সম্প্রীতির তাৎপর্য, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান

‘সম্প্রীতি’ নিয়ে আমরা যতই ফুলঝুরি ছড়াই না কেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন অনেকটাই কিংবদন্তির সোনার হরিণ। তাকে কাছে পাওয়া কঠিন। কী বিভাগপূর্বকালে, কী বিভাগোত্তর সময়ে ত্রিধাবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে সত্যিকার অর্থে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শুদ্ধ প্রকাশ কমই দেখা গেছে। বিশেষ করে মানসিক স্তরের সম্প্রীতি।

তবু আমরা সম্প্রীতির জন্য হাপিত্যেশ করি। কারণ দুই সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘকাল যাবৎ পাশাপাশি বাস করছে। সে ক্ষেত্রে সম্প্রীতি তথা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কোনো বিকল্প নেইÑ তা কী ভারত-পাকিস্তান, কী বাংলাদেশ। কিন্তু দূষিত রাজনীতি বা উগ্রধর্মীয় সংস্কৃতি ‘সম্প্রীতির পক্ষে বড় বাধা’। আর এ উপলক্ষে লক্ষণীয়, ত্রিধাবিভ ক্ত উপমহাদেশের কোনো অংশে আলোড়ন দেখা দিলে তার যুক্তিহীন প্রভাব পড়ে অন্যত্র, রক্ত ঝরে, প্রাণ হারান কিছু মানুষ। এমনসব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, যেমন বিভাগপূর্বকালে, তেমনি বিভাগোত্তর সময়ে। ছোট-বড় নানা ঘটনায়, গানের ভাষায় ‘কত প্রাণ হলো বলিদান’! বড় ঘটনার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তাতে অসংখ্য নিরীহ মানুষের মৃত্যু এবং তা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের। বলা হয়েছিল, দেশ ভাগ বীভৎস নরহত্যা বন্ধ করবে। কিন্তু করেনি। কারণ, ওই যে উগ্রধর্মীয় চেতনা, ধর্মীয় সংস্কৃতির পারস্পরিক বিদ্বেষ সেই অমানবিক চরিত্র থেকে তো ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মুক্তি মেলেনি।

সেই উগ্রতার জের ধরে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক, সেখানে রামমন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির অভিযোগ কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর যেমন আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, মহারাষ্ট্রের শিবসেনা দল, সর্বোপরি রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির (ভারতীয় জনতা পার্টি) । নামে ‘জনতা পার্টি’, চরিত্র বিচারে প্রকৃতপক্ষে হিন্দু মহাসভার মতোই উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সংগঠন। এরা কথিত বহুত্ববাদী, বহু জাতিসত্তা ও বহু সংস্কৃতির ধারক ভারতের বিপরীত আদর্শের প্রতীক। কাজেই তাদের রাজনৈতিক যাত্রা চরমপন্থায়।

দুই. সাধারণ মানুষ এসব বিভেদের ধার ধারে না, কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক রাজনীতি, স্বার্থপরতার রাজনীতি বিভেদ চেতনা জাগিয়ে তোলে, বিদ্বেষপ্রবণতার প্রকাশ ঘটায়। দুই সম্প্রদায়ের রাজনীতির একাংশেই এই চরিত্রের প্রকাশ। বাবরি মসজিদ নিয়ে তৈরি বিতর্ক সম্প্রীতি বিনাশের বড় একটি উদাহরণ। এর সূচনা ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি প্রতিষ্ঠিত অযোধ্যায় বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, নব্য হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির জাগরণের সময়ে। উগ্রধর্মীয় চেতনারও প্রকাশ এ সময় সমাজের একাংশের। এদেরই দাবি, অযোধ্যার ধর্মীয় অবতার রামচন্দ্রের জন্মভূমি এবং তার প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন মন্দির ধ্বংস করে বাবরের মসজিদ প্রতিষ্ঠা। কাজেই ধর্মরক্ষায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও এ মসজিদ, নতুন করে তৈরি করা হোক সেখানে রামমন্দির। এসব সেøাগানের প্রবক্তা বিশ^ হিন্দু পরিষদ, মহারাষ্ট্রের উগ্রধর্মবাদী শিবসেনা দল। পরে তাতে যোগ দেয় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

মূলত বিজেপির রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে ১৯৪৯ থেকে স্বাধীন ভারতে ১৯৯২-এর মধ্যে বাবরি মসজিদ বনাম রামমন্দির বিতর্ককে কেন্দ্র করে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সংঘাত। সংখ্যালঘু, দুর্বল মুসলমানদের পক্ষে শক্তিতে এঁটে উঠতে না পেরে মামলাÑ অর্থাৎ ফয়সালার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। কিন্তু আদালতের রায় অনেকাংশে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কারণে বাবরি মসজিদের অধিকার নিয়ে বিতর্কই শুধু নয়, বিবাদ-বিসম্বাদের অবসান ঘটে না। এমনকি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেও বিতর্কের অবসান ঘটানো যায় না। কোনো পক্ষই ঐকমত্যের পথ ধরে না। ফলে বিরোধ, বিতর্ক, বিবাদ থেকেই যায়।

ইতিমধ্যে ভোটের রাজনীতির কিছু ওলট-পালট। কংগ্রেসের ব্যর্থতায় উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। কল্যাণ সিং মুখ্যমন্ত্রী, যদিও কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসি নেতা নরসীমা রাও (১৯৯১)। উগ্রপন্থিরা এ সুযোগটি হাতছাড়া করেনি। এমনকি বিজেপির অন্যতম প্রধান নেতা লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে উগ্রপন্থিদের রামমন্দির প্রতিষ্ঠার চিন্তায় রথযাত্রা অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের উদ্দেশ্যে।

