নির্বাচনে অনলাইন মাস্তানি

বিগত কয়েক বছর নির্বাচনের বৈশ্বিক ধারণায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন একটি দেশের সরকার ও তার কুশীলবরা অনলাইনের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করছেন। এভাবে গত বছর ২৬ থেকে ৩০টি দেশে জাতীয় নির্বাচনে অনলাইন কারবারিরা হস্তক্ষেপ করেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ফ্রিডম হাউজ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গত সোমবার এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, ইন্টারনেটভিত্তিক নির্বাচনী হস্তক্ষেপ এখন বিভিন্ন দেশে ‘জরুরি কৌশল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা গণতন্ত্রকে দারুণভাবে ব্যাহত করবে।

ফ্রিডম হাউজের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, অনলাইন গোষ্ঠী নির্বাচন প্রভাবিত করতে মূল অস্ত্র হিসেবে ভুল তথ্য ও প্রোপাগান্ডাকে ব্যবহার করে। স্থানীয় সরকার ও দলীয় রাজনীতিকরা অনলাইনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র তত্ত¡ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করেন। এজন্য তারা সরকার সমর্থক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও ব্যবসায়িক নেতৃত্বকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগান।

বিশ্বের কর্র্তৃত্বপরায়ণ ও জনপ্রিয় উভয় সরকারই তার জনগোষ্ঠীর স্বভাবচরিত্র সম্পর্কে অবগত। সেভাবেই তারা কম্পিউটারের অ্যালগরিদম কাজে লাগিয়ে ব্যালটের মতামতকে পাল্টে দিচ্ছে। বলা চলে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার নামে নাগরিকদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। এজন্য অনলাইন কারবারিদের একটি অংশ নির্বাচন প্রভাবিত করার জন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে। পরে তাদের মাধ্যমে ভুল ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে ফিলিপাইনের কথা বলা যায়। দেশটির নির্বাচনে প্রার্থীরা ফেইসবুক, টুইটার ও ইন্সটাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল অর্থ লগ্নি করেন। পরে এসব সোশ্যাল মিডিয়া জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক কনটেন্ট তৈরি করে প্রার্থীদের হয়ে ভোটারদের মনোজগৎ পাল্টে ব্যালটে প্রভাব বিস্তার করেছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়েও অনলাইনে একই ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। পরে বাধ্য হয়ে প্রার্থী ব্রেট কাভানাফ বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনেন। গবেষণায় ফ্রিডম হাউজ দেখেছে, বিশ্বের ৬৫টির মধ্যে ৩৮ দেশের সরকারই প্রতিদ্ব›দ্বীকে ঘায়েল ও হয়রানি করতে প্রথমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে। এরপর অনলাইনে অনেক ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। সেখান থেকেই নিজের পক্ষে ও বিরোধীদের বিপক্ষে অনলাইন মতামত সংগ্রহ করে। অন্তত ৪০টি দেশের সরকার এজন্য নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম তৈরি করে অনলাইনে বিরোধীদের ওপর ব্যাপকহারে নজরদারি করেছে।

প্রতিবেদনে এবারও ইন্টারনেট স্বাধীনতা সূচকের খারাপ দেশগুলোর মধ্যে চীন শীর্ষে উঠে এসেছে। এ নিয়ে দেশটি টানা চতুর্থবার শীর্ষে এলো। তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ৩০তম বার্ষিকীতে হংকংয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। এর পর থেকেই ব্যাপকহারে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা শুরু হয়। এখন পেইচিং বিপথগামী আচরণের ধোয়া তুলে উইচ্যাটের অসংখ্য ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে দেশটিতে সেলফ-সেন্সরশিপ আরও বেড়েছে। তবে ওয়াশিংটন ডিসির ফিলিপাইন ও চীনা দূতাবাসে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি। ফ্রিডম হাউজের সভাপতি মাইক আব্রামাউইচ বলেন, ‘বিশ্বে এখন সেন্সরশিপের চেয়ে  প্রোপাগান্ডা বেশি কার্যকর। এজন্য বেশিরভাগ দেশের সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে নিজের প্রভাব বিস্তারে সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগাচ্ছে। নাগরিকরাও অনলাইনে এসব বেশি সন্ধান করে থাকেন। সেটিকেই কাজে লাগানো হচ্ছে।’