সরকারি গুদামের চাল বাজারে!

কৃষকের কাছ থেকে বর্তমানে প্রতি কেজি চাল সংগ্রহের সরকারি মূল্য ৩৬ টাকা। এই দামে সংগৃহীত চাল চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ানহাট ও হালিশহর সিএসডিসহ (সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো) স্থানীয় বিভিন্ন খাদ্য গুদামে (এলএসডি) সংরক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। তবে আনা-নেওয়ার পথেই চলে তুঘলকি কাণ্ড। অভিযোগ রয়েছে, ডিও ব্যবসায়ী, পরিবহন ঠিকাদার ও খাদ্য বিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে গুদামের এসব চাল চলে যায় খোলাবাজারে। সরকারের সংগৃহীত ভালো মানের চালের পরিবর্তে উত্তরবঙ্গ, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিও ব্যবসায়ীদের সংগৃহীত নিম্নমানের পচা-নষ্ট চালগুলোই দেওয়ানহাট ও হালিশহর গুদামে ঢোকানো হয়।

এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই গত ২২ অক্টোবর খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার চট্টগ্রাম সফরকালে দেওয়ানহাট সিএসডি খাদ্য গুদামের ১০টি গুদাম সিলগালা করে দেন। পরবর্তী সময়ে খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আনিছুজ্জামান, উপপরিচালক মো. আলমগীরসহ ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটি এর সত্যতা না পেয়ে গুদামগুলো খুলে দেয়। তবে তদন্তে নির্ধারিত সময়ে চাল খালাসের কথা থাকলেও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ডিও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ সময় ধরে চাল রেখে দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এসব নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামের দুটি সিএসডিতেই (হালিশহর ও দেওয়ানহাট) গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এর আগে ২০১৭ সালে হালিশহর গুদাম থেকে পাচার করার সময় চারটি ট্রাকসহ ১৫৫ টন (৩০৯৬ বস্তা) সরকারি চাল জব্দ করেছিল র‌্যাব। এ ঘটনায় খাদ্য কর্মকর্তাসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এরপর থেকেই খাদ্য বিভাগের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের চাল পাচারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এই সিন্ডিকেট এখনো তৎপর রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট সিএসডির সহকারী ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ বেলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিও ব্যবসায়ীরা যেসব চাল ক্রয় করেন সেগুলোই খোলাবাজারে বিক্রি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের জন্য বরাদ্দ হওয়া চালের বেশির ভাগই ডিও ব্যবসায়ীরা ক্রয় করে থাকেন। ডিও অনুযায়ী সরকারের কেনা সব চাল গুদামে আসে। এসব চাল চোঙা মেরে নিশ্চিত হয়েই গুদামে সংরক্ষণের জন্য ঢোকানো হয়। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বাষ্পের কারণে চালের আকার কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকে। এ কারণেই হয়তো অনেকেই চালের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে গুদোমে রাখা সরকারের সংগৃহীত চালের মান ভালো। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের সংগৃহীত চাল সিএসডি-এলএসডি হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হলেও মূলত চালের পরিবর্তে নগদ অর্থই বেশি লেনদেন হয়। এসব চাল পরিবহনের ক্ষেত্রে ১০টি নির্দেশনা মানার বিধান থাকলেও তা অনেকটা উপেক্ষিত। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন (সিআরটিসি) ও বিভাগীয় সড়ক পরিবহনের (ডিআরটিসি) কয়েকজন ঠিকাদার খাদ্য বিভাগের এসব চাল নিয়ে নানা অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিটি সিআরটিসি সূচিতে ১৫-২০ ট্রাক ও ডিআরটিসি সূচিতে ৮-১০ ট্রাক চাল পরিবহন করা হয়। উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা থেকে লোকাল বাসমতি, আটাশ, উনত্রিশ, পাইজাম চাল সংগ্রহ করা হয়। এসব চালের দাম খোলাবাজারে বেশি হওয়ায় এই চাল ধরে রেখে নিম্নমানের চাল গুদামে ঢোকানো হয়। এর মধ্যে নোয়াখালী ও সিলেট থেকে সংগৃহীত নিম্নমানের চালও আছে। আলম সওদাগর ও শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বড় ধরনের একটি সিন্ডিকেট এ কারসাজিতে যুক্ত। এ ছাড়া আপন ট্রেডার্সের ফজলে রাব্বী টিটু, জাহিদ পরিবহনের জাহিদ হোসেন চাল পরিবহনে কারসাজির নিয়ন্ত্রক। ডিও ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে চাল খালাস না করে দীর্ঘদিন গুদামে চাল রেখে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ডিও ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামে প্রতি কেজি চাল ১৬ টাকা ও পাবর্ত্য অঞ্চলে ১২-১৬ টাকায় ক্রয় করেন। ভালো মানের চাল কৌশলে রেখে দিয়ে কম দামে ডিও কেনা চালগুলোই গুদামে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।