ব্যাংককে বসে গুলশানে ক্যাসিনো চালান আজিজ মোহাম্মদ ভাই

বাংলাদেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বসে রাজধানী ঢাকার গুলশানের নিজ বাড়িতে ক্যাসিনো চালাতেন। মাদকের অবৈধ কারবারসহ বাড়ির ছাদে সিসা বার খুলেছিলেন তিনি। অবৈধ এসব কারবারে অর্জিত বিপুল পরিমাণ টাকা তিনি হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার করেছেন বলে ধারণা করছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এসব অভিযোগে গতকাল সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশান থানায় অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি মামলা করা হয়েছে। আসামি করা হয়েছে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ভাতিজা ওমর মোহাম্মদ ভাই এবং তাদের দুই বাড়ির কেয়ারটেকার পারভেজ ও নবীন মণ্ডলকে। পরবর্তী তদন্তে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকেও এসব মামলায় আসামি করা হবে।

অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আজিজ মোহাম্মদ ভাই চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবেই বেশি পরিচিত। চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে তার নাম আলোচনায় এসেছিল। শেয়ার কেলেঙ্কারির এক মামলায় গত বছর আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করেছিল পুঁজিবাজারবিষয়ক ট্রাইব্যুনাল। তার আগ থেকেই তিনি বিদেশে রয়েছেন।

গত রবিবার রাতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গুলশান-২-এর ৫৭ নম্বর রোডে অবস্থিত আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ১১/এ ও তার ভাই প্রয়াত রাজার ১১/বি নম্বর এবং গুলশান-১ তাদের এক স্বজনের বাড়িতে অভিযান চালায়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও ক্যাসিনোসামগ্রী উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কেয়ারটেকার পারভেজ ও নবীনকে। কৌশলে এ সময় ১১/বি নম্বর বাড়ির সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যান রাজার ছেলে ওমর মোহাম্মদ ভাই।

অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো উত্তরের সহকারী পরিচালক খোরশিদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান পরিচালনার পর এই প্রথম কারও বাসাবাড়ি থেকে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ দুই বাসায় মাদকের অবৈধ কারবারের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, অভিযানে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন অবৈধ দ্রব্য ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে তিনজনকে আসামি করে তিনটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলার তদন্তে যেসব ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদের সবার বিরুদ্ধে মামলা হবে।

অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুলশানের ১১/এ নম্বরের বাড়িতে আজিজ মোহাম্মদ ভাই না থাকলেও তার পরিবারের লোকজন থাকেন। ঘনিষ্ঠ লোকজনের সহায়তায় এ বাড়িতে তিনি মদ বিক্রি, সিসা বার ও ক্যাসিনো চালাতেন। তিনি জানান, ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জামাদি বিশেষ করে যেসব কয়েন কিনে খেলতে হয়, সেগুলোতে এএমবি নাম পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। গ্রেপ্তার দুজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য দিয়েছেন। তাতে মনে হচ্ছে, তিনি দেশের বাইরে পালিয়ে থাকলেও এসব অবৈধ কারবার তার নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কাজেই আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পর তাকেও এসব মামলার আসামি করা হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ওই দুই বাসায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছিল। মদ বিক্রি, সিসা বার ও ক্যাসিনো কারবার চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যেভাবে পালিয়েছেন ওমর মোহাম্মদ ভাই : অভিযান পরিচালনাকারী একাধিক কর্মকর্তা জানান, গোপন সংবাদে যখন ১১/বি নম্বর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়, তখন আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বোন ও ভাতিজা পরিচয়ে অনেকেই অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তারা সবাই সার্চ ওয়ারেন্ট দেখানোর দাবি তোলেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তল্লাশি কর্মকাণ্ডে আদালতের পূর্বানুমতির বিধান নেই জানানোর পর ধীরে ধীরে তারা সরে যেতে থাকেন। এরই এক ফাঁকে ভবনের গোপন সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ভাতিজা ওমর মোহাম্মদ ভাই পালিয়ে যান। সহকারী পরিচালক খোরশিদ আলম বলেন, রান্নাঘর দিয়ে একটি এক্সিট সিঁড়ি রয়েছে। সেখান দিয়েই পালিয়েছেন ওমর।

