অসহায় ও দরিদ্র কারাবন্দিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য জার্মানি সংস্থা জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশনের (জিআইজেড) অনুদানে বড় প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় দেশের ৩৩ জেলায় অবস্থিত কারাবন্দিরা এই সুবিধা পাবেন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এই প্রকল্প অনুমোদন হলে কারা অধিদপ্তরের সেবা এবং কার্যক্রমগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। এতে কারাবন্দি কমে আসবে বলে মনে করছে কারা কতৃ©পক্ষ।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পনা কমিশনে ‘অ্যাকসেস টু জাস্টিস থ্রু প্রিজন অ্যান্ড জাস্টিস রিফর্মস’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে জেলখানায় বিচারাধীন বন্দিদের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় কারাবন্দিদের আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে নারী, শিশু ও সুবিধাবঞ্চিতদের দ্রুত মুক্ত করার কাজ করা হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে কারা অধিদপ্তরের সেবা ও কার্যক্রমগুলো যুগোপযোগী করে আরও গতিশীল করা হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১০৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেবে জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন (জিআইজেড)।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত যেসব কারাবন্দি অসহায়, কোনোভাবেই নিজের আইনি লড়াইয়ের খরচ বহন করতে পারেন না। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে উকিলসহ অন্যান্য আইনি ব্যয় বহন করা হবে। তিনি বলেন, এটি আগেও ছিল। কিন্তু এবার পরিধি আরও বাড়ানো হবে। এতে বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং জেলাবন্দির সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অসহায় কারাবন্দিসহ বিচারপ্রার্থীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষে¨ টেকসই অংশীদারত্ব স্থাপন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কারাগারকে সংশোধন করা হবে। প্রকল্পের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হচ্ছে– আইনি সহায়তা, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও কারা সংস্কারের লক্ষে¨ টেকসই অংশীদারত্ব স্থাপন করা, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সংস্কারের সমন্বয়ের মাধ্যমে মামলার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কারাবন্দিদের সংশোধন, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনর্বহাল এবং কারাগারে বন্দির সংখ্যাধিক্য ও মামলার জটবদ্ধতা হ্রাসে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে আইনি সংস্কারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) থেকে জানা গেছে, মামলার জটবদ্ধতা নিরসন ও দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষে¨ গঠিত ‘কেস কো-অর্ডিনেশন কমিটির’ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি মামলা ব্যবস্থাপনায় প্রকল্প ‘পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্সে’ প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রস্তাব করা হয়েছে। কারাবন্দিদের পুনর্বাসনের লক্ষে¨ সাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কারা অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে। অংশীদারত্বের ভিত্তিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সমাজ সেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কারাবন্দিদের পুনর্বাসন ও সমাজে পুনর্বহাল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
এই প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে প্যারালিগ্যাল কার্যক্রম ৩৩টি জেলায় অব্যাহত রাখা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, কেস কো-অর্ডিনেশন কমিটির কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, কারাবন্দিদের পুনর্বাসন ও সমাজে পুনর্বহালের লক্ষে¨ সাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, কারাবন্দিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ, সমাজে পুনর্বহাল, মাদকাসক্ত বন্দিদের চিকিৎসা, কারাবন্দিদের পরিবারকে সহায়তা বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া জেল আপিল প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার লক্ষে¨ ডিজিটাল সলিউশন তৈরি, কারা আইন ও কারাবিধি প্রণয়নে কারিগরি সহায়তা প্রদান, বিভিন্ন কার্যক্রমকে সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রচারের লক্ষে¨ যোগাযোগ কৌশলপত্র প্রণয়ন এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সফর করা হবে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের যুগ্ম প্রধান সেলিনা আক্তার বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পের ওপর সভা হয়েছে। সভায় ডিপিপিতে কিছু বিষয় সংযোজনীর কথা বলা হয়েছে। পুনর্গঠিত ডিপিপি আসলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের সুপারিশ করা হবে। একনেক সভায় অনুমোদন পেলে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২১ সালে বাস্তবায়ন করবে কারা অধিদপ্তর।