জ্বলছে ইন্দোনেশিয়া

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যখন প্রকৃতিসৃষ্ট দাবানলের আগুন নেভাতে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে তখন ইন্দোনেশিয়া পুড়ছে মানুষের লাগানো আগুনে। সম্প্রতি সিএনএনে প্রকাশিত এক স্যাটেলাইট ছবিতে ইন্দোনেশিয়ার প্রায় সর্বত্র এই আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এই আগুনের প্রভাবে শুধু দেশটির জনগণই নয়, পার্শ্ববর্তী মালয়েশিয়া ও ব্রম্ননাই পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

সুপার মার্কেটের প্রায় অর্ধেক পণ্যের মূল কাঁচামাল পাম তেলের জোগান দিতে ইন্দোনেশিয়ার কৃষকরা তাদের কৃষিজমি পরিষ্কার করতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। প্রচলিত কৃষিকাজে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায়, তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ পাওয়া যায় পাম চাষে। তাই মাটি ও বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি হলেও কৃষকরা ক্ষতি করছেন প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশের।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় দ্বীপপুঞ্জের একটি বৃহৎ দ্বীপ বোর্নিও। ইন্দোনেশিয়ার কালিমানতান প্রদেশের মূল ভূখণ্ড এই বোর্নিও। এর পাশেই মালয়েশিয়ার সাবাহ ও সারাওয়াক রাজ্য। আরও আছে ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্র ব্রম্ননাই। চলতি বছর বোর্নিওর ৩ হাজার ৩১১ বর্গমাইল জঙ্গল এলাকা পুড়ে গেছে। গত আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে এই আগুন থেকে ৬২৬ মেগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়েছে বলে এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে ইউরোপিয়ান কমিশন ডাটা। গোটা অস্ট্রেলিয়ার বার্ষিক কার্বন নির্গমনের তুলনায় এই নির্গমনের পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবসৃষ্ট এই কার্বন নির্গমনের কারণে যে জলবায়ু বোমায় রূপ নিচ্ছে পৃথিবী, তাতে নিকট ভবিষ্যতে এক ক্ষতিকারক প্রভাব পোহাতে হবে মানুষকে। পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতারা যদি অবিলম্বে পাম তেলের আমদানি বন্ধ না করেন, তাহলে পরিণতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সাসটেইনেবল ট্রপিক্যাল পিটল্যান্ডের (সিআইএমটিআরওপি) নেতা ক্রিসইয়োইয়ো বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আমরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছি। আজ এখানে যাচ্ছি তো, কাল অন্য কোনো জায়গায়। আমার মনে হচ্ছে, মানুষই এই আগুন লাগাচ্ছে।’ প্রায় ৯ হাজার অগ্নিনির্বাপক কর্মী আগুন নেভানোতে ব্যস্ত এবারের গ্রীষ্মে। এছাড়া হেলিকপ্টার থেকে আগুন নেভানোর পাউডার ও পানি ফেলা হচ্ছে।

চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তোলা এক স্যাটেলাইট ছবিতে ইন্দোনেশিয়ার জলাভূমিগুলোর আগুনের ভয়াবহতা দেখা যায়। এসব বনাঞ্চলে সচরাচর আগুন লাগে না। এই বনাঞ্চলের ঘাসের চাপড়াগুলো অনেকটা স্পঞ্জের মতো। বর্ষাকালে ওই চাপড়াগুলো অতিরিক্ত পানি শোষণ করে, আর গ্রীষ্মে ওই পানি বনাঞ্চলকে ভেজা রাখে। ফলে প্রাকৃতিক উপায়ে আগুন লাগার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ এই ঘাসের চাপড়াতেই লাগানো আগুনে ইন্দোনেশিয়ার আকাশ কমলা হয়ে যায় গত সেপ্টেম্বরে।

পাম তেল বিভিন্ন দেশের মোট ২৬৪ মিলিয়ন মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পাম তেল বিক্রি করে। বিশ্বের বৈশ্বিক চাহিদার অর্ধেকের বেশি একাই জোগান দেয় দেশটি। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রান্নার তেল হিসেবে পাম তেলের ব্যবহার করা হয়। এছাড়া আইসক্রিম থেকে শুরু করে সাবান তৈরিতে পর্যন্ত লাগে এই তেল। আফ্রিকাতে পাম গাছের উৎস হলেও ঔপনিবেশিক আমলে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় এই গাছ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রবেশ করে।