এইডসে আক্রান্ত ১০৫ রোহিঙ্গা

দেশে বর্তমানে এইডস আক্রান্ত রোগী ১৪ হাজার। চলতি বছর শনাক্ত হয়েছেন ৯১৯ জন, এর মধ্যে বিবাহিত ৫৫৭, রোহিঙ্গা ১০৫ জন, আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছেন ১৭০ জন। গতকাল রবিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এইডস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, ২৫-৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এইডস আক্রান্তের হার বেশি। নতুন আক্রান্তদের ৬০৫ জন বা ৭৪.৪২ শতাংশ এই বয়সী। চলতি বছর চট্টগ্রামে ৭১ জনের রক্তে এইচআইভির ভাইরাসের নমুনা শনাক্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগ বিদেশ ফেরত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। সিলেট ও কক্সবাজারেও এইডস আক্রান্ত রোগী বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে গতকাল এইডস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে ডা. শামিউল ইসলাম জানান, ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত দেশে এইডস আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৭৪ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১ হাজার ৩৪২ জন। চলতি বছরে দেশে ২৭ হাজার ১৬৮ জনের এইডস টেস্টিং ও ৪১ হাজার ৩০৯ জনকে স্ক্রিনিং করা হয়েছে। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ পুরুষ, ২৫ শতাংশ নারী ও ১ শতাংশ ট্রান্সজেন্ডার। ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এইডস আক্রান্তের হার বেশি। নতুন আক্রান্তদের ৬০৫ জন অর্থাৎ ৭৪.৪২ শতাংশ এই বয়সী।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি এইডস রোগী রয়েছেন। সে তুলনায় বাংলাদেশে এইডস রোগীর হার দশমিক শূন্য এক শতাংশ। ওষুধ দেওয়ার যে কাভারেজ, তাতেও বাংলাদেশ এগিয়ে। বিশ্বে ৫০ ভাগ ওষুধের কাভারেজ রয়েছে। আর আমাদের দেশে তা ৬১ ভাগ। তবে আমরা এতে সন্তুষ্ট না, আরও বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের এইডস আক্রান্তের হার আমাদের তুলনায় বেশি। আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের চ্যালেঞ্জ এইচআইভি ডিটেকশন রেট বাড়ানো। এখন সেটি ৫২% রয়েছে। আমাদের তা শতভাগ করতে হবে।

চট্টগ্রামে এইডস রোগী ৪২১ জন : চট্টগ্রামে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ল্যাবে পরীক্ষায় ৭১ জনের রক্তে এইচআইভি ভাইরাসের নমুনা শনাক্ত হয়েছে। এদের বেশিরভাগ বিদেশ ফেরত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।

চমেকের অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) বিভাগের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে বর্তমানে তালিকাভুক্ত এইডস রোগী ৪২১ জন। এর মধ্যে ২০১৯ সালে শনাক্ত ৭১ জন, এর মধ্যে পুরুষ ৪৪, নারী ১৮ ও শিশু ৯ জন। আক্রান্ত রোগীর মধ্যে নিয়মিত সেবা নেন ৩২৬ জন। এ ছাড়া এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর মারা গেছে ১০ জন।

এর আগে ২০১৮ সালে শনাক্ত হওয়া রোগীর মধ্যে ২৪ পুরুষ, ১৯ নারী ও দুজন হিজড়া ছিলেন। এর মধ্যে চারজন মারা গেছেন। ২০১৭ সালে শনাক্ত রোগীর মধ্যে ছিল পুরুষ ১৯, নারী ১০ ও হিজড়া ১। ওই বছর তিনজন মারা যান।

