অশ্বিনদের সামলানোর পথ দেখাচ্ছেন ম্যাকেঞ্জি

ভারতে খেলতে এলে বাইরের দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দলের ভাবনায়ও সারাক্ষণ ঘুরপাক খায় স্পিন। জুজু যেন এক। বাংলাদেশও ইন্দোরে পা রেখে রবিচন্দ্রন অশ্বিন-রবিন্দ্র জাদেজাদের ঘূর্ণির মাঝে পড়েছে। টেস্ট শুরুর আগে। অনুশীলনেই। সেখানে মুশফিক-মুমিনুলদের ত্রাণকর্তা হয়ে খুব ব্যস্ত সময় কাটছে ব্যাটিং কোচ নিল ম্যাকেঞ্জির।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক এই ব্যাটসম্যান এতদিন বাংলাদেশের সীমিত ওভারের দলের উপদেষ্টা ছিলেন। তাকে পুরো সময় পাওয়ার চেষ্টা চলছিল। আপাতত ভারতের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার দুই ম্যাচ সিরিজের কেবল প্রথম টেস্টের জন্য রাজি করানো গেছে।

ম্যাচ শুরুর দুদিন আগে, গতকাল সকালে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহসহ দলের সেরা ব্যাটসম্যানদের নিয়ে নেট ও নেটের বাইরে কাজ করছিলেন ম্যাকেঞ্জি। ইমরুল-মুমিনুলরাও অধ্যবসায়ী-মনোযোগী শিক্ষার্থীর মতো ম্যাকেঞ্জির পথে হেঁটেছেন। সাদমান-মিঠুন-লিটনরা তাদের গুরুর কাছ থেকে অশ্বিন-জাদেজার স্পিন আরও ভালোভাবে খেলার কৌশল শেখার জন্য যতটুকু সময় মেলে তার পুরো ব্যবহারের চেষ্টা করছেন।

গত মাসে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিজেদের মাঠে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে বিরাট কোহলির দল। ৩-০ তে হোয়াইটওয়াশ। প্রথমটি বিশাল রানের ব্যবধানে, পরের দুটিতে ইনিংস ব্যবধানে জয়। নিজেরা হারিয়েছিল মাত্র ২৫ উইকেট। সেখানে অশ্বিন-জাদেজার মতো স্পিনাররা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শিকারে। অশ্বিন ১৫ আর জাদেজা ১৩ উইকেট নেন ওই সিরিজে। কিন্তু বাংলাদেশ দলের ভাবনায় আছে হলকারের উইকেটের ইতিহাসও।

এই মাঠে এখন পর্যন্ত একটাই টেস্ট খেলেছে ভারত। ২০১৬ সালে। প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছিল ৩২১ রানে। অফ স্পিনার অশ্বিন দুই ইনিংসে ১৩ উইকেট (৬ ও ৭) নিয়ে হয়েছিলেন ম্যাচের সেরা। দুটি করে উইকেট ছিল বাঁহাতি স্পিনার জাদেজার। মানে, কিউইদের ২০ উইকেটের ১৭টি ছিল স্পিনার-জুটির।

হলকারে গতকাল ম্যাকেঞ্জি প্রথমে নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে দাঁড়িয়ে মুশফিকুর রহিমকে স্পিনারদের করা বল ভিডিও করলেন। পাশে ড্যানিয়েল ভেট্টোরি। পাশের নেটে পেসাররা বল করলেও এদিন বাংলাদেশের পুরো মনযোগ ছিল বুঝি ব্যাটসম্যান ও স্পিনারদের ওপর। একদিকে কিংবদন্তি ভেট্টোরির পরামর্শে তাইজুল-মিরাজ-নাঈমদের আরো শাণিত হয়ে ওঠার চেষ্টা। পাশাপাশি ব্যাটসম্যানদের কী করণীয় তার দীক্ষা নেওয়া।

