রোহিতের নির্মমতায় বাংলাদেশের হার

এক ম্যাচ হাতে রেখে সিরিজ জিতে ইতিহাস গড়ার হাতছানিতে রোমাঞ্চিত ছিল বাংলাদেশ। ভারতের চ্যালেঞ্জ ছিল দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিটা জিতে সিরিজে সমতা আনার। এই দুইয়ের মধ্যে ‘মহা’ নামের সাইক্লোন ছিল দাঁড়িয়ে। শেষ পর্যন্ত ‘মহা’ আঘাত হানেনি। কিন্তু ভারতের স্ট্যান্ড ইন ক্যাপ্টেন রোহিত শর্মা গেল রাতে সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ‘টর্নেডো’ বইয়ে দিয়েছেন। ৪৩ বলে খেলেছেন ৮৫ রানের বিধ্বংসী ইনিংস। ৩ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ১-১ এ এনে স্বাগতিকরা এখন স্বস্তিতে। আর নাগপুরে ১০ নভেম্বরের শেষ ম্যাচটাকে ‘ফাইনাল’ মেনে রাজকোট ছাড়তে হচ্ছে মাহমুদউল্লাহর বাংলাদেশকে।

ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে ঘোর লাগা অনুভূতি নিয়ে রাজকোটে পা রেখেছিল বাংলাদেশ। এখন তারা বাস্তবতায়। দুই দলের একাদশ ছিল অপরিবর্তিত। দারুণ ব্যাটিং উইকেটে বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যাটসম্যান দাঁড়িয়ে গেলেও কেউ দলের স্কোরটাকে চ্যালেঞ্জিং করার দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। শিখর ধাওয়ানকে একপ্রান্তে রেখে রোহিতের নির্মম-নিষ্ঠুর ব্যাটিং উপস্থিত ২৬-২৭ হাজার দর্শককে পরে মারমার কাটকাট ব্যাটিংয়ের টি-টোয়েন্টি উপভোগের সুখ

দিয়েছে। নিজেদের দলের সাফল্যে বারবার আতশবাজি জ্বলা রাতে প্রায় সারাক্ষণ উৎসবেও মেতে থাকতে পেরেছেন তারা। ১৫.৪ ওভারে যখন ৮ উইকেটের জয় নিশ্চিত হলো তখন অনন্য সুন্দর এই স্টেডিয়ামে নিল জার্সির মুখরিত উল্লাসে কান পাতা দায়। যে অবস্থা থেকে তাদের দলের এই ফেরা, তাতে এমন উদযাপন তো হওয়ার কথাই ছিল।

টস হেরে আগে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ১৫৩ রান অতিথিদের। বোলারদের জন্য শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে এই পুঁজিতে লড়ার উপায় থাকেনি। তার ওপর প্রথম ম্যাচে প্রথম ওভারে আউট হওয়া রোহিত শুরু থেকে আগুন হয়ে জ্বলেছেন। সেই আগুনে প্রতিপক্ষকে পুড়িয়ে ২৬ বল হাতে রেখে ২ উইকেটে ১৫৪ রানে ভারত।

রোহিত ৪৩ বলে সমান ৬টি করে ছক্কা ও চারে ৮৫ রান করেছেন। ২৩ বলে তার ফিফটি। ছক্কার উৎসব করেছেন। শিখর ধাওয়ানের (৩১) সঙ্গে তার ১১৮ রানের উদ্বোধনী জুটি। ক্ষমা পাননি বাংলাদেশের কোনো বোলার। সবাই খরুচে।

মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের অধিনায়ক রোহিত তার সাবেক আইপিএল সতীর্থ মোস্তাফিজুর রহমানকে চতুর্থ ওভারে দুই ছক্কা মারেন। তার আগে অন্য দুই পেসার শফিউল ইসলাম ও আল-আমিন হোসেনও নির্মমতার শিকার। তরুণ আফিফ হোসেনকে রোহিত স্বাগত জানিয়েছেন ছক্কায়। ৬ ওভারে ৬৩ এর পর ৯.৪ ওভারে তাই ১০০।

মাহমুদউল্লাহ মোসাদ্দেক হোসেনকে বল দিয়েই বিপদে। প্রথম তিন বলে টানা ছক্কা রোহিতের। এরপর কোনোমতে ওভার শেষ করতে পারলেও একমাত্র ওভারে মোসাদ্দেক দেন ২১। আমিনুল ইসলাম বিপ্লব পরপর দুই ওভারে শিখর ও রোহিতকে আউট করলেও ততক্ষণে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ। স্পিন পড়তে না পেরে নিচে নেমে বোল্ড শিখর। হঠাৎ নিচু হওয়া বলকে যথেষ্ট জোর লাগাতে না পারায় ডিপ মিড উইকেটে রোহিতের ক্যাচ। লোকেশ রাহুল (৮*)ও স্রেয়াশ আয়াররা কেবল রোহিতের বাকি কাজটা দেখতে না দেখতে শেষ করেছেন।