এ বিষয়ে চমেক হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের মেডিকেল অফিসার ও এআরটি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. সঞ্জয় প্রসাদ দাশ বলেন, এইডস আক্রান্ত ৩২৬ জন রোগী দুই মাস অন্তর চিকিৎসাসেবা নেয়। এদের মধ্যে বিদেশ ফেরত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সংখ্যা বেশি। তবে জনবল সংকটে এইচআইভি বহনকারী রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের এখানে এক সময় এইডস রোগীর চিকিৎসা চলাকালে রোগের মাত্রা জানার জন্য সিডি-ফোর সেল কাউন্টিং মেশিন ছিল। যদিও বর্তমানে সিডি-৪ এর প্রয়োজন খুব একটা প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে এইডস রোগীদের সরকার কর্তৃক ওষুধ দেওয়ার ফলে মেশিনটির ওপর নির্ভরতা কমেছে।

চমেক হাসপাতালে প্রিভেনশন ইন মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশনের (পিএমটিসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রোগ্রাম অফিসার আলী হোসেন বলেন, ২০১৩ সাল থেকে ৭৪ হাজার ১০৪ জন গর্ভবতী নারীর এইচআইভি পরীক্ষা করিয়েছে এই কর্নার থেকে। ২০১৯ সালে পজেটিভ ১৯ জন নারী। এ ছাড়া ২০১৩ সাল থেকে কাউন্সিলিং সেবা নিয়েছে ৭৫ হাজার ২৮৭ জন গর্ভবতী নারী। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় হওয়া এ রোগে আক্রান্তের হার বেশি। এর মধ্যে নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, সাতকানিয়ায় এর সংখ্যা উল্লেখ্যযোগ্য।

কক্সবাজারে এইডস রোগী ৫৫৩ জন : কক্সবাজারে ৫৫৩ জন এইডস রোগী শনাক্ত হয়েছে, এর মধ্যে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে জেলার সদর হাসপাতালে ৩২৫ জন, উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাসপাতালে ১২২ জন ও ইউনিসেফের অর্থায়নে প্রিভেনশন অব মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন অব এইচআইভিতে (পিএমটিসিটি) ১০৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। ২০১৮ সালে এইডস রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৫৫ জন।

জেলার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, ‘মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসার পর থেকে এইডস রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। বিশেষভাবে স্ক্যান করার মাধ্যমে এইচআইভি পরীক্ষা করা হলে এই রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে। এ কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীতে এই রোগের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে’। জেলা হাসপাতালের এইচআইভি ট্রিটমেন্ট সেন্টারের তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের শুধু নভেম্বর মাসে ১৯ জন এইডস রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ জন বাংলাদেশি ও ১৮ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। এই পর্যন্ত সব মিলিয়ে সদর হাসপাতালে ৩২৫ জন ও উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে ১২২ জন এইডস রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। এসব রোগীর মধ্যে বেশিরভাগ নারী।’

পিএমটিসিটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. নুর মোহাম্মদ জানান, ‘রোহিঙ্গা আগমনের পর থেকে এই পর্যন্ত ১০৬ জন এইডস আক্রান্ত গর্ভবতী মাকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। গত এক মাসে ২৯ জন গর্ভবতী মার শরীরে এইচআইভি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নারী ও ৩ জন বাংলাদেশি নারী। মা হতে শিশু এইচআইভি সংক্রমণ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ইউনিসেফ এসব এইডস আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের এখনো চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছে।’

সিলেট বিভাগে এইডস রোগী ৯৫১ জন : সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত এইডস আক্রান্তের সংখ্যা ৯৫১ জন শনাক্ত হয়েছে, এর মধ্যে মারা গেছেন ৩৯৪ জন। এইডস আক্রান্ত ৫০১ জন বর্তমানে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের অধীনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সম্পূর্ণ সরকারি খরচে তাদের চিকিৎসা চলছে। এ ছাড়া এইচআইভি আক্রান্ত মা থেকে শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধে ইউনিসেফের সহায়তায় এই দুটি হাসপাতালে পিএমটিসিটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে এইডস আক্রান্ত ৫৬ জন মা সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তাদের সন্তানদের শরীরে এই মারণব্যাধি সংক্রমিত হয়নি। বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে গতকাল ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আয়োজিত আলোচনা সভায় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইউনুছুর রহমান এ তথ্য জানান।