হেমন্তের সন্ধ্যায় ঝেঁকে বসেনি শীত। এদিকে নগরীর মানুষ মেতে উঠল বাউল গানে। সন্ধ্যা ৬টায় মঞ্চে উঠলেন ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’র শিল্পী শফিকুল ইসলাম। গেয়ে শোনালেন শাহ আবদুল করিমের বিখ্যাত গান ‘যা দিয়েছ তুমি আমায়/কী দেব তার প্রতিদান/মন মজালে ওরে বাউলা গান’।
রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে গতকাল শুক্রবার এই গানের মধ্য দিয়েই শুরু হলো ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্টের দ্বিতীয় দিনের পরিবেশনা। সান ফাউন্ডেশন ও সান কমিউনিকেশনস লিমিটেডের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী লোকসংগীতের এই আসর বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত শিল্পীরা শোনান শেকড়ের গান। প্রতিবারের মতো এবারও দর্শক বিনামূল্যে শুধু অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি সরাসরি উপভোগ করছেন। সরাসরি অনুষ্ঠানটির টিভি সম্প্রচারের
দায়িত্বে রয়েছে মাছরাঙা টেলিভিশন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানটি লাইভ শোনা যাচ্ছে রেডিও দিনরাত-এ।
গতকাল শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের আয়োজনে সন্ধ্যা থেকেই দেখা যায় হাজারো দর্শকের উপস্থিতি, আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামতেই দর্শকের উপচেপড়া ভিড়। শুরুতেই শিল্পী শফিকুল ইসলাম একে একে গেয়ে শোনানÑ ‘তুমি কই গেলা কই রইলা বন্ধু রেআমারে কান্দাইয়া’, ‘কী সুন্দর এক গানের পাখি/মন নিয়া সে খেলা করে’ প্রভৃতি গান। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মঞ্চে আসেন ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’র আরেক শিল্পী কামরুজ্জামান রাব্বি। প্রথমেই গেয়ে শোনান- ‘টাকডুম টাকডুম বাজায় বাংলাদেশের ঢোল’। এরপর একে একে এই শিল্পী গেয়ে শোনান ‘একটা পান চাইয়া পান দিলে না তোমার সাথে কিসের পিরিতি’, ‘আমি তো ভালা না/ভালা লইয়্যা থাইকো’, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ইত্যাদি গান। রাত সোয়া ৭টায় মঞ্চে ওঠেন কাজল দেওয়ান। মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের গান ‘আমার মন পাগলা/দিন ফুরাইলে ভাইঙ্গা যাইব, এই রঙের মেলা’ গানটি গেয়ে শোনান তিনি। এরপর একে একে ‘পিরিতের বাজার ভালো না’, ‘আমি তোর পিরিতের দেওয়ানা/মন জানে আর কেউ জানে না’, ‘তুই জীবন ছাড়িয়া গেলে’, ‘না না কদমতলায় আমি যাব না’ গানগুলো গেয়ে দর্শক মাত করেন তিনি।
সোয়া ৮টায় মঞ্চে আসেন মালির গানের দল হাবিব কইটেক অ্যান্ড বামাদা। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যতিক্রম গিটার বাদন ও গায়কি দিয়ে সংগীতাঙ্গন মাতিয়ে রেখেছেন হাবিব কইটেক। ১৯৯৪ সাল থেকে নিজের ব্যান্ড বামাদাকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কনসার্টে গান করেছেন। গতকাল ফোক ফেস্টের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মালির এই দলটি। বাদ্যযন্ত্র ও কণ্ঠে অপূর্ব সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করেন শিল্পীরা। মালির নিজস্ব লোকসংগীতকে তুলে ধরেন তারা।
এরপর মঞ্চে আসেন বাংলাদেশের বাউল শিল্পী ও গবেষক ফকির শাহাবুদ্দিন। তিনি গেয়ে শোনান আবদুর রহমান বয়াতির গান ‘দে রে পাল তুলে দেরি করিস ন ছেড়ে দে নৌকা আমি যাব মদিনা’, ‘একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘর’, ‘আমারে আসিবার কথা কইয়্যা মান করে রাই রইয়াছেন দাঁড়াইয়া’, ‘সোনার ময়না ঘরে থুইয়্যা বাইরে তালা লাগাইছে/রসিক আমার মন বান্ধিয়া পিঞ্জর বানাইছে’, ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে’, ‘স্কুল খুইলাছে রে মাওলা গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী স্কুল খুইলাছে’ প্রভৃতি গান।
দ্বিতীয় দিনের শেষ আকর্ষণ ছিলেন পাকিস্তানের শিল্পী হিনা নাসরুল্লাহ। সুফি ঘরানার শিল্পী হিনা। শৈশব থেকে টেলিভিশনে হামদ ও নাত পরিবেশনের মাধ্যমে তার সংগীত জীবনের শুরু। উর্দুর পাশাপাশি সিন্ধি ও সারাইকি ভাষায়ও গান করেন তিনি। পরে কোক স্টুডিওর মাধ্যমে পেয়েছেন ব্যাপক পরিচিতি। রাত সাড়ে ১০টা থেকে শুরু হয় হিনার পরিবেশনা। এই শিল্পীর পরিবেশনার মধ্য দিয়েই পর্দা নামে দ্বিতীয় দিনের আয়োজনের।
আজ সমাপনী দিনের শিল্পীরা
উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় পাকিস্তানের জুনুন। সুফি ঘরানার গান পরিবেশন করে দুই যুগের বেশি সময় ধরে শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রেখেছে এ ব্যান্ড দলটি। ১৯৯৭ সালে নিজেদের চতুর্থ অ্যালবাম ‘আজাদি’ দিয়ে উপমহাদেশজুড়ে ঝড় তোলে। ৩০ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয় অ্যালবামটির। এ ছাড়া রাশিয়ার কারেলিয়া অঞ্চলের জনপ্রিয় ব্যান্ড দল সাত্তুমা। একই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ২০০৩ সালে দলটি গড়া হয়। মঞ্চে নানা ধরনের ইনস্ট্রুমেন্ট বাজিয়ে শ্রোতাদের আবিষ্ট করেন সাত্তুমার সদস্যরা। সমাপনী দিনে এ দুটি দলের পরিবেশনা মঞ্চ মাতাবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মালেক কাওয়াল ও চন্দনা মজুমদারের পরিবেশনা রয়েছে সমাপনী দিনে।