মোফাজ্জলের সংগ্রহশালা

মুক্তিযুদ্ধকালীন ৫০০ রেডিও

পুরনো রেডিও সংগ্রাহক মোফাজ্জল হোসেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ব্যবহৃত পাঁচ শতাধিক রেডিও রয়েছে তার সংগ্রহে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রামোফোন, মাউথ স্পিকার, দেশি-বিদেশি ইলেকট্রনিক ট্রানজিস্টর। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গত মঙ্গলবার শুরু হয়েছে তিন দিনের রেডিও এশিয়া কনফারেন্স অ্যান্ড রেডিও সং ফেস্টিভ্যাল।

এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (এবিইউ) আয়োজিত উৎসবে হরেক রকমের কয়েক শ রেডিও নিয়ে এসেছেন ‘রেডিওপ্রেমী’ মোফাজ্জল।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অতিথি ও দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে মোফাজ্জলের রেডিওগুলো দেখছেন। অনেকে কলের গান বাজিয়েও শুনছেন। তার সংগৃহীত প্রতিটি রেডিওর রয়েছে একটি গল্প। সেসব গল্প ও সংগ্রহের ইতিবৃত্তও জেনে নিচ্ছেন অনেকেই। রেডিও সংগ্রহ শুরুর গল্প জানতে চাইলে মোফাজ্জল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছোটবেলা থেকে তার আগ্রহ ছিল রেডিওর প্রতি। কারণ তার বাবা আবদুল ফারুক ছিলেন রেডিওর মেকানিক। মুক্তিযোদ্ধা ফারুক প্রতিদিন রেডিওতে শুনতেন দেশ-বিদেশের খবরাখবর। ১৯৮৫ সাল থেকে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন রেডিও। ২০ বছর ধরে তিনি নিজের খরচে রক্ষণাবেক্ষণ করছেন সংগ্রহ করা এই রেডিওগুলো। সে জন্য মাসে শুধু ঘর ভাড়া বাবদই তাকে গুনতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকা।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মোফাজ্জল পেশায় একজন ঘড়ির মেকানিক। তিনি বলেন, পুরনো ও নষ্ট ঘড়ি মেরামত করে বিক্রির পর পাওয়া অর্থ দিয়ে রেডিও সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ করছেন তিনি। তার কাছে ১৯৩৬ সালে হল্যান্ডে তৈরি ফিলিপস রেডিও থেকে শুরু করে রয়েছে পাই, বিউলার, সিটিজেন, সনি, গ্রুন্ডিক, মারফি, জ্যামিথ, টেলিফোন ক্যান, বুশ কোম্পানিসহ নামীদামি সব ব্র্যান্ডের প্রায় এক হাজারেরও বেশি রেডিও।

মোফাজ্জল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় বাবার দোকান থেকে একটু একটু করে এই রেডিওগুলো সংগ্রহ করা শুরু করি। পরে দেশের নানা প্রান্তে যাই রেডিও কিনতে। তখন রেডিওর দাম অনেক ছিল। কিন্তু তাও আমি থেমে যাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বেশি কিনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা যে রেডিওগুলো ব্যবহার করেছেন সেগুলো।’

মোফাজ্জল বলেন, ‘রেডিও সংগ্রহ আমার নেশা হয়ে গেছে। অনেক সময় পকেটে টাকা থাকে না। মানুষের বাড়িতে কামলা দিয়া সেই টাকায়ও রেডিও কিনেছি।’ তার দাবি, ‘নতুন প্রজন্ম আমার রেডিও নিয়ে গবেষণা করবে। রেডিওর ইতিহাস, স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে রেডিওর ভূমিকার বিষয়টি জানবে।’

হতাশ কণ্ঠে রেডিও সংগ্রাহক মোফাজ্জল বলেন, ‘সবাই শুধু আশ্বাস দেয় কেউ আর কিছু করে না। আমি চাই এই রেডিওগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করতে একটি স্থায়ী জাদুঘর করতে। কিন্তু টাকার অভাবে পারি না আর সরকারি পর্যায় থেকে আশ্বাস পেলেও পাই না কোনো অর্থায়ন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার জাদুঘরটির নাম দিতে চাই প্রথম রেডিও আবিষ্কারক বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর নামে। যার আকৃতি হবে অনেকটা রেডিওর মতো।’