নারী শ্রমিকের কদর বাড়লেও বাড়েনি মজুরি

একই জমিতে পুরুষের পাশাপাশি আমন ধান কাটার কাজ করছেন আদিবাসী নারী সানজিলি হাজদা (২৬)। দিনের শুরুটা হয় একসাথে একই ধরনের কাজে আবার শেষও হয় সবারই একসঙ্গে। কিন্তু মজুরি নিতে গেলে পুরুষ শ্রমিক মোতালেব হোসেনের চেয়ে দেড়’শ টাকা কম পান সানজিলি হাজদা।

একই কাজে ভিন্ন মজুরি পেয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন এই আদিবাসী নারী। শুধু সানজিলি হাজদাই নয় বরং একই দলে কাজ করেন বিনা রানী, ছবিতা রানীসহ আরও বেশ কয়েকজন হিন্দু ও আদিবাসী নারীরা। সবার একটাই অভিযোগ, সারাদিন মাঠে পুরুষের সমান কাজ করেও দিনশেষে মজুরি নিতে গেলে পুরুষের সমান মজুরি তারা পান না।

সরেজমিনে দেখা যায়, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আরজি গলাহার এলাকায় ৭ জন নারী শ্রমিক ও একজন পুরুষ শ্রমিক আমন ধান কাটার কাজ করছেন। পাশের আরেকটি জমিতে ১০ জন পুরুষের আরেকটি শ্রমিক দল আমন ধান কাটার কাজে ব্যস্ত। কিন্তু সারা দিনে নারী শ্রমিকরা একই কাজ করে মজুরি হিসেবে পাচ্ছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। আবার একই কাজে পুরুষ শ্রমিকরা পাচ্ছেন ৩৫০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা।

দিন দিন পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকদের কদর বাড়লেও বাড়েনি তাদের মজুরি কাঠামো। সস্তা শ্রম আর হাতের কাছেই নারী শ্রমিকদের প্রতুলতা মালিক শ্রেণিকে আকৃষ্ট করতে পারলেও মজুরি কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না।

ধান কাটতে কাটতে আদিবাসী নারী সানজিলি হাজদা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যে পরিমাণ জমির ধান কাটতে পারি ঠিক একই পরিমাণ জমির ধান পুরুষরা কাটে। কিন্তু আমাদের দিনশেষে দেড় থেকে ২০০ টাকা এবং পুরুষদের সাড়ে ৩০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা পরে। আমরা জমির মালিককে কিছু বলতেও পারি না। কারণ কাজ না করলে খাব কী!’

একই অভিযোগ করেন বিনা রানী। তিনি বলেন, ‘নারী শ্রমিক দিয়ে মালিক পক্ষ বেশি কাজ করাতে পারে। অনেক সময় আমাদেরকে এক বিঘা জমির পরিবর্তে মালিক শ্রেণি সেই জমি ১৫ কাঠা বলে চালিয়ে দেয়। আমরা উপায় না পেয়েই কাজ করতে বাধ্য হই।’

অন্য একটি জমিতে আমন ধান কাটার কাজ করছেন মো. মোতালেব হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সারাদিনে যে পরিমাণ ধান কাটি তাতে সাড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা হাজিরা না পড়লে পোষায় না।’

দিনাজপুর জেলার কম বেশি সব উপজেলায় নারী শ্রমিকদের মাঠে কাজ করতে দেখা যায়। চলতি আমন মৌসুমে জেলার বীরগঞ্জ, সদর, পার্বতীপুর, চিরিরবন্দর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আমন ধান লাগানো হয়েছে। এবার দিনাজপুর জেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমি। অপরদিকে আমন মৌসুমে ধানের অর্জন ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩ হেক্টর জমি।

তবে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্যের বিষয়ে মালিক শ্রেণি বেশি লাভবান। অল্প টাকায় শ্রম পাওয়াতে অনেক মালিকই খুশি।

চিরিরবন্দরের গলাহার এলাকায় ৫ বিঘা জমিতে আমন ধান লাগিয়েছেন মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘গত দু’বছর ধরে আমি নারী শ্রমিক দিয়ে জমির ধান কাটিয়েছি। পুরুষের তুলনায় নারীদের কম টাকায় কাজ করানো যায়। আবার একই কাজ পুরুষ শ্রমিকদের দাড়ায় করাতে গেলে বেশি খরচ পড়ে।’

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপপরিচালক মো. তৌহিদুল ইকবাল বলেন, ‘বর্তমানে দিনাজপুরসহ অনেক জায়গায় নারী শ্রমিকদের কদর বেড়েছে। তবে যে পরিমান কদর বেড়েছে সেই পরিমান তাদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে না। এটা মালিকপক্ষ না চাইলে সম্ভব না। মালিকপক্ষকে নারীদের প্রতি আরও সদয় হতে হবে।’