যেমন ব্যবস্থা, তেমন অবস্থা। নিয়ত ও চেষ্টা যেমন, তার ফলও হয় তেমনই। এটা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ব্যবস্থার পরিবর্তন না করলে অবস্থার পরিবর্তন হওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ব্যবস্থার পরিবর্তন হঠাৎ চমকিত করা একটা অভিযান দিয়ে হয় না। কিছু বিচারবহিভর্‚ত হত্যা বা গুম খুনের ভয় দেখিয়েও হয় না। ব্যবস্থার পরিবর্তন একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর জন্য একটা নিয়ত বা পরিকল্পিত ইচ্ছা থাকতে হয়। সে অনুযায়ী চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়। তবেই ধীরে ধীরে ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে।
রাজনৈতিক দল ও ব্যবস্থা রাখবেন দুর্বৃত্তায়নের। কিন্তু চাইবেন মানবিক ও সৎ রাজনীতি। সেটা তো হবে না। শাসনব্যবস্থা রাখবেন দুর্নীতিপ্রবণ। কিন্তু চাইবেন সৎ-স্বচ্ছ শাসন। সেটা অসম্ভব। সরকার পরিচালনায় থাকবেন অন্যায্য পথে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা জনপ্রতিনিধিত্বহীনরা। অথচ তাদের কাছে চাইবেন জনকল্যাণমূলক আচরণ ও কাজ। তা তো হওয়ার নয়। রাষ্ট্রব্যবস্থা রাখবেন শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালনের, রাষ্ট্রব্যবস্থায় পাকাপোক্ত করবেন বিত্তশালীদের আধিপত্য। আবার চাইবেন সম-অধিকার, ন্যায়-বিচারের অবস্থা। এটা তো হতে পারে না।
রাজনীতির কথাই ধরুন। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যাবে, দলের ভেতরেই গণতান্ত্রিকচর্চার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। কমিটি করা, নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে অর্থের লেনদেনের অভিযোগ সবগুলো বড় দলের বিরুদ্ধেই আছে। কে কার লোক, কে কার আত্মীয়, কে কত টাকার মালিক সেসব বিবেচনা পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত দলগুলোর পক্ষে দেশের গণতান্ত্রিক পথ-পদ্ধতির ধারাবাহিকতায় ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখা অসম্ভব। যে রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদরা দেশ পরিচালনা করবেন, তারাই যদি হন অনৈতিক, তারাই যদি হন অগণতান্ত্রিক, তারাই যদি হন জালিয়াত, দুর্নীতিগ্রস্ত, তাদের থেকে কী করে ভালো কিছু আশা করা যায়? দীর্ঘদিন ধরে এসব অনাচারকে পৃষ্ঠপোষকতা করে নির্বিঘ্নে চলতে দিয়ে মেজাজ-মর্জিমাফিক হঠাৎ একটা অভিযান, কিছু গ্রেপ্তার, গুটিকয়েক বিচারবহিভর্‚ত হত্যা দিয়ে দেশে যে সুশাসন আনা যায় না, সেটা যারা এসব করছেন তারাও হয়তো জানেন। তবু অভিযান চালাতে হয়, চালানও। কখনো ঘরের ভেতরের ঘর ঠিক রাখতে, কখনো লোক দেখানোর জন্য এসব অভিযান চালাতে হয় বটে। কিন্তু আখেরে কোনোই লাভ হয় না।
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ঘুষ, দুর্নীতি, দুঃশাসন, ক্ষমতাসীনদের সম্পদের পাহাড় গড়ার কথা কি এগারো বছর পর এখনই জানা গেল? যে কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে একযুগ বা অর্ধযুগ আগে, সে কথায় মৃদু নাড়াচাড়া শুরু হলো এখন! তাও খোলশে-পুঁটির পালে! দেশে সরকারি নিয়োগের এমন কোনো সেক্টর নেই যা ঘুষ, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির থাবামুক্ত। সংবাদমাধ্যমে আসা অসংখ্য রিপোর্টের মধ্যে কয়েকটা মনে করার চেষ্টা করা যাক। ‘টাকা দিলেই নিয়োগ’ শিরোনামে ইত্তেফাক (২০ আগস্ট, ২০১৭) লিখেছিল, টাকা দিলেই এখন নিয়োগ পাওয়া যায়! সে যে ধরনের চাকরিই হোক না কেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে আধা-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি বা পিয়ন পদে চাকরির জন্যও ঘুষ দিতে হয়। ... এখন পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি নিতেও ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এসআই বা সার্জেন্ট পদে ঘুষের পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। সরকারের প্রশাসনে, দপ্তর-অধিদপ্তরের সর্বত্রই এখন চলছে একচেটিয়া ঘুষের রাজত্ব।
