আত্মসমর্পণই পাকিস্তানিদের পালাবার পথ

এই ডিসেম্বর উনিশশত একাত্তরের। এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ হয়ে আবির্ভূত হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনাধীন পাকিস্তান এই সত্য বিশ্বাস করুক বা না করুক, তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্ট গোপনীয় চিঠি চালাচালিতে স্পষ্টই জেনে গেছে পাকিস্তানের খণ্ডীকরণ ঠেকানোর আর কোনো উপায় নেই। অধিকতর দূরদর্শী কয়েকটি গণমাধ্যম একাত্তরের মার্চের শেষ সপ্তাহেই লিখেছে : লাশের পাহাড়ের নিচে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি সমাহিত। একাত্তরের ডিসেম্বরের ঘটনা প্রবাহের একটি অনূদিত কোলাজচিত্র সৃষ্টি করেছেন আন্দালিব রাশদী। ধারাবাহিক এই লেখাটির আজ থাকছে তৃতীয় ও শেষ পর্ব

টু দ্য গভর্নর অব ইস্ট পাকিস্তান

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান তার বার্তাটি গভর্নরকে দিয়ে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজিকেও অবহিত রাখলেন :

১৪ ডিসেম্বর সেনাবাহিনীর বার্তামাধ্যমে পাঠানো বার্তাটি নিম্নরূপ-

বহু প্রতিকূলতার মধ্যে আপনারা একটি বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করেছেন। জাতি আপনাদের নিয়ে গর্বিত এবং পৃথিবীও আপনাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এই সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার জন্য মানুষের পক্ষে সর্বোচ্চ যা সম্ভব আমি তা-ই করেছি। আপনারা এখন এমন একটি পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেছেন, এখান থেকে অধিকতর প্রতিরোধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া এতে কোনো কার্যসিদ্ধিও ঘটবে না। এতে আরও অনেক জীনবহানি ঘটবে এবং ধ্বংসযজ্ঞ বাড়বে।

এখন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ আপনার নেওয়া দরকার, যাতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিকদের এবং স্থানীয় অনুগত নাগরিকদের জীবন রক্ষা পায়। ইতিমধ্যে আমি জাতিসংঘের কাছে আরজি রেখেছি, তারা যেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ভারতের বৈরিতা অবিলম্বে বন্ধ করে এবং সেনাবাহিনী এবং অপর যেসব নাগরিক দুষ্কৃতকারীর শিকারের টার্গেট হবে, তাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি যেন প্রদান করে।

আমেরিকার ডিসেম্বর ব্লাফ

পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব হাসান জহিরের লেখা থেকে উদ্ধৃত :

ভুট্টোর সঙ্গে সাক্ষাতের পর কিসিঞ্জার ওয়াশিংটন ফিরে এলেন এবং ওয়াশিংটনের সোভিয়েত দূতাবাসের ভোরোনতসোভকে জানালেন, ১০ ডিসেম্বরের প্রস্তাবে (অস্ত্রবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহার) ১২ ডিসেম্বর মধ্যাহ্নের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সাড়া না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তার ইচ্ছামতো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ভোরোনতসোভ তাকে বললেন যে, ভারতকে নিরস্ত করতে তাদের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী নয়াদিল্লি গিয়েছেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে আসলে কী পরামর্শ দেবে, এ নিয়ে কিসিঞ্জার নিশ্চিত হতে পারেননি। ভারত সরকার জাতিসংঘকে বলে আসছে, পাকিস্তানের জায়গা দখল করে রাষ্ট্রীয় সীমানা বৃদ্ধির আকাক্সক্ষা তাদের নেই। তবে আজাদ কাশ্মীর যে পাকিস্তানের অংশ এ স্বীকৃতিও তারা দেয়নি। কিসিঞ্জার আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন, আজাদ কাশ্মীর দখলে নেওয়ার সম্ভাবনা তারা খোলা রাখছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধ্বংস করে দেশটিকে খণ্ডীকরণের অভিপ্রায় সামনে রেখে।

