সোমবার হঠাৎই খবরটা আসে। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসছেন ক্রিকেটাররা। বোর্ডের সঙ্গে ক্রিকেটারদের বিদ্রোহ- এ গুঞ্জনই চলতে থাকে সংবাদকর্মীদের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলনে বিসিবির কাছে ১১ দাবি পেশ করে ধর্মঘটের ডাক দেন ক্রিকেটাররা।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বলছে, ক্রিকেটারদের এ আন্দোলন তারা জেনেছে সংবাদমাধ্যমে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সুজন মুখোমুখি হয়েছিল সংবাদমাধ্যমের।
তিনি বলেন, ক্রিকেটারদের এই আন্দোলনকে ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে মনে করছে না বিসিবি। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথাও জানান তিনি।
ক্রিকেটাররা যে দাবিগুলো জানিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সবচেয়ে বড় কথা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট জাতীয় লিগ চলমান। রবিবারই শেষ হয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা। এর মধ্যে এই আন্দোলন। ওদিকে ভারত সফর সামনে। ক্রিকেটারদের এই আন্দোলনের কারণে ভারত সফরও এখনই অনিশ্চিত।
তাহলে ক্রিকেটাররা কি শুধু নিজেদের স্বার্থের কথাটাই ভাবলেন? সাকিব, তামিম, মুশফিকদের পেশ করা ১১ দাবি আসলে তা বলে না। টেস্ট মর্যাদা পাওয়া প্রায় ২০ বছর হতে চলল। অথচ এখনো শক্তিশালী ঘরোয়া অবকাঠামোই দাঁড়ায়নি দেশে। সাকিবদের এই দাবির মধ্যে গুরুত্ব পেয়েছে এই অবকাঠামোগত উন্নয়নই। সাকিবদের আন্দোলনকে তাই ‘ক্রিকেটের স্বার্থেই আন্দোলন’ বলতে হয়।
সব ক্রিকেটারদের হয়ে এ ১১ দাবি তুলে ধরেন ১০ ক্রিকেটার। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান দুটি দাবির কথা তুলে ধরেন। সঙ্গে আন্দোলনের ডাকটা দেন তিনি নিজেই।
সাকিব যেমন দাবি পেশ করার একপর্যায়ে বলছিলেন, ‘প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগের মান আমরা সবাই জানি। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অনেক সময় এসেছে যে, আমাদের মান আসলে কোন পর্যায়ের। ম্যাচ খেলতে যাওয়ার আগে অনেক সময় জেনে যাই, কোন দল জিতবে কোন দল হারবে। এটি আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। এ জিনিসটি ঠিক করা খুবই জরুরি বলে আমরা মনে করি।’
সাকিব ছাড়া কথা বলেছেন- তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিম, এনামুল হক জুনিয়র, এনামুল হক বিজয়, জুনায়েদ সিদ্দিকি, নাঈম ইসলাম, নুরুল হাসান ও ফরহাদ রেজা। সবার কথাতেই যে দাবিগুলো এসেছে সবগুলোই আসলে রুগ্ণ ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো থেকে মুক্তির মাধ্যম। দেখার বিষয় বিসিবি এখন কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
যে ১১ দফা দাবি ক্রিকেটারদের:
১. ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (কোয়াব) সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করবেন ক্রিকেটাররাই। এসেছে ক্রিকেটারদের প্রাপ্ত সম্মানের প্রসঙ্গ।
২. ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজিত হতে হবে আগের ফরম্যাটে। যেখানে খেলোয়াড়দের দল পছন্দ করার সুযোগ থাকবে। কত টাকায় খেলবেন সেই স্বাধীনতা থাকতে হবে।
৩. এবারের আসর শেষে পরের আসর থেকে বিপিএল অবশ্যই ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক হতে হবে। বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে স্থানীয় ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিকের সামঞ্জস্য রাখতে হবে। ড্রাফটে ক্রিকেটাররা কে কোন গ্রেডে থাকবেন, সেটা বেছে নেবার অধিকার দিতে হবে ক্রিকেটারদের।
৪. প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটাররা খুবই কম ম্যাচ ফি পান। ম্যাচ ফি অন্তত ১ লাখ টাকা হতে হবে। পুরো দেশে প্র্যাকটিসের জন্য মাঠ, ইনডোর নেট, জিম ইত্যাদি বাড়াতে হবে। মানসম্পন্ন বল ও খেলোয়াড়দের দৈনিক ভাতা বাড়াতে হবে। টিম হোটেল অবশ্যই ওয়ান অথবা টু স্টার হতে হবে। যেখানে অবশ্যই সুইমিং পুল থাকতে হবে।
৫. বিসিবির চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে। তাদের বেতন বাড়াতে হবে।
৬. গ্রাউন্ডসম্যান, স্থানীয় কোচ, আম্পায়ার, ফিজিও ও ট্রেনারদের পেশাদারিত্ব আনতে তাদেরও বেতন-ভাতা বাড়াতে হবে।
৭. ঘরোয়া দুটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট আসর আছে। কিন্তু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির ক্ষেত্রে সেটি নেই। এই দুটি ফরম্যাটে আরো একটি করে আসর যোগ করতে হবে।
৮. ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার থাকতে হবে।
৯. বিপিএল ও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের বকেয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
১০. যখন জাতীয় দলের খেলা থাকবে না তখন ক্রিকেটারদের দেশের বাইরে একাধিক (দুটির বেশি) ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলার সুযোগ দিতে হবে।
১১. পাইপলাইন উন্নত করতে হবে। আর এ জন্য অবশ্যই ঘরোয়া টুর্নামেন্টের উন্নতি করতে হবে।