পেঁয়াজের চাহিদা কমেছে

সরবরাহ নেই বাজারে

দেশে বর্তমানে পেঁয়াজের চাহিদা মাসে ৬০ হাজার টনের মতো। আগে ছিল ২ লাখ টনের বেশি। মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভোক্তারা পেঁয়াজ কেনা কমিয়েছে। চাহিদা মেটাতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জুলাই-অক্টোবর পর্যন্ত ২ লাখ ২৬ হাজার ৪৬১ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। চলতি মাসে ১৮ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ এসেছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে। এরপর মিয়ানমার, চীন, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও মিসর থেকে বিভিন্ন পরিমাণে পেঁয়াজ দেশে এসেছে। ভোগ্যপণ্যের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের ১০ টন পেঁয়াজ আকাশপথে আগামীকাল সোমবার দেশে আসছে। আর এই গ্রপের আরও ২ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ জাহাজযোগে সিঙ্গাপুর সমুদ্রবন্দর থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছবে চার দিন পর। গত কয়েক দিন সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবিও ঢাকাসহ সারা দেশে পেঁয়াজ বিক্রি বাড়িয়েছে। তারপরও পেঁয়াজের দাম সহনীয় মাত্রায় আসছে না। বিভিন্ন জায়গায় যথেচ্ছ দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে গতকাল শনিবার যশোরের বেনাপোল ও পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতাদের অনেকে। খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, আড়তে পণ্য-সংকট। পাইকারিতে দাম বেশি, তাই লোকসানের কারণে দোকানে পেঁয়াজ আনা হয়নি।

আগামী ১০ দিনের মধ্যে পেঁয়াজের বাজার ‘সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে’ বলে আশা করছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। গতকাল রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ১০ দিনের মধ্যে দেশি পেঁয়াজ ওঠা শুরু হবে। তখন বাজার নিয়ন্ত্রণে আসা শুরু হবে। এছাড়া আশা করছি, ২৯ তারিখের মধ্যে কম করে হলেও ১২ হাজার টন পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে।’ পেঁয়াজের দাম ফের বাড়ার কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম কমে এলেও পরিবহন ধর্মঘটের কারণে আবার দাম কিছুটা বেড়েছে। পেঁয়াজের দাম ওইভাবে নিয়ন্ত্রণে আসছে না, শুক্রবার আবারও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। ওইদিন (শুক্রবার) উত্তরার বাজার থেকে আমি নিজে কিনেছি ১৪০ টাকা করে দেশি পেঁয়াজটা। এটা তো বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম। মন্ত্রী জানান, আগে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বরে প্রতি মাসে আমাদের এক লাখ টন করে আমদানি হতো। সেখানে সেপ্টেম্বরে এসেছে ২৫ হাজার টন, ৭৫ হাজার টন ঘাটতি থাকল। অক্টোবরে ২৪ হাজার টন এসেছে, সেখানেও ৭৬ হাজার টন ঘাটতি। এখন আমাদের পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে।

সিটি গ্রুপের পেঁয়াজ আমদানি নিয়ে গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, দেশে চলমান পেঁয়াজের সংকট ও উচ্চমূল্য রোধে সিটি গ্রুপ তুরস্ক থেকে

আকাশ ও সমুদ্রপথে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছে। গ্রুপটি প্রাথমিক পর্যায়ে ২ হাজার ৫২০ টন পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের আমদানি করা পেঁয়াজের প্রথম চালান ইতিমধ্যে টার্কিশ এয়ারলাইনসে গত শুক্রবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার পর ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দ্বিতীয় চালান আকাশপথে দেশে পৌঁছবে ২৫ নভেম্বর। এছাড়া তুরস্ক থেকে সমুদ্রপথে ২ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজের একটি চালান ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুর হয়ে দেশের পথে রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, অল্প সময়ের মধ্যে এগুলো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে পৌঁছবে। আমদানি করা পেঁয়াজ দ্রুত খালাস করে সরবরাহের যাবতীয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রুপটির উপদেষ্টা অমিতাভ চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি গ্রুপ ২ হাজার ৫২০ টন পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ১০ টন দেশে আসার পর টিসিবিকে দেওয়া হয়েছে। ২ হাজার ৫০০ টন নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে জাহাজ ছেড়েছে। দেশে আসতে সর্বোচ্চ চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে। আর সোমবার বিমানে ১০ টন পেঁয়াজ আসবে। আমদানি করা এসব পেঁয়াজ টিসিবিকে দেওয়া হবে।

আমাদের রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ঢাকা থেকে রাজশাহীতে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় পেঁয়াজ  পৌঁছানোয় পিছিয়ে গেল খোলাবাজারে বিক্রি। টিসিবি কর্মকর্তারা বলছেন, আজ রবিবার সকাল থেকেই শুরু হবে পেঁয়াজ বিক্রি। বাড়তি চাপ সামলাতে পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে। সেই সঙ্গে পুরো কার্যক্রম মনিটরিং করবেন ম্যাজিস্ট্রেট।

বেনাপোলে বাজারে পেঁয়াজ উধাও, সবজিতে আগুন : দেশ রূপান্তরের শার্শা (যশোর) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বেনাপোল ও শার্শায় বেশিরভাগ নিত্যপণ্য চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। গত দুদিন বেনাপোলে অধিকাংশ বাজারে পেঁয়াজ পাওয়া যায়নি। দুয়েকটি দোকানে পাওয়া গেলেও খুচরায় দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ২২০ টাকা। পাইকারিতে ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এদিকে কয়েক দিন ভারত থেকে চোরাইপথে কিছু পেঁয়াজ আসছিল তাও বিজিবি বন্ধ করে দিয়েছে।

 

দুমকিতে পেঁয়াজ উধাও : আমাদের দুমকি (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দুমকি উপজেলার পাইকারি ও খুচরা বাজারে পেঁয়াজ মিলছে না। গতকাল পিরতলা বাজার ও নুতন বাজারের কোনো দোকানেই পেঁয়াজ পাওয়া যায়নি। খুচরা দোকানিরা বলছেন, পাইকারিতে দাম বেশি। আর আড়তেও গতকাল পেঁয়াজ মেলেনি। শোনা যাচ্ছে সরকার দাম বেঁধে দিচ্ছে। তাই লোকসানের ভয়ে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মজুদদাররা জোট হয়ে পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

মেসার্স কাজী স্টোর্স নামে একটি দোকানের মালিক মো. মাহাবুব কাজী বলেন, পাইকারিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৬০ টাকা। বেশি দামের পেঁয়াজে লোকসানের ঝুঁকি রয়েছে, তাই মালের জন্য অর্ডার দেওয়া হয়নি। দোকানে যা ছিল তা গত তিন-চার দিনে বিক্রি হয়ে গেছে। পিরতলা বাজারের পাইকার অনীল চন্দ্র সাহা বলেন, পেঁয়াজের সরবরাহ নেই। রবিবার (আজ) চালান আসার কথা আছে। চালান এলে খুচরা বাজারেও পেঁয়াজ পাওয়া যাবে। কেউ গুদামজাত করেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের গুদামে নেই, অন্য গুদামে পেঁয়াজ আছে কি না বলতে পারব না।’