সেলিম মালিক, পাকিস্তানের সাবেক ব্যাটসম্যান, সাবেক অধিনায়ক। খেলেছেন ১০৩ টেস্ট, ২৮৩ ওয়ানডে, ২৬৯টি ফার্স্টক্লাস ক্রিকেট। ১৯৮২ সালে টেস্ট অভিষেকেই করেছিলেন সেঞ্চুরি। ছিলেন পাকিস্তানে বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য। এতসব সাফল্যের পরও সেলিম মালিককে সবাই চেনে ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে নিষিদ্ধ ক্রিকেটার হিসেবে। তিনি ছিলেন এই দুর্নামে জড়ানো প্রথম ক্রিকেটার। ২০০৮ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা আদালতের আদেশে উঠেগেলেও মালিককে আর ক্রিকেটে সেভাবে পাওয়া যায়নি। চলে গেছেন অন্তরালে। ৫৬ বছর বয়সী সেলিম সম্প্রতি কথা বলেছেন ভারতের
বাংলা দৈনিক ‘আনন্দবাজার’-এর সঙ্গে। সে সাক্ষাৎকার দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো
ক্রিকেট মহলে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে। পাকিস্তান বোলারদের জন্ম দেয়। আর ভারত ব্যাটসম্যানদের। জাসপ্রিত বুমরা, মোহাম্মদ শামি, ইশান্ত শর্মা, উমেশ যাদবরা কিন্তু এখন ধারণা বদলে দিয়েছেন। আপনার সময়ে বা আরও আগে শামিরা যদি দেশের হয়ে খেলতেন, তা হলে পাকিস্তানকে কি সহজেই হারিয়ে দিত ভারত?
মালিক : শামিকে এখন দেখে খুব ভালো লাগছে। রিভার্স সুইং বেশ ভালো করে। (হাসতে হাসতে) ওয়াসিম আকরাম আমাদের আসল অস্ত্র শিখিয়ে দিয়েছে শামিকে। রিভার্স সুইং তো আমাদেরই সম্পত্তি ছিল। শামি এখন রিভার্স সুইংয়ে পারদর্শী হয়ে উঠেছে। শামি-ইশান্তরা আমাদের সময়ে বা তারও আগে ভারতের হয়ে খেললে পাকিস্তানের কাজ কঠিন হয়ে যেত, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। তাই বলে আগে কি ভারতে কোনো বোলার ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল। কপিল দেবের মতো একজন বোলার ছিল। আরও কয়েকজন ভালো বোলার ছিল। কিন্তু ভারতের এখনকার বোলিং আক্রমণকে বেশ লাগছে। ক্রিকেটের প্রতিটি বিভাগে ভারত এখন উন্নতি করেছে। তার ফলও পাচ্ছে।
গোলাপি বলে ইডেন টেস্ট নিশ্চয় দেখেছেন? আপনার কি মনে হয় দিন-রাতের টেস্টই ভবিষ্যৎ?
সেলিম মালিক : দেখুন, ক্রিকেটে তো অনেক পরিবর্তনই হয়েছে। টি-টোয়েন্টি এসেছে। এখন টি-টেন ক্রিকেট হয়। গোলাপি বলে দিন-রাতের টেস্ট খেলা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, মাঠে দর্শক টানা। এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ভালো। পাকিস্তানও গোলাপি বলে খেলেছে। এক্সপেরিমেন্ট যদি ভালোর জন্য হয়, তা হলে অবশ্যই তা করা উচিত। ভারতে ক্রিকেট খুবই জনপ্রিয় খেলা। সমর্থকরা মাঠে আসেন। দিন-রাতের টেস্ট ম্যাচ দেখতে ইডেন ফুল হাউজ ছিল। এগুলো টেস্ট ক্রিকেটের জন্য ভালো লক্ষণ।
ওয়াসিম-ওয়াকার-শোয়েব আখতারের মতো পেসার উঠে আসছে না কেন? হঠাৎ কী হলো আপনাদের ক্রিকেটে?
সেলিম মালিক : যারা জীবনে কোনো দিন সাফল্য পায়নি, ক্রিকেটীয় বুদ্ধি নেই, তারা এখন আমাদের দেশে ক্রিকেট চালাচ্ছে। ঠিক লোকের হাতে না পড়ায় পাকিস্তান ক্রিকেট পিছিয়ে যাচ্ছে। আমার আশঙ্কা, আগামী কয়েক বছরে আরও পিছিয়ে পড়বে দেশের ক্রিকেট। ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিকাঠামো ভালো নয়। আপনাদের দেশে ঘরোয়া ক্রিকেটে ক’টা দল খেলে বলুন? পাকিস্তানে সেই সংখ্যাটা ক্রমশ কমছে। এখন দলের সংখ্যা মাত্র ৬। এই ছ’টা দল দিয়ে কী হবে বলতে পারেন? প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা সুযোগ পাবে কী করে? আমাদের ক্রিকেটে এত স্বজনপোষণ যে, প্রতিভাবান ক্রিকেটাররাই হারিয়ে যায়।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। নাসিম শাহের মতো ক্রিকেটার উঠে এসেছে। দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ক্রিকেট সম্পর্কে ভালো জ্ঞান যাদের রয়েছে, তাদেরই চেয়ারে বসাতে হবে। ‘দাদা’ (সৌরভ গাঙ্গুলি) এখন আপনাদের বোর্ড প্রেসিডেন্ট। দেখবেন আপনাদের ক্রিকেট আরও উন্নতি করবে।
সৌরভ গাঙ্গুলির ক্যাপ্টেন্সিতে আপনি তো ভারতকে দেখেছেন। অন্য অধিনায়কের সময়েও ভারতকে দেখেছেন। কার সময়ে ভারতকে বেশি আগ্রাসী দেখিয়েছে?
সেলিম মালিক : সৌরভ আমার খুব পছন্দের একজন ক্রিকেটার। সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিত। ওর সময়ে ভারতীয় দলকে বেশি আগ্রাসী দেখিয়েছে। বিদেশের মাঠে জেতার জন্য ভারতের খিদে বেড়ে গিয়েছিল সৌরভের ক্যাপ্টেন্সিতেই। আগে ভারতকে দেখে মনে হতো, চাপে রয়েছে। ‘দাদা’ আসার পরে ভারতীয় ক্রিকেটের ছবিটা সব অর্থেই বদলে যায়। সবার ভেতর থেকে ভয় ব্যাপারটা দূর করে দিতে পেরেছিল সে। এখানেই ওর সাফল্য।
আচ্ছা, টরোন্টোতে সৌরভের বলে আপনি বারবার আউট হতেন কেন?
সেলিম মালিক : আমি তো একবার মদনলালকে বলেছিলাম, তোমরা আর বোলার পেলে না! কাদের নিয়ে এখানে (টরোন্টো) খেলতে এসেছো? দেবাশিস মোহান্তি টরোন্টোর পিচে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ওকে দেখে মনে হয়েছিল, বিশ্বের সেরা বোলার। সৌরভের বল টরোন্টোতে খেলাই যায়নি। অথচ ‘দাদা’ তো সে রকম ভয়ংকর বোলার ছিল না। টরোন্টোর পিচ খুব খারাপ ছিল। একটা বল নেমে যায় তো একটা বল হঠাৎ করে লাফিয়ে ওঠে। ওই পিচে কি খেলা যায় নাকি? ঠিকঠাক পিচ তৈরি না করে ভারত আর পাকিস্তানকে লড়িয়ে দেওয়া হতো।
আপনি একটু আগে বললেন, পাকিস্তানের ক্রিকেটে সফল ক্রিকেটারদের আনা উচিত। ইমরান খান এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। উনিই তো দেশের ক্রিকেটের হাল ফেরাতে পারেন...
সেলিম মালিক : ক্রিকেটের দিকে দৃষ্টি দেওয়া ইমরান খানের পক্ষে এখন সম্ভবই নয়। অন্যান্য ইস্যু আগে সামলাক, তারপরে ক্রিকেট নিয়ে ভাবনাচিন্তা করবে।
বিশ্বকাপ এলেই পাকিস্তানের কী হয়? ভারতের কাছে প্রতিবার হারে কেন? ১৯৯২ সালে আপনারা চ্যাম্পিয়ন হলেন। সেবারও ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। ইংল্যান্ডে এবারও তাই হলো।
সেলিম মালিক : এর কারণ আমার জানা নেই। অনেক ভেবেছি, কিন্তু, উত্তর খুঁজে পাইনি। এখন শক্তির দিক থেকে দুর্বল হয়ে গিয়েছে পাকিস্তান। কিন্তু আমাদের সময়ে বিশ্বকাপে ভারতের কাছে হারের কারণ আমার মাথায় আসে না। শারজায় যেমন একসময়ে ভারত কেবল হারত পাকিস্তানের কাছে। বিশ্বকাপে তেমনই ভারতের কাছে হারে পাকিস্তান। দেশের ক্রিকেটারদের মজ্জায় হয়তো ঢুকে গিয়েছে, আর যাই হোক না কেন, বিশ্বকাপে ভারতকে হারানো সম্ভব নয়।
ক্রিকেট থেকে অনেক দূরে আপনি। কী করেন এখন?
সেলিম মালিক : ক্রিকেটের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নেই। আমি এখন ব্যবসা করি। কনস্ট্রাকশনের কাজের সঙ্গে যুক্ত।
মাঠে খেলা দেখতে যান? শ্রীলঙ্কা কয়েকদিন আগে তো পাকিস্তানে গিয়েছিল। দেখেননি খেলা?
সেলিম মালিক : টেলিভিশনে দেখেছি। মাঠে গিয়ে দেখা হয়নি। আসলে পাকিস্তানে সাবেক ক্রিকেটারদের কোনো সম্মান নেই। শ্রদ্ধা দেখিয়ে কেউ একটা টিকিটও দেয় না। ভারতে কিন্তু সাবেকদের সম্মান দেওয়া হয়, শ্রদ্ধা করা হয়।