মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। চিকিৎসার অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ ওষুধ। দুনিয়াজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের বাজারও তাই বিশাল। জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ পৃথিবীর নবম বৃহত্তম দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের ওষুধের বাজারও অনেক বড়। তার ওপর দেশের চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা খাত এখনো সামগ্রিকভাবে অনেক পিছিয়ে থাকায়, মানুষের ওষুধ নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এই অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের দুশ্চিন্তার বিষয়। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দেশে ওষুধের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এমন অন্তত ১০ রকমের ওষুধের দাম গত এক মাসে ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে দেশে উৎপাদিত রেনিটিডিন জাতীয় সব ধরনের ওষুধ নিষিদ্ধ হওয়ার পর কোম্পানিগুলো ‘অ্যান্টি আলসারেন্ট’ গোত্রের সব ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সুযোগ নিয়ে প্রতিদিন ঘরে ঘরে ব্যবহার হয় এমন কিছু সাধারণ ওষুধের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। ফলে রাজধানীসহ দেশজুড়েই বেশ ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম ফের বেড়েছে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজার ও খুচরা ওষুধের দোকানের সরেজমিন চিত্রের পাশাপাশি দাম বাড়ার বিষয়ে ওষুধ কোম্পানি, ওষুধ প্রশাসনসহ বিশ্লেষকদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানুষ প্রায় প্রতিদিনই ব্যবহার করে, এমন কিছু সাধারণ ওষুধের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাসিডিটি, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, ডায়রিয়া, শিশুদের ভিটামিন, অগ্নিদগ্ধ রোগীদের ব্যবহৃত মলম, কোলেস্টেরল, ব্যথানাশক, শিশুদের জ্বর ও ঠা-ার সিরাপ এবং শ্বাসকষ্ট লাঘবে ইনহেলার। এ ছাড়া রেনিটিডিন নিষিদ্ধ হওয়ায় অ্যাসিডিটির পিপিআই (প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর) গোত্রের ওমিপ্রাজল, র্যাবিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল, ল্যানসোপ্রাজল জাতীয় ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। বেশিরভাগ কোম্পানিই তাদের এসব ওষুধের দাম ট্যাবলেট-ক্যাপসুলপ্রতি ২ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অ্যাসিডিটির অ্যান্টি আলসারেন্ট ও উচ্চ রক্তচাপের হাইপার টেনসিভ জাতীয় ওষুধের দাম। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো দাম বৃদ্ধি সংবলিত নোটিস দিয়ে খুচরা দোকানিদের ওষুধের বাক্সে নতুন দামের সিল মেরে পুরনো দাম মুছে ফেলতে বলেছে। কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধিরা বলছেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসকদেরও বিষয়টি অবহিত করতে বলা হয়েছে। আকস্মিকভাবে অনেক ওষুধের দাম বাড়ার বিষয়ে শীর্ষ ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে ওষুধের কাঁচামালের দাম ও দেশে প্যাকেজিং খরচ বাড়লে সে অনুপাতে ওষুধের দাম সমন্বয় করা হয়। এবারও তাই হয়েছে। তবে সব ওষুধের দাম বাড়েনি।
কিন্তু ওষুধের দাম বৃদ্ধির পেছনে বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, চলতি বছরই ক্যানসারসহ কয়েকটি রোগের প্রতিষেধকের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহার কমানো হয়েছে। এরপরও বাজারে প্রতিটি কোম্পানির এসব ওষুধের দাম হঠাৎ বাড়ানো হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ওষুধের দাম গত এক বছরে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ ছাড়া, সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদেন থেকে দেখা গেছে, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাওয়া বেশিরভাগ ওষুধের দাম গত পাঁচ বছরে বেড়েছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যানসার প্রতিরোধক, ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই হাজারের বেশি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়েছে গত পাঁচ বছরে। এর মধ্যে কিছু কাঁচামালে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত করা হয়েছে এবং কিছু কাঁচামালে শুল্ক কমানো হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে এর চেয়ে কম হারে।
দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ২৬৯টি ওষুধ কোম্পানি এখন ২৪ হাজার ধরনের ওষুধ উৎপাদন করছে। এর বাইরে সরকারিভাবে উৎপাদিত হয় অত্যাবশ্যকীয় ও জীবনরক্ষাকারী ১১৭টি ওষুধ। কিন্তু ওষুধ প্রশাসন কেবল সরকারি ওষুধের দামই নির্ধারণ করে থাকে। বাকি সব ওষুধের দাম নির্ধারণ করে দেশি ওষুধ কোম্পানিগুলো। ১৯৯৪ সাল থেকেই এ নিয়ম চালু আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ওষুধের দাম নিয়ে সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণÑ দাম নির্ধারণে ওষুধ কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। মনে রাখা দরকার, এখনো দেশে চিকিৎসার জন্য মানুষকে মোট ব্যয়ের ৬৭ শতাংশই করতে হয় নিজের পকেট থেকে। তার ওপর এভাবে ওষুধের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না। ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে ওষুধ নীতিমালা বাস্তবায়ন ও দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে অত্যাবশ্যকীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সংখ্যা বর্তমান ১১৭টি থেকে আরও অনেক বেশি বাড়ানো জরুরি। তাহলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা আরও বাড়বে। এ ছাড়া, দাম নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার, কোম্পানি এবং স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ‘মূল্য নির্ধারণ কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে, যাতে কোম্পানিগুলোকে লাভজনক রেখেও অতিরিক্ত মুনাফার রাশ টানা যায়।