বাংলাদেশের ইনিংসে লিটন কুমার দাস বা সৌম্য সরকারের মধ্যে যে কেউ নায়ক হতে পারতেন। সম্ভাবনা ছিল নাঈম শেখেরও। তিনজনই টিকেছেন। রান করেছেন। কিন্তু যতটা স্মার্টনেসের সঙ্গে ব্যাট করলে ক্যাপ্টেনের চাওয়া মতো ১৭০ কিংবা ১৮০ হতে পারত তার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। ২১ বলে ৪ বাউন্ডারিতে ২৯ লিটনের। সৌম্য ২০ বলে ২ চার ও ১ ছক্কায় ৩০ করেছেন। ৩১ বলে ৫ বাউন্ডারিতে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচে নাঈমের রান ৩৬।

১৭ ও ২৬ রানে দুটো নতুন জীবন পান লিটন। এমন সুযোগও কাজে লাগাতে পারেননি। প্রথমবার ঋশভ পান্ত স্টাম্পের সামনে থেকে বল এনে স্টাম্পড করেন লিটনকে। ওপেনার মাঠ ছাড়েন। টিভি রিপ্লেতে ঋশভের গ্লাভস স্টাম্পের সামান্য সামনে দেখা গেলে ফেরত আনা হয় তাকে। পরের টানা দুই বলে তার বাউন্ডারি মিড অন ও পয়েন্ট দিয়ে।

পরের বার লিটন বল তোলেন আকাশে। তিন ফিল্ডারের কে বল ধরবেন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তবু যুজবেন্দ্র চাহালের বলে বোকার মতো উইকেট দেন লিটন। গুগলি বোঝেননি। বল প্যাডে লেগে কোথায় গেল না দেখে ঝেড়ে দৌড় মারেন। হাতের নাগাল থেকে বল কুড়িয়ে ঋশভ নন স্ট্রাইকে বল ছুড়ে রান আউট করেছেন লিটনকে। অবশ্য তা না হলেও রিভিউ নিলে এলবিডব্লিউ হতেন ব্যাটসম্যান।

পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে ৫৪। ৬০ রানে পড়ে প্রথম উইকেট। খলিল আহমেদকে শুরুতে তিন বলের মধ্যে মিড উইকেট ও থার্ড ম্যান দিয়ে বাউন্ডারি মেরে আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলেন নাঈম। কিন্তু একাদশ ওভারে সøগ সুইপে বল তুলে অফ স্পিনার ওয়াশিংটন সুন্দরের শিকার।

১২.৩ ওভারে ১০০। মনে হচ্ছিল ঠিক পথে বাংলাদেশের ব্যাটিং। কিন্তু চাহালদের বোলিং ভালো হচ্ছিল। ১২ ওভারে ২ উইকেটে ৯৭ এর পরের ৩ ওভারে ১৫ রান তুলতে দুই উইকেট নেই। দিল্লিতে ম্যাচ জেতানো মুশফিকুর রহিম (৪) প্রিয় শট সুইপ খেলতে গিয়ে আকাশে ওঠান বল এবার। চাহালের জোড়া উইকেটের ওভারের প্রথম বল ওটি। শেষ বলে সৌম্য স্টাম্পড।

১০৩ রানে ৪ উইকেট হারানোর পরও ৭ ওভার বাকি। টার্নিং পয়েন্ট হতে পারত ক্যাপ্টেন মাহমুদউল্লাহর (২১ বলে ৪ বাউন্ডারিতে ৩০) সঙ্গে আফিফ হোসেন (৮ বলে ৬) কিংবা মোসাদ্দেক হোসেনের (৯ বলে অপরাজিত ৭) কারও চেষ্টা। আফিফ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই ইনিংসের পর ব্যাট হাতে নিজেকে আর চেনাতে পারছেন না। মোসাদ্দেক বিবর্ণ একজন। শট সব হারিয়েছেন কিংবা চেষ্টার অভাব।

মাহমুদউল্লাহকে চেষ্টা না করলে চলে না। খলিল আফিফকে ফেরানোর পরের দুই বলে বাউন্ডারি মারেন ক্যাপ্টেন। তবে ১৯তম ওভারে দিপক চাহারের লাফানো বলকে শর্ট থার্ড ম্যানের মাথার ওপর দিয়ে বাউন্ডারি বানাতে গিয়ে ওখানেই ক্যাচ দেন অধিনায়ক।

লিটন, নাঈম, সৌম্যদের মধ্যে কারও একটা ইনিংস হলে লড়াইয়ের পুঁজি থাকত। কিন্তু আফিফ-মোসাদ্দেকরা সুযোগের অপচয় করলেন। ভারতের মতো দলের বিপক্ষে ভারতেই ১-০ এর লিড নিয়ে সিরিজ জেতার সম্ভাবনার ম্যাচে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে হয়? বোলাররা এমন উইকেটে মরিয়া ভারতের ব্যাটসম্যানদের সামনে শেষে তাই লড়তেই পারলেন না।