কিছুক্ষণের মধ্যে মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে মুশফিকের পাশে ম্যাকেঞ্জি। অনেকক্ষণ ধরে বোঝান দুজনকে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময়ের খেলা টেস্ট বলে রক্ষণে আরও জোর দেন। সেখান থেকে আক্রমণে যাওয়ার কৌশল নিয়েও হয় আলোচনা। নেটের ভেতরে দু’পাশে শর্টের ক্যাচিং ফিল্ডার পজিশনের মার্ক দিয়ে রাখা। এতদিন আক্রমণাত্মক ক্রিকেট শিখিয়েছেন। এবার ওদিক থেকে সরে এসে ম্যাকেঞ্জি ব্যাটসম্যানদের মাথায় ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন সর্বনাশা স্পিনারদের বিপক্ষে ঝুঁকিহীন খেলার কৌশল।

বিশেষ করে শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় এমন খুব কাছাকাছি থেকে ভেট্টোরির সহায়তা নিয়ে ম্যাকেঞ্জির কাজ চোখ কেড়েছে প্রতিপক্ষ দলের মিডিয়ারও। সংবাদ সম্মেলনে আসা মোহাম্মদ মিঠুনকে ভারতীয় এক সাংবাদিক তো প্রশ্ন করে বসলেন, ‘অশ্বিন-জাদেজাদের সামলানোর কী কৌশল বাতলালেন ম্যাকেঞ্জি?’

পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে সেই রহস্য উন্মোচন করা যায় না। হাসেন মিঠুন, ‘এটা টেকনিক্যাল ব্যাপার, দলের ভেতরে থাকাই ভালো। সবাইকে বলার মতো বিষয় নয়। এটা টিম প্ল্যানের মধ্যেই পড়ে।’

ম্যাকেঞ্জি এক পর্যায়ে শট খেলার সময় মুমিনুল হকের মাথার পজিশন নিজের হাতে ধরে ঠিক করে দেন। মাহমুদউল্লাহকে শ্যাডো করে দেখান, ‘এভাবে’। সাদমানের স্ট্যান্সকে আরও ঠিক করতে বলেন। লিটন দাসের ব্যাটের কানা নিচ্ছিল বল। ওই বিপদ থেকে বাঁচার উপায় ব্যাখ্যা করে দিলেন।

এমনিতে ভারতের উইকেট দ্রুত স্পিনারদের হয়। ক্ষতবিক্ষত সেই উইকেটে বিশ্বমানের স্পিনার সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। এখানে আবার অশ্বিন শেষবার ম্যাচের সেরা। নাঈম হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজকে তাই অশ্বিনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। ভেট্টোরি দেন প্রেরণা। নিজের জায়গা বারবার বদল করতে থাকা ম্যাকেঞ্জি কখনো আম্পায়ারের ভূমিকায়, কখনো উইকেটের পেছনে, কখনো বা নেটের বাইরের ব্যাটসম্যানের সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

অশ্বিন-জাদেজাকে সামলাতে নিজেদের তৈরি করার বিষয় কতটা মাথায় নিয়েছেন ব্যাটসম্যানরা তা শেষে স্পষ্ট হলো মিঠুনের কথায়। প্রসঙ্গে ছিলেন ম্যাকেঞ্জি। মিঠুনের জবাব, ‘ওদের স্পিনের বিপক্ষে কীভাবে ব্যাটিং করব সেটা নিয়ে বেশি ভাবছি। পেস বোলারদের চেয়ে ওদের স্পিনারদের সামলানো বেশি কঠিন হবে, এমন অনুভব করছি। কারণ, (উইকেট) প্রথম এক-দুই দিন ব্যাটিংয়ের জন্য সহায়ক থাকে। তৃতীয় দিন থেকে স্পিনারের সহায়তা থাকে। সেটা কিভাবে সামলাতে পারি এর জন্য টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো নিয়ে (ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে) কাজ করছি আমরা।’

টানটান সফরসূচির মধ্যে মেলেনি কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ। ম্যাকেঞ্জিও এই প্রথম গোটা দলের ব্যাটসম্যানদের এক জায়গায় এনে কাজে নেমেছেন। হাতে মোটে দিনদুয়েক। দেখার বিষয়, এই অল্প সময় ম্যাকেঞ্জির ভারতীয় স্পিন সামলানোর দীক্ষায় কী শিক্ষা মেলে।