খুলনা নগরীর দৌলতপুরে সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজে শিক্ষক-সংকটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কলেজটির বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ১৪টি বিভাগের প্রতিটিতে পাঠদানের জন্য ১২ জন করে মোট ১৬৮ জন শিক্ষক থাকার কথা, সেখানে আছেন ১৩৫ জন। আর কলেজটিতে মোট ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন ১৭১ জন। শিক্ষক স্বল্পতায় সুষ্ঠুভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
বিএল কলেজ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ১৯০২ সালে ব্রজলাল শাস্ত্রী (চক্রবর্তী) নামের এক বিদ্যানুরাগী কলকাতার হিন্দু কলেজের আদলে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। একই বছরের ২৭ জুলাই পাঠদান শুরু হয়। ১৯০৭ সালে এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ব্রজলাল শাস্ত্রী ১৯৪৪ সালে মারা যাওয়ার পর কলেজের নামকরণ করা হয় ব্রজলাল হিন্দু একাডেমি। পরে একাডেমিকে কলেজে উত্তীর্ণ করা হয়, নাম দেওয়া হয় বিএল কলেজ। কলেজটি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত হয়। এটি সরকারীকরণ করা হয় ১৯৬৭ সালের ১ জুলাই। বর্তমানে এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। সরকারি বিএল কলেজে স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ২১টি ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পর্যায়ে ১৮টি বিষয়ে পড়ানো হয়ে থাকে। এ ছাড়া প্রাইভেট স্নাতক (পাস) ও স্নাতকোত্তর (প্রথম ও শেষ পর্ব) কোর্স চালু রয়েছে। ১৯৯৬ সাল থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে আবারও কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পাঠদান শুরু হয়েছে। এভাবে দিনে দিনে শিক্ষার্থী বেড়েছে, চালু হয়েছে নতুন নতুন বিভাগ; কিন্তু সেই তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। বিএল কলেজে বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি বড় বিভাগে (বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ম্যানেজমেন্ট, ইসলামের ইতিহাস, ইতিহাস, দর্শন, রসায়ন, পদার্থ, গণিত, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যা) ১২ জন করে শিক্ষকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণভাবে একজন অধ্যাপক, দুজন সহযোগী অধ্যাপক, নয়জন সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক রয়েছেন। ছোট বিভাগে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচ থেকে ছয়জন। এতে সুষ্ঠুভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
কলেজটির একাধিক শিক্ষক জানান, দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক একজন, যার অনুপাত প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। শিক্ষার্থীর চাপ থাকায় একেকটি বিভাগে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীও ভর্তি করা হয়। এত শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে জায়গা দেওয়া ভীষণ কষ্টকর হয়ে ওঠে। এতে প্রয়োজনীয় পাঠদান সম্ভব হয় না। বছরে যত দিন শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকার কথা, তত দিন ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। আবার সেশনজট কমানোর জন্য কোর্স শেষ করার একটা চাপ থাকে। এ অবস্থায় অনেক সময়ই যেনতেন করে কোর্স শেষ করা হয়। কখনো কখনো ছয় মাসে এক বছরের কোর্স শেষ করতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কলেজে প্রতিটি বিভাগে দুই শর বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। কোনো কোনো বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন শতাধিক। শুরুতে শিক্ষার্থীরা বেশ আগ্রহ নিয়েই ক্লাসে আসে। কিছুদিন না যেতেই বিরক্ত হয়। কারণ এত শিক্ষার্থীর একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা নেই।’
শিক্ষার্থী রোকসানা ইসলাম বলেন, ‘স্যাররা ক্লাসে এসে হাজিরা তুলেতে গিয়ে ক্লাসের সময়ের অর্ধেকটা শেষ হয়ে যায়। এরপর তারা কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করতে ঘণ্টা পড়ে যায়। বছর শেষে কোনো বইয়ের পাঠই সঠিকভাবে শেষ হয় না। ফলে পরীক্ষার সময় আমাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।’
বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শংকর কুমার মল্লিক বলেন, বড় বিভাগগুলোয় শিক্ষার্থী বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়নি। একাদশ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত একটি দীর্ঘ পাঠপর্যায়। একজন শিক্ষকের পক্ষে একে পর এক ক্লাসে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে পাঠ গ্রহণ করতে পারে না। শিক্ষকও সঠিকভাবে পাঠদান করতে পারেন না। ফলে শিক্ষার মান বজায় থাকে না।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর কে এম আলমগীর হোসেন বলেন, বড় বিভাগগুলোর জন্য ১৮ জন এবং ছোট বিভাগগুলোর জন্য ১২ জন করে শিক্ষক থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কলেজ কর্র্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন। আশা করছি, এটি দ্রুতই অনুমোদন পাবে।