বাংলাদেশ প্রতিদিন (৪ এপ্রিল, ২০১৭) লিখেছে, সরকারি নিয়োগে ভয়াবহ বাণিজ্য। দপ্তরি, পিয়ন, ঝাড়–দার, শিক্ষক নিয়োগেও লাখ লাখ টাকার ঘুষবাণিজ্য, পুলিশ নিয়োগে দরদাম হাঁকানো হয়, টিআর-কাবিখার বড় অংশ যায় জনপ্রতিনিধিদের পকেটে। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ লেনদেন এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে এলাকাভেদে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ পাচ্ছেন অপেক্ষাকৃত অযোগ্যরা। অন্যান্য শিক্ষক নিয়োগেও নেওয়া হয় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা। ঘুষ ছাড়া চাকরি পাওয়া দায় পুলিশে। এলাকাভেদে একজন কনস্টেবল নিয়োগে গুনতে হয় ৪ থেকে ৮ লাখ টাকা। এসআই বা এএসআই পদে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা।
এই যে ঘুষ, মেগা দুর্নীতি এই অর্থের বড় অংশই যে বিদেশে পাচার হয়ে যায়, তা বিভিন্ন রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে। তবে কিছুটা যে দেশে থেকে যায়, তার নমুনা ক্ষমতাসীনদের ফুলেফেঁপে ওঠা সম্পদে কদাচিৎ অনুমান করা যায়। পাঁচ বছরেই সম্পদের পাহাড় শিরোনামে প্রথম আলো, ২১ ডিসেম্বর ২০১৩ লিখেছিল, গত পাঁচ বছরে প্রায় পাঁচ কোটি টাকায় ৭০ একর জমি কিনেছেন। তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনটি নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। গাজীপুরে কিনেছেন তিন একর জমি। হাতে আছে আরও প্রায় ৪৪ লাখ টাকা। স্ত্রী ও নিজের নামে শেয়ার কেনা আছে ১ কোটি ২২ লাখ টাকার। ১ কোটি ১৮ লাখ টাকায় দুটি গাড়িও কিনেছেন। এই ‘সফল’ ব্যক্তিটি হলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। বিপুল এই সম্পদের হিসাব তার নিজেরই দেওয়া। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হলফনামায় হানিফ এ তথ্য দিয়েছেন। তবে এই হিসাবের বাইরে বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
আর আওয়ামী লীগ সরকারের এক কনিষ্ঠ এমপির সম্পদের ভাÐারের বিবরণ ছয় বছর আগেই বাংলাদেশ প্রতিদিন (২৪ ডিসেম্বর, ২০১৩) দিয়েছে। তার স্ত্রী কর্মজীবন শুরু করেন নাটোরের সিংড়া সদরের দমদমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে। ২০০৮ সালে তার সম্পদ বলতে ছিল সর্বসাকল্যে ১৫ শতক মাঠের জমি, ব্যাংকে ৫০ হাজার টাকা, নগদ ১০ হাজার টাকা, ১০ ভরি সোনা, ২৫ হাজার টাকা দামের একটি রেফ্রিজারেটর ও ১০ হাজার টাকা দামের একটি মোবাইল ফোন। ঠিক পাঁচ বছরের মাথায় এখন তিনি ভিশন বিল্ডার্স লিমিটেড কোম্পানির ৮০ ভাগ শেয়ারের মালিক। এখন তার সঞ্চয়পত্র আছে ২০ লাখ টাকার, ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি অত্যাধুনিক প্রাইভেট কার। সোনা ১০৩ ভরি ও নগদ রয়েছে ১০ লাখ ও ব্যাংকে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৮৭৩ টাকা। একটি ডেস্কটপ ও একটি ল্যাপটপ, এসি ও ফ্রিজ। খাট, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল, সোফা, আলমারি, ওয়্যারড্রবসহ সোনা এবং সব ইলেকট্রনিকস সামগ্রী এই শিক্ষিকা উপহার হিসেবে পেয়েছেন বলে তিনি এগুলোর দাম জানেন না। আগে ১৫ শতক জমির মালিক হলেও এখন তার মালিকানায় রয়েছে ৭৬২ শতক জমি। এর মধ্যে সিংড়া পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে ৩০০ শতক অকৃষি জমিও উপহার হিসেবে পেয়েছেন বলে এর দামও তিনি জানেন না!
