দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের সেই বিখ্যাত বক্তব্যটি আর একবার স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, আমার সামনে মাত্র দুটি বিকল্প
প্রথম বিকল্প : হয় আমি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে আমার পরিবারের সদস্যদের এতটা ধনী বানিয়ে দেব যে, ফোর্বস ম্যাগাজিনের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীদের তালিকায় তাদের নাম এসে যাবে, আমার দেশের মানুষের জন্য কিছুই থাকবে না।
দ্বিতীয় বিকল্প : অথবা আমি আমার দেশ ও দেশের মানুষের জন্য সাধ্যমতো সেবা করব, যাতে আমার দেশের অর্থনীতি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দশটি অর্থনীতির একটি হয়ে ওঠে।
আমি দ্বিতীয় বিকল্পটিই গ্রহণ করলাম।
গল্পের এই অংশটিতে মিথ্যের লেশমাত্র নেই। পরের অংশটি রসালো করতে উপমহাদেশের একজন নেতাকে উপস্থাপিত করা হয়েছে। নেতা বললেন, সিঙ্গাপুরের মতো আমার সামনেও দুটি বিকল্প ছিল। কিন্তু আমার কী করার আছে দ্বিতীয় বিকল্পটি তো লি কুয়ান ইউ নিজেই ছিনিয়ে নিলেন। বাধ্য হয়ে আমাকে প্রথমটাই নিতে হলো।
পৃথিবীর অনেক দেশেই নেতাদের পুত্র-পুত্রবধূ, কন্যা-জামাতা, ভাগ্নে-ভাস্তে, ভ্রাতা-ভগ্নী এমনকি শ্যালিকাও অগুনতি টাকার জোরে ফোর্বস ম্যাগাজিনে নাম লিখিয়েছেন।
জনগণ একটু না হয় ভুগুকই। ভোগান্তিই জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার।
***
সর্দার খুশবন্ত সিং-এর দুটি শিং-এর একটিও খাঁড়া নয়। দুটিই বাঁকা। তা ছাড়া তিনি হাট্টিমাটিম টিমও নন। খুশবন্ত ভক্তের অভাব নেই। বড় ভক্তরা তাকে নিয়ে টানাটানি করবেন, এটাই স্বাভাবিক। যারা কম ভক্ত যেমন আমি, টানাটানির মধ্যে নেই, কেবল দেখি। তিনি কখন কী লেখেন। মানে লিখতেন। তিনি ক্রমাগত পাকিস্তান নিয়ে মন্দে-ভালোতে মিলিয়ে যখন লিখে যাচ্ছেন, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো সর্দারজি, আপনি এ কী করছেন ইন্ডিয়ার খাবেন আর পাকিস্তান নিয়ে লিখবেন আপনি তো দেখছি আচ্ছা নাফরমান।
খুশবন্ত সিং বিড়বিড় করে বললেন, মনে কষ্ট নেবেন না বাপু, কী লিখতে নিজের দেশ নিয়ে কী লিখে ফেলি, ভয়ে আছি। একটা কিছু যদি কেউ অপছন্দ করে বসেন, দরকার হলে বাংলাদেশ থেকে লোকবল ভাড়ায় এনে (ম্যান পাওয়ার ইমপোর্ট) আমার রাজাকার খেতাব সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়ে ছাড়বেন।
সর্দারজি ধরেই নিলেন তার উচ্চমার্গীয় কথা ইতরজনের বোধ্য নয়। তিনি সহজ করে বললেন, যখন আমি ভয়ে থাকি পাকিস্তান নিয়ে লিখি, যে যা বলে বলুক।
সূত্র আমিও পেয়ে গেলাম, রাষ্ট্রকম্প জ¦র আমাকে পেয়ে বসলে নিজের দেশের নামই মনে করতে পারি না।
পাকিস্তান নিয়ে লিখতে শুরু করলে খুশবন্ত-দশা আর ভারত নিয়ে লিখতে গেলে মোদিজির পিসতুতো ভাই বানাতে অন্যপক্ষ পিছপা হবে না। আপদ এড়াতে আব্রাহাম লিঙ্কনের প্রমিজড ল্যান্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে কলম ধরি। ধার করা কলম, আর গপ্পোগুলো সেকালের হাওয়া থেকে পাওয়ার মতো সাইবার উৎস থেকে পাওয়া।
প্রথমটি ওবামা গপ্পো
স্কুল পরিদর্শনে এসে একটি ক্লাসে ঢুকলেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। দূরে গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের লোকজনের দৃষ্টি সজাগ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে স্বাগত জানানোর পর প্রেসিডেন্ট ওবামা বললেন, তোমরা আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারো। আমি একটার পর একটা জবাব দেব।
ওবামা বললেন, তোমাদের মধ্যে কে প্রথম প্রশ্ন করবে?