১২ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৩০ মিনিটে নিক্সন হটলাইনে মস্কোতে বার্তা পাঠালেন, পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাপারে ভারতের আশ্বাসে সুনির্দিষ্টতার অভাব রয়েছে; রাশিয়ার সাড়া পেতে ব্যর্থ হয়ে বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করেছে, তারা এখনো অস্ত্রবিরতি ও সমঝোতা বৈঠকের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এক ধরনের অবগুণ্ঠিত সতর্কবার্তা দিয়ে নিক্সন মস্কোকে বলেছেন, ‘যে পরিণতি আমরা এড়াতে চাই, তার সময়ই মূল নিয়ামক।’ রুশ সাড়ার জন্য সপ্তম নৌবহরে এগিয়ে যাওয়ার আদেশ ২৪ ঘণ্টার জন্য স্থগিত রাখা হয়। ১৩ ডিসেম্বর ভোরে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি অস্পষ্ট জবাবে জানায়, এ নিয়ে তারা ভারতের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং ফলাফল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেবে। ততক্ষণে চীন কিসিঞ্জারকে জানিয়ে দেয়, নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে প্রদত্ত মার্কিন প্রস্তাবে তারা সম্মত অস্ত্রবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহার হবেÑ তবে শেষ পর্যন্ত সম্মতি যেখানে দাঁড়াল, তা হচ্ছে যে, যেখানে যে অবস্থায় আছে সেখানেই যুদ্ধবিরতি। যুদ্ধবিরতির জন্য পাকিস্তান কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য কতটা বিপদ ঘনিয়ে এসেছে, চীন তা বুঝতে পেরেছে এবং বরাবরের মতো গা না লাগানোর নীতি রেখেছে।

১২ ডিসেম্বর ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাদের মতামত মহাসচিবকে জানিয়ে দিয়েছে :

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা যদি বাংলাদেশ থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী অস্ত্রবিরতি দিয়ে নিজ ভূখ-ে ফিরে আসবে। কিছুদিন আগেও যারা তাদের সহ-নাগরিক ছিলেন, ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী উপযুক্ত গণপ্রতিনিধিত্বে যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছেন, তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছাতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ১২ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের (১৬১১তম) অধিবেশন বসে। অধিবেশনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, যেকোনো ধরনের অস্ত্রবিরতির সাফল্যের জন্য এখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধির উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি দীর্ঘ এক বক্তব্যে যুদ্ধের জন্য ভারতকে দায়ী করেন এবং একটি খসড়া প্রস্তাব পেশ করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের অনুরূপ এই প্রস্তাবটিতেও অস্ত্রবিরতি ও সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাব পাস হওয়া দেরি করিয়ে দিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধি পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন করলেন এবং বললেন, বৈঠকটি দুই পক্ষের বক্তব্য এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধির মধ্যে সীমিত থাকা উচিত। ভারতীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির বক্তব্যের ওপর জুলফিকার আলী ভুট্টো, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভাষণ দিলেন।

তারপর নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন সভাপতি বৈঠকের মুলতবি ঘোষণা করলেন, যাতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ সরকারের নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি ভেটো দিতে চাপ দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন আপত্তি জানায় এবং বলে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবে ভেটো প্রয়োগে বাধ্য করতে যাচ্ছে। বৈঠক পরদিন পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়।

ভারতকে অস্ত্রবিরতি মেনে নিতে সম্মত করাতে কিসিঞ্জার সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। বহুল প্রচারিত ও দৃশ্যমান চাপটি ছিল আমেরিকান টাস্কফোর্স বঙ্গোপসাগরে মোতায়েন। কিসিঞ্জার একে একটি ভাঁওতা হিসেবে যৌক্তিকীকরণ করেছেন- পাকিস্তানের জন্য চূড়ান্ত কোনো কিছুরই প্রতিশ্রুতি দেননি, নয়াদিল্লি ও মস্কোকে চাপে ফেলে সিদ্ধান্ত নেওয়াতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছেন। কোনো কারণ ছাড়া সুপার পাওয়ারের মুখোমুখি করার পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বিরোধীরা কিসিঞ্জারের সমালোচনা করছেন। ভ্যান হোলেন বলেছেন যে, টাস্কফোর্স-৭৪ ১৫ ডিসেম্বরের আগে বঙ্গোপসাগরেই পৌঁছেনি, তার কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক বা রাজনৈতিক প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার ঘটনাপ্রবাহের ওপর পড়েনি।

টাইগার নিয়াজি কাঁদো কাঁদো

পূর্ব পাকিস্তানে (পাকিস্তান সেনাবাহিনীর) কমান্ডার জেনারেল ‘টাইগার’ নিয়াজি যিনি ‘শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন’ বলে অহংকার করেছিলেন, ঢাকা রেসকোর্সে পাতা টেবিলে আত্মসমর্পণ দলিল স্বাক্ষর করার পর তাকে দেখা গেল কাঁদো কাঁদো।

তিনি তার ডান কাঁধ থেকে র‌্যাংক ব্যাজ খুলে নিয়েছেন, রিভলবার গুলিশূন্য করে তা ভারতীয় বাহিনীর পাগড়িপরা শিখ নেতা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার হাতে তুলে দিলেন। আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে তিনি ভারতীয় জেনারেলের কপালে নিজের কপাল ঠেকালেন।

