ব্যাংকের সুদের হার কমানো বিষয়ে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠিত কমিটি সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। আগামী জানুয়ারি থেকে সেটা বাস্তবায়ন হবে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেশ রূপান্তরকে বলছেন, খেলাপিদের বাড়তি সুবিধা দিয়ে অর্থমন্ত্রী খারাপ কাজ করেছেন। তিনি খেলাপিদের উসকে দিয়েছেন। এজন্য এখন খেলাপি বাড়ছে। একই সঙ্গে নতুন করে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেটিও আমলানির্ভর। এটিও বাস্তবায়নযোগ্য নয়। নতুন কমিটির সুপারিশেও সুদহার কমবে না।
সাবেক ব্যাংকার ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ গতকাল রবিবার মোবাইল ফোনে বলেন, অর্থমন্ত্রী বারবার বলছেন বাংলাদেশে ব্যাংক সুদের হার বিশে^র সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সুদের হারও যে বিশে^র সবচেয়ে বেশি সেটা কেন বলছেন না। ইব্রাহিম খালেদ বলেন, খেলাপি ঋণ বেশি থাকলে সুদের হার বেশি হতে বাধ্য। সুদ হার কমাতে হলে অবশ্যই খেলাপি কমাতে হবে। এর বিকল্প নেই। এর বাইরে গিয়ে অন্য কোনো পদ্ধতিতে জোড়াজুড়ি করলে নিয়মকানুন ভঙ্গ হবে। সেটা অবশ্যই ব্যাংক খাতের জন্য ভালো হবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থনীতি হওয়া উচিত বাজারভিত্তিক। যেখানে চাহিদা ও সরবরাহভিত্তিক ব্যবস্থা চালু থাকবে। ব্যাংকারদের কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। খেলাপিদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর আগের বলা হয়েছিল, খেলাপিদের আরও সুযোগ দিলে খেলাপি বাড়বে। হচ্ছেও তাই। অর্থমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্ত খেলাপিদের উৎসাহিত করেছে। এটা করে তিনি খারাপ করেছেন।
বিশ^ ব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সুদের হার আগে কমিয়ে আনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাংকাররা অনেক সুযোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু আলোচিত সেই ৬ ও ৯ থিউরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। সেটা কেন করা হলো না, তা খুঁজে বের না করেই আরেকটি কমিটি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মানে আবারও একটি আমলাতান্ত্রিক নির্ভর সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করি। উদাহারণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা এক আগুন থেকে আরেক আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার মতো’– আগুন তো আগুনই, পুড়বেই। যেটা যেখানেরই হোক না কেন। তিনি বলেন, খেলাপিদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরে সরল সুদে ঋণ পরিশোধের যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেটা যে খেলাপি ঋণ উসকে দেবে, তা বারবার বলা হয়েছিল। এখন সেটাই হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উৎপাদনশীল খাতে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দেওয়া সিদ্ধান্তও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বর্তমানে শিল্প খাতে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ এই ঝুঁকিপূর্ণ খাতেই সবচেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যাংকাররা এটা করবেন বলে মনে হয় না। কেননা সরকারি ট্রেজারি ও সঞ্চয়পত্রে এখনো বেশি সুদ। ব্যাংকাররা সেখানে বিনিয়োগ করলে কোনো ঝুঁকিও নেই। তাহলে কেন তারা ঝুঁকি নিয়ে কম সুদে বিনিয়োগ করবেন।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে ব্যাংকারদের বেশি চাপাচাপি করলে তারা হয়তো আর ঋণই দেবে না। কেননা ঋণ না দিলে তো কোনো কিছু করতে পারবে না। আইনেও কোনো বাধা নেই। এজন্য ব্যাংক আইন শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। খেলাপি কমাতে না পারলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও কমানো সম্ভব নয়।