সাম্প্রতিককালে আমাদের নাগরিক জীবনে দুটো বড় ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি আর একটি ক্রিকেট ধর্মঘট। ঘটনার ঘনঘটা এত প্রবল যে নুসরাত হত্যাকারীদের ফাঁসি বা আবরার ফাহাদ হত্যাকা- প্রায় তলিয়ে যাওয়ার মতো। বরগুনার রিফাত হত্যা নিয়ে আলোচনা এখন টিমটিম করে জ্বলছে। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টিকে শুদ্ধি অভিযানের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ক্রিকেট ধর্মঘটে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। বিস্মিত হয়েছি আমরাও। ধর্মঘটের যে দাবি-দাওয়াগুলো ছিল তার অধিকাংশই অর্থনৈতিক। এই বিষয়গুলো সারা বিশ্বেই গোপন থাকে। আমরা শুধু জানি বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড়, পপ সিঙ্গার, হলিউড-বলিউডের নায়ক-নায়িকারা প্রচুর টাকা পান। সেই প্রচুর টাকা, কত টাকা তা আমরা জানি না।
অবশেষে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড প্রায় সবগুলো দাবিই মেনে নিল। কারণ ক্রিকেট ভীষণ জনপ্রিয় খেলা। খেলোয়াড়দের সঙ্গে আপস না করলে চারদিকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে বিস্মিত হলেও পরে দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন। খেলোয়াড়রা সব সময়ই সরকারের স্নেহধন্য হন। সাবেক ক্রিকেট ফুটবল খেলোয়াড়রাও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। খেলার ফর্ম চলে গেলেও তাদের মূল্য থেকে যায়। আর ক্রিকেটে তো নানা ধরনের কাজের সুযোগ আছে। এই দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার পরে আরেকটি ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এক অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। সেটা আমরা সবাই জানি। সাকিব আল হাসানের ওপর নিষেধাজ্ঞা। এটি একদিকে অমর্যাদাকর এবং অন্যদিকে আশু ম্যাচগুলোতে পরাজয়ের আশঙ্কা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হেরে গেলে যেন বাংলাদেশই হেরে যায়। দর্শকদের মধ্যে প্রথমে পরাজয়ের ধাক্কা, তারপর দোষারোপ গালাগালি সবশেষে একটা ডিপ্রেশন কাজ করতে থাকে। ক্রিকেটের সাফল্য দেখে অভিভাবকরাও তাদের সন্তানকে খেলতে উৎসাহিত করছেন। যতটা না খেলাটাকে ভালোবেসে তার চেয়ে বেশি অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা দেখে। আর্থিকভাবে ক্রিকেটারদের উন্নতি হলেও সেটি জয়-পরাজয়ের বা উন্নত দক্ষতা অর্জনের কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
খেলোয়াড়দের পক্ষে একজন আইনজীবী যখন যুক্তি উপস্থাপন করছিলেন তিনি বারবার অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তুলনা করে গেছেন। সেই দেশের সমৃদ্ধি, অর্থনৈতিক জীবন এবং বাংলাদেশের অবস্থা একই রকম নয়। আমরা ভালো ক্রিকেট চাই, কিন্তু বেশি দামে ক্রিকেট অবকাঠামো পরিচালনা করার সক্ষমতা কি আমাদের দেশের রয়েছে? যাই হোক বিষয়টি রাষ্ট্র , সরকার এবং ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড দেখবে। বড় বড় তারকাদের বড় বড় দায়িত্ব। একটা সময় তারা তারের ওপর দিয়ে চলেন। সামনে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা এবং সেই মুহূর্তেই এই শাস্তি নেমে আসা যে কোনো মানুষের পক্ষেই সন্দেহের জন্ম দেয়। লঘু পাপে গুরু দন্ড হলো কি না, এটাও বিচার্য বিষয়। অবশ্যই আমরা ক্রিকেট প্রেমিকরা সাকিবের খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে দুঃখিত ও মর্মাহত। এ কথাও জানি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও একটা রাজনীতি আছে, কোনো কোনো দেশ হঠাৎ করেই এই কর্তৃত্বটা হাতে পেয়ে যায়। আর সেই অস্ত্রটাকে কোনো একটা দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করাও অমূলক নয়।
ক্রিকেট নিঃসন্দেহে আমাদের উপমহাদেশে ভীষণ জনপ্রিয়। কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের স্মৃতি ফিরে যায় ষাটের দশকে। যখন ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা চলত তখন দর্শকদের চাপ থেকে বাঁচার জন্য চারদিকে ঘোড়ায় চড়ে মাউন্ট পুলিশ পাহাড়া দিত। সেই থেকে সত্তরের দশক এবং আশির দশক পর্যন্ত ফুটবল প্রবল কৌশলগত দক্ষতা জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। ষাটের দশকে ফুটবল এতই জনপ্রিয় ছিল যে মুক্তিযুদ্ধের সময়েও একটি স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিম গঠন করতে হয়েছিল। সেই টিমেরও অনেক বীরত্বগাথা আছে। স্বাধীনতার পরে দেশে বেশ ক’টি ফুটবল দল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে এগিয়ে গিয়েছিল। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল আবাহনী ও মোহামেডানের মাঠে প্রবল দৌরাত্ম্য আমরা লক্ষ করেছি। পাশাপাশি হকি, টেবিল টেনিস, লন টেনিসসহ নানা অ্যাথলেটিকেরও প্রবল সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল। সাঁতারে ব্রজেন দাস, মোশারফের ইংলিশ চ্যানেল বিজয়। দাবায় গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়াও একটা বড় ব্যাপার ছিল এবং একাধিক দাবাড়– বাংলাদেশের জন্য বিশ্বমর্যাদা অর্জন করেছিল। ফুটবল সারা বিশ্বের শুধু উত্তেজনাকর খেলা নয় এটা ধনী-গরিব নির্বিশেষে অসংখ্য ভক্তকুল নিয়ে সারা বিশ্বে বিরাজ করছে। বাংলাদেশের ফুটবলের এই রকম অবস্থা হলো কেন তার জন্য অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। নারী ফুটবলের এই রকম আকাশচুম্বী সম্ভাবনা দেখা গেলেও সেটিও একটা অবহেলার পর্যায়ে চলে গেছে। আমাদের গ্রামীণ খেলা কাবাডি এশিয়ান গেমসে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ এই খেলাতেও একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারত। তবুও ক্রিকেট একটা জায়গায় পৌঁছেছে বলে আমরা আনন্দিত, এতক্ষণ তো বললাম স্পার্টার কথা।
এখন উল্লেখ করতে চাই কী অবস্থা আছে এথেন্সের। সক্রেটিস কেমন আছেন, অ্যারিস্টটল কী করছেন? আজকের এথেন্স, আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে কী ঘটছে? জ্ঞানচর্চায় আজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কী ভূমিকা পালন করছে? প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নানা ধরনের ক্ষোভে-বিক্ষোভে বিধ্বস্ত। শিক্ষকতা একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত দু’চারটে ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষকরা কি পড়ান? তারা কী পড়ান নাকি মাস শেষে বেতন নেন? শিক্ষাটা ঠিকঠাক না হলেও আগে যে তারকাদের কথা বলেছি তারাও জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে সংস্কৃতির। সর্বত্রই সংস্কৃতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এ ক্ষেত্রে
অপসংস্কৃতি প্রতি পদে পদে মানুষকে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যায়। সেই সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান দেশের বিদ্যালয়, পরিবার, সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র। দেশে শিল্প-সাহিত্য চর্চাও অত্যন্ত জরুরি। স্বাধীনতার পরে নাটক একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠেছিল যা সামাজিক ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করত। পরবর্তীকালে আবৃত্তি শিল্পও এগিয়ে আসে। সেই সঙ্গে চিত্রকলা খুবই আন্তর্জাতিকমানের। এইসব ক্ষেত্রে চর্চার জন্য যে পরিমাণ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। হলে হয়তো যে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আমরা দেখতে পাই তা দেখা যেত না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলচ্চিত্রের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছেন। বেশ কিছু উদ্যোগী তরুণ নির্মাতাকে অনুদান দিয়েও উৎসাহিত করছেন। কিন্তু চলচ্চিত্রের সংস্কৃতিটাই নানা কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণে একটা ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে যে অভিভাবকত্ব ও অর্থের প্রয়োজন ছিল তার কোনো ব্যবস্থা হয়নি। দেশের হাজার হাজার সংস্কৃতিকর্মী বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু ক্রমশ সেইসব জায়গা শূন্য হয়ে আসছে। যে কারণে জেলা শহরগুলোতে সংস্কৃতির চর্চা আজ প্রায় স্তিমিত। যে কোনো কাজই অর্থ ছাড়া হয় না, এই সত্যটা আমাদের সরকার বুঝতে পারে না। একজন শিক্ষক অথবা সাংবাদিক কিংবা যে কোনো পেশার লোক কি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবে? এটা সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেক মানুষের একটা জীবিকা প্রয়োজন। শিল্পী, লেখকরা কি আকাশের নীল আর বাতাস খেয়ে বাঁচবে? তাই প্রতি ক্ষেত্রেই একটা সুষম ব্যবস্থা চাই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবার প্রতিপালন। তার মধ্য দিয়েই একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। স্পার্টা এবং এথেন্সের মধ্যে যদি বিপুল অসংগতি থাকে তাহলে মাঝখানে একটা বড় ফারাক দেখা দেবে।
লেখক
নাট্যব্যক্তিত্ব
mamunur530@gmail.com