কংগ্রেস শাসকশ্রেণি সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি বিপজ্জনক বুঝেও রথযাত্রা বন্ধ করার চেষ্টা করেননি। হিন্দুত্ববাদীরা নির্বিঘে অযোধ্যায় পৌঁছে উন্মত্ত উল্লাসে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে। মসজিদের ছাদে উপস্থিত লালকৃষ্ণ আদভানি, উমাভারতী প্রমুখ বিজেপি নেতৃবৃন্দ। নরসীমা রাও এ ঘটনায় নীরব। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীও ঘটনার নীরব দর্শক। পরিণামে কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। দুই হাজারের বেশি নিরীহ মানুষের মৃত্যু।

তিন. পরবর্তী পর্যায়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নানা ঘটনায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের জমির অধিকার নিয়ে নতুন করে বিবাদ-বিরোধ, মামলা, আদালত, স্থিতাবস্থার আদেশের মধ্যেও উগ্রপন্থি হিন্দুদের সেখানে প্রবেশ ও রামমন্দিরের শিলান্যাস একপর্যায়ে। কংগ্রেস সরকার ভোটের চিন্তা মাথায় নিয়ে হিন্দু মানসের আবেগের দিকেই নজর রাখে। পিছু হটা ভারতীয় মুসলমান সর্বোচ্চ আদালতের মতামতের ওপর আস্থা রেখে মামলা লড়াতেই শেষ আশ্রয় বিবেচনা করে। শেষ পর্যন্ত সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের বহু প্রত্যাশিত রায় প্রকাশ। তাতে ওই জমির অধিকার হিন্দুদের পক্ষে যায়। তবে সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় মুসলমানদের পুরোপুরি বঞ্চিত করেনি। রায়ে বলা হয়, অযোধ্যায় অন্যত্র মুসলমানদের পাঁচ একর জমি দিতে হবে মসজিদ নির্মাণের জন্য। অন্যদিকে বাবরি মসজিদের স্থানটিতে রামমন্দির নির্মাণ করায় কোনো বাধা-নিষেধ নেই। এমনটাই ছিল সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মূল নির্দেশ।

রায়ের বয়ানে হাজার পৃষ্ঠায় যা বলা হয়েছে, তারও মূল ভিত্তি দুটি কথায়Ñ প্রথমত তাদের ভাষ্য হলো মুসলিমপক্ষ তাদের দাবি প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে। দ্বিতীয় কথা, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে বাবরি মসজিদের নিচে কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। অবশ্য কোর্টের বয়ানে স্বীকার করা হয়েছে যে, সেগুলো কোনো মন্দিরের ভগ্নাবশেষ নয়। তাহলে?

এবার আমাদের প্রশ্ন : সে ক্ষেত্রে এই জমির অধিকার রামমন্দিরবাদীদের তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে তুলে দেওয়া হলো কোন যুক্তিতে? এতে একটি বিষয় প্রমাণিত হচ্ছে যে, আইন হিন্দুত্ববাদী আবেগের কাছে পরাজিত। এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় বিবেচ্য, আধুনিক ইতিহাস-গবেষক কারও কারও মত, কোনো মন্দির ভেঙে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়নি। এ তথ্যটি কি মুসলিমপক্ষ আদালতে পেশ করতে পেরেছিল আবার সুপ্রিম কোর্টেরই এ প্রসঙ্গে আরেকটি মন্তব্য : বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার কাজটি বেআইনি। এ বিষয়ে পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবারও আমাদের প্রশ্ন : বাবরি মসজিদ ভাঙা যদি বেআইনিই হয়ে থাকে, তাহলে সেই বেআইনি কাজের দায়ে অপরাধীদের কোন যুক্তিতে পুরস্কৃত করা হলো, সেখানে তাদের রামমন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি মেনেই সুপ্রিম কোর্ট এখানেও এক যুক্তিহীন একদেশ দর্শিতার শিকার হয়েছে। সম্ভবত বিপুলসংখ্যক হিন্দু ভারতবাসীর আবেগ ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে তাদের এই রায়। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘিœত হতে পারে এমন বিপদের আশঙ্কা করে তাদের এই রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে

এ কথা সম্ভবত ঠিক, সুপ্রিম কোর্টের রায় মুসলমানদের পক্ষে গেলে পূর্বোক্ত উগ্রপন্থিরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সত্য অনস্বীকার্য, এ রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কথা শুধু ভারতীয় মুসলিম প্রতিনিধিদেরই নয়, অনেক নিরপেক্ষ যুক্তিবাদী হিন্দুরও। লেখাটা শেষ করি একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক উপ-সম্পাদকীয় লেখকের মন্তব্যে। ভারতীয় গবেষক, ইতিহাসবিদ গৌতম রায় লিখেছেন : ‘ভারতের সংবিধানের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ মৌলিক অধিকারের বিষয়টি আজ ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর রামমন্দির নির্মাণে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া সিলমোহরের পর কতখানি রক্ষিত হবে তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।’ এ রচনার শিরোনামটি বলাবাহুল্য তাৎপর্যপূর্ণ : ‘ভারতের বহুত্ববাদী ধারায় আরেকটি আঘাত’। প্রসঙ্গত, আমাদের শেষ কথা, ভারতের বহু প্রশংসিত বহুত্ববাদ ভারতেই ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের হাতে অনেক দিন থেকেই বিক্ষত, বিজেপি সেই কফিনে ক্রমাগত পেরেক ঠুকে চলেছে। খুব দেরি নেই তার মরণদশা ঘটার, সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও।লেখক

ভাষা সংগ্রামী ও রবীন্দ্র গবেষক