ভারতের আসামে গত ৩১ আগস্ট প্রকাশ করা হয় ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস অব ইন্ডিয়া বা এনআরসি। এই নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়ে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বারবার দাবি করে আসছেন, বাদ পড়াদের অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ করেছে। এ ঘটনার পর থেকে ভারতজুড়েই এনআরসি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কদিন ধরে বাংলাদেশের কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে জড়ো হওয়া কিছু সংখ্যক ভারতীয়কে ঘিরে একটি আশঙ্কা সংক্রমিত হয়েছে।
দেশ রূপান্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস অব ইন্ডিয়া বা এনআরসি আতঙ্কে ভারত থেকে বাংলাদেশের ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় দুই শতাধিকের বেশি নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বা বিজিবির হাতে আটক হয়েছে। ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়েই চলতি মাসের প্রথম ২২ দিনে অবৈধভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢোকার সময় বিজিবি সদস্যদের হাতে ধরা পড়েছে ২১৪ নারী-পুরুষ ও শিশু। এছাড়া গত ২০ নভেম্বর বেনাপোলের দৌলতপুর ও পুটখালী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় ৫৫ নারী, পুরুষ ও শিশুকে আটক করে বিজিবি। এর আগে গত অক্টোবর এবং নভেম্বরে বেনাপোল ও পুটখালী সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় ১১৫ জনকে আটক করে বিজিবি। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় গত পাঁচ দিনে ২২ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার সীমান্ত দিয়ে মাঝেমধ্যেই দুয়েকটি পরিবার দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে সীমান্ত পার হয়েছে।
২০১৬ সালে আসামের প্রাদেশিক নির্বাচনের প্রচারাভিযানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ থেকে ঢুকে পড়া হিন্দুদের তারা শরণার্থী হিসেবে রাখবেন; কিন্তু মুসলমানদের বের করে দেওয়া হবে। আসামের প্রায় সাড়ে তিন কোটি নাগরিককে এনআরসির জন্য কাগজপত্র জমা দিতে হয়। ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই প্রকাশিত খসড়া নাগরিক তালিকায় ৪০ লাখ নাগরিক যথাযথ প্রমাণপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এনআরসি থেকে বাদ পড়ে। বাদ পড়াদের আবার নাগরিকত্ব প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ৩১ আগস্ট এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়। তাতে বাদ পড়ার সংখ্যা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১৯ লাখে। বাদ পড়া ১৯ লাখের মধ্যে ১৭ লাখ বাংলাভাষী। দেড় লাখের বেশি গুর্খা উপজাতির। কমবেশি ছয় লাখ মুসলমান। সাড়ে ১১ লাখ হিন্দু। বলা হয়েছে, এ ১৯ লাখের জন্য আসামজুড়ে ৪০০ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। সেখানে তারা পুনরায় আপিল করতে পারবে। এরপর আপিলে যারা বাদ পড়বে তারা হাইকোর্ট, সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবে। এনআরসির মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভের জন্য ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে চূড়ান্ত সময়সীমা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ের পর কেউ আসামে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
এনআরসি প্রণয়নের পর ভারত সরকারের তরফ থেকে বারবার বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, এ তালিকা প্রণয়ন নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশও ভারতের আশ্বাসে সন্তুষ্ট হয়েছে। এনআরসিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় আখ্যায়িত করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাদ পড়া নাগরিকদের নিয়ে ভারতকেই একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দুই দফা সাক্ষাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এছাড়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রানিয়াম জয়শঙ্কর বাংলাদেশ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতেও বলেছেন, এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশের ভয়ের কোনো কারণ নেই। কিন্তু সীমান্তে দুই শতাধিক ভারতীয়ের উপস্থিতি অস্বস্তিকর।
জানা যাচ্ছে, এনআরসি থেকে ফায়দা লুটছে ভারত ও বাংলাদেশের একশ্রেণির দালাল চক্র। তারা এ তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষদের বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করছে। এ দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে তৎপর হতে হবে। গত বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সারা ভারতেই এনআরসি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, এটা নতুন করে সারা ভারতেই নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। এটি অব্যাহত রাখতে হবে। জড়ো হওয়া ভারতীয়দের সীমান্ত থেকে তাদের দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ^স্ত করবেÑএটাই প্রত্যাশা।