বলা হয়, ‘বাঙালি কোনোকিছুতেই মাতে না, শুধু হুজুগে মাতে।’ এই হুজুগের জেরে ২০১৩ সালের মার্চে সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাচ্ছে বলে গুজব ছড়ানো হয়। গুজবের কারণে শুরু হয় দেশের বিভিন্ন জায়গায় মারামারি। প্রায় দেড়শ’ মানুষ মারা যায় গুজব রটনাকারীদের তাণ্ডবে। সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণাধীন পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা লাগবে গুজব ছড়িয়ে শিশুদের ধরে নেওয়া হচ্ছে বলে ‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়ায়। ফলে ছেলেধরা সন্দেহে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এসে মানুষের অবসর সময় কাটানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। এসব যোগাযোগ মাধ্যম সহজলভ্য হওয়ায় প্রতিনিয়ত নামে-বেনামে ব্যবহারকারীর সংখ্যা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। এভাবে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়াকে গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যমে পরিণত করেছে। ব্যক্তিগত আক্রোশ, আদর্শিক মতবিরোধ ও রাজনৈতিক পুঁজি করে এ ধরনের কাজ বেশি করা হয়
এসব কিছুর সঙ্গে যোগ হয়েছে, নামসর্বস্ব কিছু অনলাইন পোর্টাল। এগুলো মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মতভেদ এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের টানাপড়েনকে কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়ত ভুয়া, চটকদার, রসালো, উসকানিমূলক ও বিকৃত নিউজ, ছবি এবং ভিডিও প্রকাশ করছে। আর নেটিজেন দুনিয়ার সৈনিকরা এসব নিউজের সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই না করে লাইক, কমেন্টস, শেয়ার, কপি ও ট্যাগের মাধ্যমে অন্যের কাছে পোছে দেওয়ার মহান দায়িত্ব পালন করছে। কারও কারও ভাবখানা এমন, যেন এর মাধ্যমে যুদ্ধ জয় করছেন কিংবা দুনিয়া-আখেরাতের অশেষ নেকি হাসিল করছেন। কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা এটা বিবেচ্য বিষয় নয়। অথচ এসবের পরিণাম যে কত ভয়াবহ, তা তাদের কল্পনায়ও আসে না। মিথ্যা বলা বা গুজব ছড়ানো মুনাফিকের আলামত, ভয়াবহ পাপের কাজ। এ কাজের সঙ্গে অনেকগুলো পাপ জড়িত। মিথ্যা প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা মিথ্যা কথন থেকে দূরে সরে থাকো।’ -সুরা হজ: ৩০ । মিথ্যা প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি। ১. কথা বললে মিথ্যা বলে, ২. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, ৩. আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে।’ -সহিহ বোখারি: ৩৩ । সুতরাং কোনো খবর দেখলে যাচাই-বাছাই করা ছাড়া তা বিশ্বাস করা অনুচিত। পবিত্র কোরআনে ভুল তথ্য অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তর এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ -সুরা বনি ইসরাঈল: ৩৬। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ প্রদত্ত পাঁচটি নিয়ামত হারিয়ে যাওয়ার আগে মূল্যায়ন করতে বলেছেন। সেগুলো হলো- বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকে, অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে, অসচ্ছল হওয়ার আগে সচ্ছলতাকে ও মৃত্যু আসার আগে জীবনকে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ নাওয়া-খাওয়া ভুলে জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করছে সোশ্যাল মিডিয়াকে নোংরা মানসিকতা প্রচারের মাধ্যম বানিয়ে। নিজের পেজ বা গ্রপের ভিজিটর বাড়াতে প্রতিনিয়তই ছড়াচ্ছে গুজব, মিথ্যা কাহিনী ও বিভিন্ন অশ্লীল ছবি বা ভিডিও। যার কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ রেখো, যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে আছে যন্ত্রণাময় শাস্তি।’ সুরা নূর: ১৯। মানছি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক অনিয়ম প্রশাসনের চোখে আসে। ফলে সমস্যার সমাধান কিংবা অপরাধীর শাস্তি হয়। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু যাচাই-বাছাই না করে কোনো খবর ছড়ানোর কারণে যদি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির জীবন নষ্ট হয়, সম্মানহানি নষ্ট হয়, তাহলে তার দায়ভার আমাদের ওপরই বর্তাবে। আমরা হয়ে যেতে পারি চিহ্নিত মিথ্যাবাদী। কারণ, হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘সব শোনা কথা (যাচাই-বাছাই করা ছাড়া) বলা কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯২। তাই সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত, শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কোনো খবর কাউকে না বলা, কোনো খবর শেয়ার না করা।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক