বিকল্প ব্যবস্থা থাকার পরও সরকারের কয়লার ওপর মাদকীয় নির্ভরতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বুধবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘কয়লায় শ্বাসরুদ্ধ : কার্বন বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ’ নামক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মার্কেট ফোর্সেস ও থ্রিফিফটি নামের দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশে এর সহপ্রকাশক বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), টিআইবি ও ওয়াটার কিপার্স বাংলাদেশ। একইদিন অস্ট্রেলিয়াতেও এটি প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন ওয়াটারগেট বাংলাদেশের কো-অর্ডিনেটর শরিফ জামিল।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ অপরিহার্য। এটি যৌক্তিকভাবে সরকারের প্রাধান্য পেয়েছে। অভূতপূর্ব সাফল্যও এসেছে। কিন্তু এটা প্রকৃতি, পরিবেশ ধ্বংস করে নয়। মনে রাখতে হবে, একটাই বাংলাদেশ, একটাই পরিবেশ। বর্তমানে দেশে শুধু বাতাস থেকে ২১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। অথচ সরকার কয়লার দিকে ঝুঁকছে। ভারত, চীন, জাপান ও আমেরিকার আগ্রাসী বিনিয়োগের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। অথচ ওইসব দেশ কয়লা থেকে সরে এসেছে। মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা এসব আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। সব কয়লাই দূষণ ছড়ায়। এগুলোর কোনোটারই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নেই। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ীও বেআইনি। দেশে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার। স্বল্পমেয়াদি স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে। সরকারে ২৯টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে বর্তমানের চেয়ে ৬৩ গুণ বেশি কয়লা ব্যবহার হবে। এটা সরকারের অঙ্গীকার, এসডিজি ও প্যারিস চুক্তির পরিপন্থী। দেশের ৪ কোটি ২০ লাখ জনগণ এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ও দ্রুত দূষণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। সরকার ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিশ্রুতি দিলেও ৪ শতাংশেরও কম উৎপাদিত হচ্ছে। আমরা ২৮ মাস আগে সরকারকে ১৩টি গবেষণা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারের উচিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থগিত করা ও নাবায়ণযোগ্য বিদুৎকেন্দ্র স্থাপন করা।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশে একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সরকার এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০টি করার উদ্যোগ নিয়েছে যা থেকে লক্ষ্যমাত্রা ৩৩ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। অথচ সৌরশক্তি ব্যবহার করেই ৫৩ গিগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের।
প্রস্তাবিত ও চলমান কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প সমূহের পরিবর্তে স্বল্প খরচে সৌরশক্তি বা বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে বাংলাদেশ চাইলেই তার প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। বর্তমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বায়ুমণ্ডলে বার্ষিক ১১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করবে। যা বাংলাদেশের দুর্দশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অিস্তত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলবে। এছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদেশি ঋণনির্ভর হওয়ায় ঋণের বোঝা বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্য আরও প্রকট হবে। আবার তিনটি বাদে বাকি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র নদীর তীরবর্তী হওয়ায় পানি ও জীববৈচিত্র্যে বড় প্রভাব ফেলবে। এটা আইনেরও পরিপন্থী।