একটি শিশু হাত তুলল।
‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার নাম জনি, আমার তিনটি প্রশ্ন আছে।’
‘বেশ শুনি।’
আপনি হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে দিনদুপুরে দরজা কেন বন্ধ করেছেন?
আপনি কি মনিকা লিউনস্কির নীল স্কার্ট লন্ড্রিতে পাঠিয়েছেন?
আপনার দুর্নীতির ধরন কি এটা বলে দেয় যে আমরা কখনো আপনাকে বিশ^াস করতে পারব না?
তখন টিফিনের বেল বাজতে শুরু হয়, সবাই ছুটে ক্লাসের বাইরে চলে যায়। ৪০ মিনিট পর খুদে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে আসে। ক্লিনটন ক্লাসে ফিরে জিজ্ঞেস করেন, আমরা কোথায় ছিলাম? এরপর কে প্রশ্ন করবে?
আর একটি শিশু হাত তোলে।
‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট আমার নাম জর্জ। আমার পাঁচটি প্রশ্ন আছে।’ ‘বলো শুনি।’
আপনি হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে দিনদুপুরে দরজা কোন বন্ধ করেছেন?
আপনি কি মনিকা লিউনস্কির নীল স্কার্ট লন্ড্রিতে পাঠিয়েছেন?
আপনার দুর্নীতির ধরন কি এটা বলে দেয় না যে আমরা কখনো আপনাকে বিশ^াস করতে পারব না?
আজ দশ মিনিট আগে টিফিনের ঘণ্টা বাজার কারণ কী?
আর জনি কোথায়?
দ্বিতীয়টি ট্রাম্প গপ্পো
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্কুল পরিদর্শনে এসে যথারীতি একটি ক্লাসে ঢুকলে তাকে স্বাগত জানানো হয়। তিনি আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের গুণগান করে শিশুদের উদ্দেশে বলতেন, তোমাদের কারও কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারো। আমি সব প্রশ্নের জবাব দেব? তো তোমাদের মধ্যে কে প্রথম প্রশ্ন করবে?
বব হাত তুলে বলল যে, তার তিনটি প্রশ্ন আছে।
আপনি এত কম ভোট পেয়েও কেমন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন?
আপনি কেন নারীর গোপন অঙ্গে হাত দিতে বলেছেন?
আপনার দুর্নীতির ধরন কি এটা বলে দেয় না যে আপনাকে আমরা কখনো বিশ্বাস করতে পারব না?
ঠিক তখনই টিফিনের ঘণ্টা বাজে। সবাই ছুটে ক্লাসের বাইরে চলে যায়। পঞ্চাশ মিনিট পর সবাই আবার ফিরে আসে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও চা খেয়ে সতেজ হয়ে ক্লাসে এসে বললেন, আর কারও কোনো প্রশ্ন আছে? সব জবাব দেব।
আলফ্রেড হাত তুলে বলল, মিস্টার প্রেসিডেন্ট আমার পাঁচটি প্রশ্ন আছে।
আপনি এত কম ভোট পেয়েও কেমন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন?
আপনি কেন নারীর গোপন অঙ্গে হাত দিতে বলেছেন?
আপনার দুর্নীতির ধরন কি এটা বলে দেয় না যে আপনাকে আমরা কখনো বিশ^াস করতে পারব না?
আজ কুড়ি মিনিট আগে টিফিনের ঘণ্টা বাজার কারণ কী?
আর শেষ প্রশ্ন, ববকে গুম করে...
আলফ্রেড তার প্রশ্ন শেষ করতে পারল না। প্রেসিডেনশিয়াল অর্কেস্ট্রা কান ফাটানো শব্দে ড্রাম বাজাতে শুরু করল, স্কুলের ছুটির ঘণ্টাও পড়ল।
স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারল তাদের আরও একটি বন্ধু হয়তো চিরদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
ওবামা ও ট্রাম্পের গপ্পোর জর্জ এবং আলফ্রেড কেমন আছে, পড়াশোনা কেমন করছে, জিপিএ ফাইভ পাবে তো, বড় হয়ে কী হবে মন্ত্রী না ক্যাসিনো কারিগর, এসব প্রশ্ন কেউ আর জর্জ ও আলফ্রেডের মা-বাবাকে করে না।
কখনো কখনো আমিও ‘প্রশ্নের প্রশ্নের’ মুখোমুখি হই। আপনার কি কোনো প্রশ্ন আছে? আমি ক্ষীণকণ্ঠে বিড় বিড় করে বলি চারটি প্রশ্ন
জনি কোথায়?
জর্জ কোথায়?
বব কোথায়?
আলফ্রেড কোথায়?
ধমক শুনি : আপনার প্রশ্নটা কী?
আমি বলি : মাই লর্ড, আমার কোনো প্রশ্ন নেই, কেবল উত্তর আছে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক