রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা মামলার রায় ঘোষণা হবে আগামীকাল বুধবার। দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও নারকীয় এ জঙ্গি হামলা মামলার রায় ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। দেশের মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও রয়েছে আলোচিত এ মামলার রায়ের দিকে নজর।
গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ কার্যালয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও
কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, এ রায় ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য পুলিশের ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কসহ সবাই সতর্ক রয়েছে। কেউ যাতে আসামিদের ছিনিয়ে নিতে না পারে সে জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন শুধু প্রত্যাশিত রায়ের অপেক্ষা।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে নিষিদ্ধঘোষিত জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবির একটি অংশ যারা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জনকে হত্যা করে। এ হামলায় আহত হন আরও ৩৬ জন। নারকীয় এ হামলার ঘটনায় দেশে-বিদেশে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো অভিযানে হামলাকারী ৫ জঙ্গিসহ ৬ জন নিহত হন। উদ্ধার করা হয় দেশি-বিদেশি জিম্মিদের।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা হামলা চালিয়েছে সিটিটিসির কাছে তারা নব্য জেএমবি হিসেবে পরিচিতি পায়। এ ঘটনায় ৪ জুলাই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় মামলা করেন উপপরিদর্শক (এসআই) রিপন কুমার দাস। পরে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিটিটিসি ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। তাদের মধ্যে রয়েছে ঘটনাস্থলে নিহত ৫ জঙ্গি ও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহত হয় আরও ৮ জন। জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয় ৮ জঙ্গিকে। মামলার সাক্ষী ছিলেন ২১১ জন।
রায় ঘিরে সক্রিয় গোয়েন্দারা : সিটিটিসিপ্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা মামলার রায় ঘিরে নাশকতা ঠেকাতে পুলিশের ‘ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক’ সক্রিয় আছে। এ হামলায় নব্য জেএমবির যারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল, যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছিল, তাদের ৫ জন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পাশাপাশি তাদের যারা নেতা এবং মূল পরিকল্পনাকারী তাদের বেশ কয়েকজন, অর্থাৎ ৮ জন বিভিন্ন সময় পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছে, কেউ আত্মহত্যা করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলায় ৮ জন আসামি রয়েছে। তাদের কেন্দ্র করে অর্থাৎ এই রায়কে কেন্দ্র করে বা তাদের ছাড়িয়ে নিতে কিংবা অন্য কোনো নাশকতা কর্মকাণ্ড যাতে না করতে পারে, সে জন্য আমাদের ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক অব্যাহত রেখেছি। জঙ্গিদের যে সেল রয়েছে তারা এবং সাইবার জগতে এরা অ্যাকটিভ রয়েছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় নব্য জেএমবির ৫ জন সেলের ৩ জন গ্রেপ্তার হলেও দুজন এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের কর্মকাণ্ড আমরা নজরদারিতে রেখেছি।’
এজাহারে হামলার বর্ণনা : মামলার বাদী এজাহারে বলেন, গত ১ জুলাই রাত অনুমান ৮টা ৪৫ মিনিটে বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে জানতে পারেন যে গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বেকারিতে গোলাগুলি হচ্ছে। তিনি সঙ্গীয় ফোর্সসহ রাত অনুমান ৮টা ৫০ মিনিটে রেস্টুরেন্টের কাছে গিয়ে দেখতে পান, রেস্টুরেন্টের ভেতরে কতিপয় সন্ত্রাসী ‘আল্লাহ্ আকবর’ ধ্বনি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করছে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর বোমা নিক্ষেপ ও এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আত্মরক্ষার্থে তারা পাল্টা গুলি চালান। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীদের নিক্ষিপ্ত গুলি ও গ্রেনেডের আঘাতে এসআই ফারুক হোসেন, কনস্টেবল প্রদীপ চন্দ্র দাস ও আলমগীর হোসেন মারাত্মক জখম হন। তাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি তাৎক্ষণিক ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করলে পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ডিএমপির সংশ্লিষ্ট সব অফিসার ও ফোর্স ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বেকারির চারপাশ কর্ডন করে ফেলেন। পুলিশ সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তারা অনবরত গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করতে থাকে। রাত অনুমান সাড়ে ১০টার দিকে সন্ত্রাসীরা হলি আর্টিজান বেকারির পশ্চিম দিকের ৭৯ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ির সামনে অবস্থানরত পুলিশ অফিসার ও ফোর্সদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় সেখানে অবস্থানরত ৩০-৩৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য আহত হন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত হন। আহতদের সবাইকে চিকিৎসার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত অনুমান ১১টা ২০ মিনিটে বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন খান মারা যান। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল করিম মারা যান। পুলিশের আইজিপি ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
তিনি আরও বলেন, পরে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তক্রমে ২ জুলাই সকাল অনুমান ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন জিম্মিদের উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে ৬ জন নিহত হয়। তারা হলো মীর সামহ মোবাশ্বের (১৯), রোহান ইমতিয়াজ (২০), নিরবাস ইসলাম (২০), খায়রুল ইসলাম পায়েল (২২), শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ (২৬) ও সাইফুল চৌকিদার। তারা দেশি-বিদেশি ১৩ জন জিম্মিকে জীবিতাবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুজন বিদেশিসহ ১৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। জিম্মি থাকাবস্থায় সন্ত্রাসী কর্র্তৃক নৃশংসভাবে নিহত হওয়া ৯ জন ইতালিয়ান, ৭ জন জাপানিজ, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি (১ জন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক) নাগরিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। জিম্মিকালে সন্ত্রাসীদের দ্বারা নিহত দেশি-বিদেশি ২০ জনের মৃতদেহ এবং ৬ সন্ত্রাসীর মৃতদেহ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকায় পাঠানো হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সিআইডি ক্রাইম সিন বিভাগের সহায়তায় গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস, এসআই মফিদুল ইসলাম, এসআই জয়নাল আবেদীন, এসআই হুমায়ুন কবির ঘটনাস্থল থেকে সন্ত্রাসী কর্র্তৃক ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্যাদিসহ অন্যান্য উপাদান ও ভিকটিমদের ব্যক্তিগত মালামাল সাক্ষীদের মোকাবিলায় জব্দ করে নিজ হেফাজতে নেন।
দুই বছরের তদন্ত : দীর্ঘ দুই বছরের তদন্তে এ ঘটনার সঙ্গে ২১ জনের জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে সিটিটিসির তদন্তকারী কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। চার্জশিট দেওয়ার সময় যাদের পলাতক দেখানো হয়েছিল পরে তারাও গ্রেপ্তার হয়।
৮ জন কারাগারে : এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ ওরফে শান্ত ওরফে টাইগার ওরফে আদিল ওরফে জাহিদ (৩২), মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান (৬০), রাফিউল ইসলাম ওরফে রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান (২২), আবদুস সবুর খান ওরফে হাসান ওরফে হাতকাটা সোহেল মাহফুজ ওরফে মুসাফির ওরফে জয় ওরফে নসুরুল্লাহ (৩৩), হাদিসুর রহমান সাগর, আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা ওরফে র্যাশ (২০), শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ (২৫) ও মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন (৩০)।
বিভিন্ন অভিযানে নিহতরা হলো : হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান ওরফে আবদুর রহমান, তানভীর কাদেরী ওরফে জামসেদ ওরফে আবদুল করিম, নুরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট, মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান (২০), মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে জাহিদ ওরফে মেজর মুরাদ ও রায়হান ওরফে রায়হানুল কবির ওরফে ফারুক ওরফে তারেক (২০)।