২০০৮ সালে ওই এমপির ব্যাংকে জমা ছিল ২০ হাজার টাকা। নগদ ছিল ৩০ হাজার আর সঞ্চয়পত্র ছিল ১৮ হাজার টাকার। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ছিল ৩০ হাজার টাকার একটি কম্পিউটার, ২০ হাজার টাকার একটি মোবাইল আর ৮০ হাজার টাকার আসবাবপত্র। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ছিল এক বিঘা কৃষিজমি ও ১৮ শতক ভিটাজমি, দুটি দোকানঘর আর একটি গুদাম। বার্ষিক আয়-ব্যয় উভয়ই ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা। চার খালাতো ভাই, দুলাভাই, চাচা ও দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দান ও ঋণ নিয়ে নির্বাচনী খরচ চালানো এমপির পাঁচ বছর পরে বর্তমান বার্ষিক আয় ২৫ লাখ ১১ হাজার ৫২ টাকা বলে তিনি দশম সংসদ নির্বাচনে তার হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। এখন তার ব্যাংকে রয়েছে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৪০৪ টাকা, নগদ দুই লাখ, বন্ড ও সঞ্চয়পত্র আছে ৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকার। সাড়ে তিন কোটি টাকা দামের ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো অত্যাধুনিক পাজেরো গাড়ি এমপি হিসেবে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কিনেছেন মাত্র ৪৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬২২ টাকায়। এখন তার রয়েছে ৪১ ভরি সোনা, দুটি ডেস্কটপ, একটি ল্যাপটপ, এসি, ফ্রিজ। জমি কিনেছেন আরও সাত বিঘা ১১ শতক, উপহার পেয়েছেন ৪ শতক, দোকান দুটি থেকে বেড়ে হয়েছে চারটি, সঙ্গে দোতলা ভবন। স্ত্রীর মতোই তার সোনা, সব ইলেকট্রনিকস সামগ্রী উপহার পাওয়ায় তিনি এগুলোর মূল্য কত জানেন না। তবে শুধু দুজনের উপহার পাওয়া সোনার বর্তমান বাজার মূল্য ৬১ লাখ টাকা। ‘উপহার’ বাদেই এবার তিনি অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন ১ কোটি ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৯৯ টাকার। অথচ ২০০৮ সালে আসবাবপত্র, কম্পিউটার মোবাইলসহ তার অস্থাবর সম্পদ ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকার।
ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নারায়ণঞ্জের সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্যর হাতে তো আলাদিনের চেরাগ আছে বলে চার বছর আগেই জানিয়েছিল দৈনিক যুগান্তর (২ আগস্ট ২০১৫)। পত্রিকাটি লিখেছিল, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, মাত্র ৫০০ টাকার মালিক ৭ বছরের মাথায় শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। বৈধ কাগজপত্রেই এর প্রমাণ রয়েছে। যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধানেও তার কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ মিলেছে। চার বছর পর এই ক্যাসিনো-দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মনে পড়েছে, তার সম্পদের তথ্য জানা প্রয়োজন! সংবাদমাধ্যমে সরকারি দলের এমন বহু নেতার আমলনামা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই অভিযোগগুলো সত্যি কি না তা স্পষ্ট করার জন্যও যে তদন্ত করা প্রয়োজন সে উপলব্ধিটাও কখনো দৃশ্যমান হয়নি। আর যাদের বিষয়ে রিপোর্ট হয়নি, তারা যে অবৈধ সম্পদের মালিক হননি, এমনটি ভাবারও কোনো কারণ নেই। যে রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এভাবে লাগামহীন ঘুষ, দুর্নীতিকে লালন করে, যে ব্যবস্থা রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে অবৈধ পথে অঢেল সম্পদের মালিক হতে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, সে ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে লোক দেখানো অভিযানের নামে যে টোটকা চিকিৎসা চলছে, তাতে যে বিশেষ কোনো লাভ হবে না, তা প্রায় নিশ্চিত। একজন স¤্রাটের মুকুট খুলে নিলে কী হবে? ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে কয়েকজনকে পাকড়াও করলেই কি অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে?
লেখক
চিকিৎসক ও কলামনিস্ট