ছিটকে পড়া রুমার ওপর বাসের চাকা

রাজধানীতে আবারও চালকের খামখেয়ালিতে বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক নারী। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর শান্তিনগর মোড়ের ওই দুর্ঘটনায় নিহতের নাম কানিজ ফাতেমা রুমা (৩০)। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, বাস থেকে নামার সময় চালক গতি বাড়ালে পড়ে যান রুমা। তখন বাস না থামিয়ে তার পায়ের ওপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দেন চালক। পরে হাপসাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা দেড়টার দিকে রুমার মৃত্যু হয়। তাকে চাপা দেওয়া বাসটি পুলিশ জব্দ করলেও পালিয়ে গেছে চালক।

নিহত রুমা শান্তিনগরের কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংকে কমিউনিকেশন অফিসার পদে চাকরি করতেন। স্বামী শফিকুল ইসলামের সঙ্গে রাজধানীর দক্ষিণ দনিয়ার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তিনি।

শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, গত সোমবার অফিস শেষে মিরপুরের পল্লবীতে বাবার বাসায় যান রুমা। গতকাল সকালে মিরপুর-১১ নম্বর থেকে আল-মক্কা পরিবহনের একটি বাসে করে শান্তিনগরের অফিসে আসছিলেন। শান্তিনগর চৌরাস্তায় নামার সময় একটু গতি কমিয়েই আবার দ্রুত বাসটি চালাতে শুরু করে চালক। এতে রুমা ছিটকে রাস্তায় পড়ে বাসের চাকার সামনে চলে যান। তখন চালক বাসটি না থামিয়েই তার পায়ের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়। এতে বাসের পেছনের চাকায় রুমার ডান পা থেঁতলে যায়। তখন পথচারীরা ঘটনাস্থলের পাশেই রুমার কর্মস্থল কোয়ান্টাম অফিসে খবর দেয়। পরে সহকর্মীরা রুমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

রুমার সহকর্মী আবদুল আউয়াল জানান, ২০১৩ সাল থেকে কোয়ান্টম ব্ল¨াড ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন রুমা। বাস থেকে নামার সময় চাপা পড়ে তার আহত হওয়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান কয়েকজন সহকর্মী। তারা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ১১টার দিকে আইসিইউতে নেওয়া হয় রুমাকে। পরে দুপুর দেড়টার দিকে তিনি মারা যান।

রুমার স্বামী শফিকুল জানান, পাঁচ বছর আগে তাদের বিয়ে হলেও কোনো সন্তান নেই। তিনি টিউশনি করেন আর রুমা কোয়ান্টামে চাকরি করতেন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে। আর রুমার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। বাবার নাম আবুল ইসলাম। তাদের পরিবার স্থায়ীভাবে পল্লবীতে থাকত। স্বজনদের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই রুমার মরদেহ দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয়।

লাশ হস্তান্তরের আগে রুমার স্বজনরা মর্গের সামনে ভিড় জমান। এ সময় তাদের আহাজারিতে হাসপাতাল চত্বরে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তারা কেউই যেন রুমার অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলেন না।

রুমার ভাই শামসুদ্দীন তপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ৫ ভাই-বোনের মধ্যে আপু (রুমা) ছিলেন সবার বড়। তিনি সবসময় ভাই-বোনদের লেখাপড়ার দিকে খেয়াল রাখতেন। বোনের এই মৃত্যু আমাদের মাথায় বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো।’

কোয়ান্টাম ল্যাবের কর্মকর্তারা জানান, রুমা ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও সদালাপী। কাজের প্রতি ছিলেন খুবই আন্তরিক। তার অকাল মৃত্যুতে সহকর্মীদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে আসে।

পল্টন থানার এসআই জাফরুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে জানান, দুর্ঘটনার পর খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে বাসটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক ও তার সহকারী দুর্ঘটনার পরই বাসটি ফেলে পালিয়ে যায়। চালককে ধরতে খোঁজ চলছে।

এর আগে গত ২৭ আগস্ট রাজধানীর বাংলামোটরে ট্রাস্ট পরিবহনের বাসের চাপায় পা হারান অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডবিস্নউটিসি) সহকারী ব্যবস্থাপক কৃষ্ণা রায় (৫২)। গত বছরের এপ্রিলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারানোর দুই সপ্তাহ পর হাসপাতালে মারা যান কলেজ ছাত্র রাজিব হোসেন। চলতি বছরের মার্চে প্রগতি সরণীতে বাসচাপায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী।

এর আগে গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের রেষারেষিতে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত হয় এবং আহত হয় ১০ জন। ওই বছর ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্কুলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ওই আন্দোলনের পর জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করে সরকার। তারা সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ১১১ দফা সুপারিশ করে। ওই সুপারিশের আলোকে জরিমানা ও সাজার পরিমাণ বাড়িয়ে সড়ক পরিহনের নতুন আইন করে সরকার। এই আইনটি কার্যকরের নানা উদ্যোগের মধ্যেই মঙ্গলবার প্রাণ হারালেন কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংক কর্মী রুমা।