ডলারে ৫ টাকা বাড়তি চায় বিজিএমইএ রপ্তানি

বাজেটে নগদ সহায়তা বাড়ানোর পর সম্প্রতি রপ্তানির ওপর আরোপিত উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। রপ্তানিকারকদের দাবির মুখে ডলারের বিপরীতে টাকার মানও কমাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তা সত্ত্বেও রপ্তানি কমে যাওয়ায় আরও প্রণোদনা চান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা। তাদের দাবি, রপ্তানি বাড়াতে নগদ সহায়তা সম্প্রসারণ করতে হবে, ছাড় দিতে হবে করে। এছাড়া বন্দর সুবিধা বাড়ানো, ঋণের সুদহার কমানোর কথাও বলেছেন তারা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর গত অক্টোবর মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশের পর গতকাল সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে বৈঠকে এসব দাবি করেন পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র বর্তমান ও সাবেক নেতারা।  

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও গত তিন মাস ধরে টানা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গত অক্টোবর মাসে এ খাতের রপ্তানি কমেছে ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ। গত চার মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মোট রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

রপ্তানির এই নেতিবাচক ধারা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে বৈঠকে বসেন অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার, এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক, সাবেক সভাপতি  আনোয়ারুল আলম পারভেজ, সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, সিদ্দিকুর রহমান, বিকেএমইএর কার্যকরী সভাপতি মো. হাতেমসহ পোশাক খাতের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী বৈঠকে অংশ নেন। 

রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, টানা তিন মাস ধরে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমে যাচ্ছে। এতে সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ নিয়ে পোশাক রপ্তানিকারক ও সরকার উদ্বিগ্ন।

তিনি বলেন, রপ্তানিকারকরা মনে করছেন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলে সক্ষমতা বাড়বে। বিশেষ করে রপ্তানির ক্লিয়ারেন্স ও জাহাজীকরণ দ্রুত করতে হবে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমাতে হবে। এছাড়া ডলার কেনা ও বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর দামের পার্থক্য কমাতে হবে। ব্যাংকঋণের সুদহার কমাতে হবে। রপ্তানি আয়ে কর ছাড় দিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে করের আওতা বাড়াতে হবে। এসব বিষয়ে অর্থসচিব ও রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়েছে। তারা দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেবেন।

টিপু মুনশি আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের কারণেও রপ্তানি আয় কম হচ্ছে। অনেক রপ্তানিকারক কম দামে কার্যাদেশ নিচ্ছেন। এতে মোট রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কম দামের পরিবর্তে পণ্যের মান উন্নয়ন করা উচিত বলে জানান তিনি। 

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক তার বক্তব্যে পোশাক খাতের ১ শতাংশ বিশেষ নগদ সহায়তা সব পোশাক রপ্তানিকারককে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। সাধারণত অন্যান্য নগদ সহায়তা দ্রুত ছাড় করা, টাকার মান কমানো অথবা ডলারপ্রতি ৫ টাকা অতিরিক্ত বিনিময় হার দেওয়ার দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করা ও রপ্তানি বিলের স্ট্যাম্প ডিউটি প্রত্যাহার চান। এছাড়া রপ্তানি আয়ের বিপরীতে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ উৎসে কর চলতি অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে কার্যকর, ব্যাংকঋণের সুদহার কমানো এবং ১৩৩টি রুগ্ণ শিল্পের ২৩৮ কোটি টাকার মূল ঋণ এবং আরোপিত ও অনারোপিত সুদসহ সমুদয় পাওনা মওকুফ করার প্রস্তাব করেন।

রুবানা হকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, নগদ সহায়তার ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন। রপ্তানি বিলের বিপরীতে স্ট্যাম্প ডিউটি তুলে নেবেন। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সব রপ্তানি আয় দেশে আসছে না। কাস্টমসের কাছে রপ্তানির যে তথ্য, তার সঙ্গে ব্যাংকের তথ্যে মিল থাকছে না।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কাস্টমসের হয়রানি নিয়ে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, স্যাম্পল (নমুনা) শিপমেন্ট খালাস করতে দিনের পর দিন সময় নিয়ে নেয় কাস্টমস। এতে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই ধরনের মন্তব্য করেন বিজিএমইএর আরেক সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। এ দুজনই ব্যাংকঋণের সুদহার প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার জন্য উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

তাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, বেসরকারি ব্যাংক কস্ট অব ফান্ড বেশি বলে ঋণের সুদহার কমাচ্ছে না। কিন্তু রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে। ফলে দেশের ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে চলে আসতে পারেন।