমায়েত হওয়া মানুষ আরও উত্তেজিত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এরপর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ মানুষের সংঘর্ষ হয়। এতে চারজন নিহত এবং ১০ পুলিশ সদস্যসহ দেড়শতাধিক আহত হন। নিহতদের মধ্যে এক মাদ্রাসাছাত্র এবং এক কলেজ ছাত্র রয়েছে।
সংঘর্ষের পর পুরো জেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বোরহানউদ্দিনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য এবং চার প্লাটুন বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
সংঘর্ষের ব্যাপারে জানতে চাইলে ভোলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়ছার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোরহানউদ্দিনে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে এক যুবকের ফেইসবুক আইডি হ্যাকড হয়েছে। আমরা এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ইতিমধ্যে আটক করেছি। আমরা এ নিয়ে গত রাতে (শনিবার রাতে) স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছিলেন, আজকের (রোববার) প্রোগ্রাম হবে না। কিন্তু সকাল থেকে আমাদের কাছে খবর আসে যে সেখানে মাইকিং হচ্ছে এবং স্টেজ বানানো হচ্ছে। পরে সেখানে গিয়ে আমরা উপস্থিত মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলি এবং আমি নিজে সেখানে বক্তব্য দিয়েছি। তারা সবাই আমার বক্তব্য শুনেছেন। যখন আমি স্টেজ থেকে নেমে আসি তখন একদল উত্তেজিত জনতা আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা তখন আত্মরক্ষার্থে একটি রুমে গিয়ে আশ্রয় নিই। যখন তারা আমাদের রুমের জানালা ভেঙে ফেলছে তখন আমরা প্রথমে শটগানের ফাঁকা গুলি ছুড়ি। এতে কাজ না হওয়ায় পরে ওপরের দিকে গুলি চালাই। এতে আমার জানা মতে একজন পুলিশ সদস্য বুকে গুলি লেগে গুরুতর আহত হন। আমরা আহত অবস্থায় যাদের হাসপাতালে পাঠিয়েছি তাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। তবে আরও কেউ নিহত থাকতে পারেন, সে তথ্য আমাদের কাছে নেই।’
ভোলার সিভিল সার্জন রথীন্দ্রনাথ মজুমদার গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজনের মরদেহ এবং সদর হাসপাতালে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ রাখা হয়েছে। এছাড়া আব্দুল গণি নামের আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।’
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, ভোলায় পুলিশ-জনতার সংঘর্ষে আহত ২৮ জনকে তার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বোরহানউদ্দিনে ৪ প্লাটুন বিজিবি ও ১ প্লাটুন কোস্টগার্ড মোতায়েন : পুলিশের সঙ্গে ‘তৌহিদী জনতার’ সংঘর্ষের পর বোরহানউদ্দিনে চার প্লাটুন (প্রতি প্লাটুনে ৩০ জন) বিজিবি এবং এক প্লাটুন কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ-গ্রামবাসীর সংঘর্ষের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদার আলোকে বোরহানউদ্দিনে জরুরি ভিত্তিতে চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের হেলিকপ্টারযোগে সেখানে পাঠানো হয়েছে। তারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করবেন। তারা এলাকায় টহল দিয়েছেন।’
অন্যদিকে কোস্টগার্ড জানিয়েছে, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়’ বোরহানউদ্দিন উপজেলায় এক প্লাটুন কোস্টগার্ড সদস্য কাজ করছেন।
ভোলায় আজ ‘ইসলামী তৌহিদী জনতা’র সমাবেশ : বোরহানউদ্দিনে সংঘর্ষের পর গতকাল বিকালে ভোলা সদর হাসপাতালের সামনে বেশ কয়েকবার ‘ইসলামী তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভের চেষ্টা চালায় কিছু মানুষ। কিন্তু পুলিশ ও র্যাবের বাধায় ব্যর্থ হয়ে তারা ভোলা প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করেন। সেখান থেকে ভোলার পুলিশ সুপার ও বোরহানউদ্দিন থানার ওসির প্রত্যাহার এবং ‘কটূক্তি করা’ বিপ্লব চন্দ্র শুভর ফাঁসির দাবিসহ ৬ দফা দাবি জানানো হয়। এছাড়া একই দাবিতে আজ সকাল ১১টায় ‘ইসলামী তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন জায়গায়ও গতকাল বিক্ষোভ হয়েছে একই ব্যানারে।
জামায়াতের সঙ্গে ছিল আওয়ামী লীগ-বিএনপির কর্মীরাও : তৌহিদী জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়া অনেকেই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, সকাল ১০টার দিকে ‘তৌহিদী জনতা’র নেতৃত্ব দেওয়া মিছিলে জামায়াত ও শিবিরের পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, বিএনপি ও ওলামা দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।
এদিকে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নিহত চার জনের একজন বোরহানউদ্দিন পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মিরাজ পাটোয়ারীর ভাই মাহফুজ পাটোয়ারী। বাকি তিনজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা জানান, তৌহিদী জনতার মিছিলের প্রথম সারিতে ব্যানার হাতে থাকা আয়াত উল্লাহ শিবিরের একজন সক্রিয় কর্মী। তার বাবা মো. অজিউল্ল্যাহ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কোষাধ্যক্ষ। তার দুজন পরেই ব্যানারের অগ্রভাগে থাকা আশিক প-িত বোরহানউদ্দিন আলিয়া মাদ্রাসায় শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন।
এ ছাড়া স্থানীয় ওলামা দলের সভাপতি মোহতাসিম বিল্লাহর নেতৃত্বে বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষকরা বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেন। একটি মাদ্রাসার এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্দোলনে অংশ নিতে কে বা কারা হাতে লেখা একটি চিঠি বিভিন্ন মাদ্রাসায় পৌঁছায়।