দুই বাড়ি থেকে যা উদ্ধার হয়েছে : বিদেশি ৩০০ বোতলসহ ৩৯০ বোতল মদ, ২০০ গ্রাম গাঁজা, এক কেজি সিসা, তিনটি হুঁকো, একটি ক্যাসিনো বোর্ড ও ১৬০০ ক্যাসিনোর ঘুঁটি। এসব মালামাল যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানে কেউ না থাকলেও সবসময় এসি চালানো থাকত। অভিযানে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা জানান, গুলশান-২-এর ৫৭ নম্বর রোডের ১১/এ ও ১১/বি এর দুটি বাড়ি থেকেই মদ বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এ কারবারের সপক্ষে তারা কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। অভিযানে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের এক আত্মীয়ের গুলশান-১-এর বাসা থেকেও ১০ বোতল দেশি মদ উদ্ধার করা হয়।

ভিআইপি ও বিদেশিরা খেলতেন ক্যাসিনো : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার দুই বাড়ির দুই কেয়ারটেকার নবীন ও পারভেজ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, ওমরসহ তাদের আত্মীয়স্বজনদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাড়িতে মদ কেনাবেচা, সিসা বার চলত। প্রতিদিনই বিদেশিরা ক্যাসিনো খেলতে আসতেন। দিন-রাত সবসময়ই তাদের আনাগোনা ছিল। ওমরের মাধ্যমেই এসব কারবারের টাকাপয়সার একটা ভাগ আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের কাছে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হতো। এক কর্মকর্তা জানান, ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের ‘সিলেকটিভ’ লোকজন ও বিদেশিরাই মূলত আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ক্যাসিনোর সদস্য ছিলেন। তারা বাংলাদেশি টাকা ও বিদেশি ডলার– দুই মুদ্রায়ই খেলতেন। তবে বিদেশিরা ডলারেই খেলতেন।

ক্লাব-বারে ক্যাসিনো বন্ধ থাকলেও আজিজের বাড়িতে চলত : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পরই রাজধানীর মতিঝিল ক্লাবপাড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন বারে ক্যাসিনো খেলা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও তার ভাই রাজার বাড়িতে গোপনে ঠিকই এ খেলা হয়েছে। এর বাইরে অবৈধ মাদকদ্রব্যের কারবার ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলত আজিজসহ তার আত্মীয়স্বজনদের একাধিক বাসায়।

সব কক্ষে তল্লাশি চালাতে পারেনি : ১১/বি নম্বর বাড়ির বেশিরভাগ কক্ষ ছিল তালাবদ্ধ। ওমর পালিয়ে যাওয়ায় সেসব কক্ষের তালা ভাঙতে পারেনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, ওইসব রুম তল্লাশি করা হলেও আরও অনেক কিছু পাওয়া যেত। বাসার কোনো জিম্মাদার না পাওয়ায় সেসব রুম ভাঙতে পারেননি তারা।

কানাডা থাকেন ওমরের ভাই আহাদ ও তার পরিবার : সংশ্লিষ্টরা জানান, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, তার স্ত্রী নওরীন, তাদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে বিদেশে থাকেন। আজিজের সহোদর রাজার দুই ছেলে ওমর ও আহাদ। আহাদ পরিবার নিয়ে কানাডায় থাকেন। গুলশানের এসব অবৈধ কারবারের তত্ত্বাবধায়ক ওমর। এই ওমর চাচা আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নির্দেশনায় অবৈধ কারবারের একটি অংশ ব্যাংকক ও অন্য একটি অংশ কানাডায় পাঠাতেন। তাকে ধরতে পারলে এসব অবৈধ কারবারের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানান তদন্তকারী এক কর্মকর্তা।