ভয়ে ঠিকাদাররা কাজে ধীরগতি

অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী চলমান অভিযানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। সরকারের এ অভিযানের পর অনেক ঠিকাদার খুব একটা জনসম্মুখে আসছে না। প্রকল্প এলাকাগুলোতে নামমাত্র শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে। আবার অনেক উন্নয়নমূলক কাজের দরপত্রে অনেক কাউন্সিলর বেনামে অংশ নিয়ে তা পেয়েছেন। এ অভিযানে এই ধরনের অনেক কাউন্সিলরও আতঙ্কে থাকায় তাদের হাতে থাকা কাজগুলোতেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর অনেক কর্মকর্তাও চাপে রয়েছেন। সব মিলিয়ে এক ডজন ঠিকাদার ও বেনামে কাজ নেওয়া একাধিক কাউন্সিলরের হাতে থাকা প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সরকারদলীয় প্রভাবশালীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বেশিরভাগ দরপত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়া শুরু করেন সংসদ সদস্য নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন। প্রশাসকদের দীর্ঘ শাসনামলে এমপি শাওনের একচ্ছত্র প্রভাব থাকলেও সাঈদ খোকন ডিএসসিসির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আগের আমলের অর্থাৎ সাদেক হোসেন খোকার আশীর্বাদপুষ্টরা সমানতালে কাজ নিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে উন্নয়ন কাজে ভাগ বসান কয়েকজন কাউন্সিলরও। নিয়ম অনুযায়ী কাউন্সিলররা নিজ নামে ঠিকাদারি কাজে অংশ নিতে না পারায় তারা নিজেদের ঘনিষ্ঠ লোকজনের প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নেন। চলমান অভিযানে কয়েকজন কাউন্সিলর ও ঠিকাদার গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছেন।

ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান, এমপি শাওন ছাড়াও ডিএসসিসিতে ঠিকাদারি করছেন এর মধ্যে ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন আহম্মেদ রতন, ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিসুর রহমান, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অপসারিত কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ, ১০ নম্বর ওয়ার্ডের মারুফ আহমেদ মনসুর, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোস্তফা জামান পপি, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাসিবুর রহমান মানিক, ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন অন্যতম। এছাড়া বিএনপিপন্থি ঠিকাদার জি কে এন্টারপ্রাইজের মালিক গোফরান, ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক নুরু ভূঁইয়া, মামিকো এন্টারপ্রাইজের অপু, সাদেক হোসেন খোকার ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচিত আবুল অ্যান্ড ব্রাদার্সের আবুল হোসেন, গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা সরকার, জেএসএমসিডব্লিউ বিডির মালিক লিয়াকত সিকদার, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা তাপস কু-, ইউনাইটেড কমার্শিয়ালের মালিক খসরু, মহসিন আলী মাখন, আমিনুল হক বিপ্লব, জসিমউদ্দিন সবুজেরও কাজ চলমান রয়েছে। খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তারের পর বেশ কয়েকজন ঠিকাদার নগর ভবনে খুব একটা যাচ্ছেন না। আর কেউ কেউ প্রকল্প এলাকায় নামমাত্র শ্রমিক পাঠাচ্ছেন।

৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর আর কোনো দরপত্রে অংশ নিই না। অন্য নামে নেওয়ার অভিযোগও ঠিক না।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১ হাজার ২১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে মেগা প্রকল্পের আওতায় ১৩১ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার রাস্তা, ২৫ দশমিক ৪০ কিলোমিটার ফুটপাত, ১৩০ দশমিক ১৬ কিলোমিটার ড্রেন, ১৯টি পার্ক ও ১২টি খেলার মাঠ উন্নয়ন, ৪৭টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ১৭টির সংস্কার, কবরস্থান উন্নয়ন, শিশুপার্ক নির্মাণসহ ১১টি ক্লিনার কলোনি নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া ৭৭৩ কোটি ৯৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যয়ে শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল এবং সারুলিয়া এলাকার সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১৫২ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার রাস্তা, ১৫৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নর্দমা, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার ফুটপাতসহ ১৪৩ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার এলইডি লাইট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।

প্রকৌশল বিভাগ থেকে জানা যায়, ৫১৫ কোটি ৫৫ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ডেমরা, মা-া, নাসিরাবাদ ও দক্ষিণগাঁও এলাকার সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৮১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার রাস্তা, ৭ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণ, ১২টি আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ, ৬১ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও ১১৬ দশমিক ১৮ কিলোমিটার রাস্তায় এলইডি বাতি স্থাপন করার কাজ চলমান রয়েছে। এ কাজগুলো বেশিরভাগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। তাই নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, দি বিল্ডার্স লিমিটেডের নামে ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন রতন দুটি বড় প্রকল্পের কাজ নিয়েছেন। নিজ জেলার বাসিন্দা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্বপনের প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া এ কাজটি চলমান অভিযানের পর গতি কমে গেছে। কাউন্সিলর রতন সম্রাট, জি কে শামীম আর খালেদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অনেকটাই আতঙ্কে আছেন। তাই চাঁনখারপুল মোড়ে ডিএসসিসির মার্কেট নির্মাণের কাজটিও প্রায় থেমে আছে। এরই মধ্যে নামমাত্র কাজ করে প্রায় ৮ কোটি টাকা বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। একই অবস্থা ওসমানী উদ্যানে ‘গোস্বা নিবারণী’ পার্কের। কয়েক দফা ব্যয় বাড়িয়ে এ পার্কের খরচ এখন শতকোটি টাকার ওপরে। এ পার্কের কাজটিও কাউন্সিলর রতন দি বিল্ডার্সের নামে নিয়েছেন। সেখান থেকেও প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার বেশি বিল তুলে নিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তবে ডিএসসিসিতে কোনো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই এমন দাবি করে কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন রতন বলেন, ‘আমি বিদ্যুৎ ভবনে ঠিকাদারি করি। দি বিল্ডার্সের মালিক স্বপন আমার এলাকার ও পরিচিত হলেও কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।’