বলয় ভাঙতে মরিয়া ইরাকিরা

সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর পর প্রতিবাদ-বিক্ষোভে আবারও জেগে উঠেছে ইরাকি জনতা। রাজধানী বাগদাদে বিক্ষোভকারীদের মনের চাপা কথা সেস্নাগান দিয়ে বলার জায়গা তাহরির স্কয়ার। এ স্কয়ারকে কেন্দ্র করেই দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানাতে। ইরাকে দুই মাস ধরে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে কর্তৃপক্ষ আরও মারমুখী হয়ে উঠছে আন্দোলনকারীদের ওপর। বিক্ষুব্ধ জনতা যাতে গ্রিন জোনের দিকে এগোতে না পারে, তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে ইরাকি প্রশাসন।

বিক্ষোভকারীদের দাবি সরকার পতনের। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউজের গবেষক রিনাদ মানসুরের মতে, ‘সরকার বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে একটি শব্দ ব্যবহার করছে, মুখারাবিন। এর অর্থ উৎপাতকারী। প্রতিদিন বিক্ষোভে যোগ দেওয়া অসংখ্য মানুষ তাদের কাছে এখন স্রেফ উৎপাতকারী। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ক্রমেই বিক্ষোভকারীদের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠছে। রাস্তা থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে সর্বোচ্চ পন্থা নিতে প্রস্তুত তারা।’

গত রবিবার জাতিসংঘ ইরাকের সহিংসতা বন্ধে এক বিবৃতিতে একটি সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। জাতিসংঘ ইরাক সরকারকে সতর্ক করে বলছে, বিক্ষোভকারীদের এ আন্দোলন যেকোনো মুহূর্তে ছিনতাই হতে পারে আর তা ইরাকের জন্য ভালো হবে না। অবশ্য জাতিসংঘের প্রস্তাবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আদিল আবদুল মাহাদির পদত্যাগের বিষয়টি নেই। যদিও বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর বাগদাদ প্রশাসনের এক কর্মকর্তা মাহাদির পদত্যাগের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সুলেইমানির হস্তক্ষেপে সেই সম্ভাবনা দূর হয়ে যায়।

ইরাকের বিক্ষোভকারীরা আজ শুধু সরকারের পতন চায় না। তারা চায় গোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন। ২০০৩ সালে ইরাকে বিদেশি শক্তির আগ্রাসন-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সরকারি ব্যবস্থার পতন চাইছে তারা। ইরাকে সংসদীয় ব্যবস্থা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। স্থানীয় এক বিশেস্নষক বলেন, ‘ইরাকে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের বিনিয়োগ তথা ইরানি পক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্র পক্ষ উভয়ের প্রণীত ব্যবস্থার অধীনে আর থাকতে চাইছে না ইরাকিরা।’

এর আগেও ইরাকিরা প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমেছিল। ২০১১ সাল থেকেই দেশটিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার বিক্ষোভ হয়। ২০১৫ ও’ ১৬ সালে বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৮ সালে দারিদ্র্যপীড়িত বসরা প্রদেশে সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের দাবিতে ব্যাপক জনবিক্ষোভ হয়। তখন সরকারের আশ্বাসে সেই আন্দোলন শেষ হলেও এবার আর বিক্ষোভকারীরা সরকারের সঙ্গে কোনো আপসে যেতে চাইছে না।

এখন ইরাকিরা আরও বেশি সংগঠিত। গ্রিন জোনের আশপাশের গোটা এলাকায় তারা ছাউনি ফেলে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে এখন পর্যন্ত ২৬০ জনের বেশি ইরাকি নিহত হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে বিক্ষোভকারীদের জড়ো হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চাইছে মাহাদি প্রশাসন। কিন্তু এমন দমন-পীড়নের মধ্যেও তারা জড়ো হচ্ছেন নিজেদের কায়দায়। প্রায়ই মুখোশধারীরা বিক্ষোভকারীদের ধরে বেধড়ক পিটিয়ে আন্দোলনে না যাওয়ার জন্য হুমকি-ধামকি দিচ্ছে।

কিন্তু এমন অত্যাচার করেও আন্দোলন দমানো যাবে না বলে জানান বিক্ষোভকারী মুয়ামাল আবদুল শহিদ আল শুমারি। তার ভাষ্যমতে, ‘আমাদের পক্ষে কেউ নেই, এমনকি খোদাও না।’