উৎফুল্ল জনতার জিন্দাবাদ ধ্বনির মধ্যে সৈন্যরা জেনারেল অরোরাকে মাথায় তুলে নিল। বিজয়ী ভারতীয় সৈন্যরা যখন শহরে প্রবেশ করছে, অবরুদ্ধ রাজধানী মহানন্দে বিস্ফোরিত হতে চলেছে। জয় বাংলা ধ্বনি, গুলির শব্দ এবং হাজার হাজার বাঙালির হাততালি সুগঠিত দেহের শিখ ছত্রীসেনাদের অভিনন্দন জানাচ্ছে।

প্রথমদিকে যেসব জিপ শহরে প্রবেশ করেছে, বাঙালি জনতা তাদের ঘিরে ধরেছে, আলিঙ্গন করেছে, চুমো খেয়েছে এবং তাদের ওপর গাঁদাফুল ও কাঠগোলাপের মালা ছুড়ে দিয়েছে।

দ্বিতীয় প্যারাট্রুপার রেজিমেন্টের কমান্ডার কর্নেল পান্নু বললেন, তিনি জেনারেল নিয়াজিকে প্রাণবন্ত অবস্থায়ই দেখেছেন, আমরা এক সৈন্য অপর সৈন্যের সঙ্গে গপ্প করেছি, নোংরা কৌতুক বিনিময় করেছি। কর্নেলের জিপের ঠিক পাশের সিটেই তখনো লেগে থাকা রক্ত শুকোয়নি, হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনে জনতা ঘেরাও করে ফেলে।

বাংলাদেশে সবুজ-লাল পতাকা বাড়ির ওপর, গাড়ির ওপর উড়তে শুরু করেছে। বাঙালিরা বন্দুকের নলের ভেতর ফুল ঢুকিয়ে চিৎকার করে উঠছে ‘জয় বাংলা’।

ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর বুনো আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তখন হঠাৎ মনে হলো, দেশের সব রাস্তা রাজধানীমুখী হয়ে পড়েছে। একটি পাকিস্তানি ট্যাংক স্কোয়াড্রন সরে পড়েছে। নিক্ষিপ্তভাবে তাকে অনুসরণ করেছে ট্রাক, স্কুটার ও রিকশা।

৫৭ ডিভিশনের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ডি এন মিশ্র উত্তর-পূর্ব দিক থেকে যখন প্রথম ঢাকায় প্রবেশ করলেন, তখন জনতা আনন্দে তার দিকে এগিয়ে যায় আর সে সময় একটি জিপ থেকে এক পাকিস্তানি মেশিনগানের গুলি চালায়।

ওই পাকিস্তানি সৈন্যকে নিরস্ত্র করে কোর্ট মার্শালের জন্য পাঠানোর আগে দুটি প্রাণ ঝরে পড়ে। ব্রিগেডিয়ার মিশ্র বললেন, ‘আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছি না।’

ভারতীয় সৈন্য দল যখন শহরের দিকে এগোচ্ছে, তারা বিষণœ ও আতঙ্কিত পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছ থেকে সব যানবাহন নিয়ে নিচ্ছে। মিনিবাস থেকে লাফিয়ে নেমে এমন একটি গাড়িতে উঠে একজন কর্নেল বললেন, এটা ব্যবহারের জন্য বেশ উপযোগী।

বিধ্বস্ত (তেজগাঁও) এয়ারপোর্টে আগত ভারতীয় ভিআইপিদের অভিবাদন জানাতে গেলেন- তাদের মধ্যে আছেন জেনারেল অরোরা, ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব, ১০ হেলিকপ্টারের একটি বহর এলো। রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান দেখার জন্য একটি মিছিল সেদিকে রওনা হলো।

দিনরাতের বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত এয়ারপোর্টে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশিষ্টজনরা ততক্ষণে হাজির হয়েছেন। তাদের বরণ করতে নিয়াজিও সেখানে এসেছেন।

তিনি ইস্টার্ন ফ্রন্টের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সঙ্গে করমর্দন করলেন। মলিন হয়ে আসতে থাকা সূর্যালোকে, জিপে করে ঢাকা রেসকোর্সের দিকে এগোলেন- সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের বাহিনী নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করবে। একটি সাধারণ কাঠের টেবিলের চারদিকে ভারতীয় ও পাকিস্তানি বাহিনী নিজেদের অবস্থান নেয়। এখানেই আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর প্রদান করা হবে। নিয়াজি বসেছেন অরোরার পাশে, বিষণœ মুখমণ্ডল, তিনি নিশ্চুপ।

বাঙালিরা চিৎকার করে জয় বাংলা সেøাগান দিচ্ছে। নিয়াজির জন্য এটা অবমাননার ভয়ংকর মুহূর্ত। তিনি তার আবেগ ঢাকতে লড়ে যাচ্ছেন, ধরা দিতে রাজি নন।

কেউ একজন টাওয়ারের ওপর বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করতে ছুটে গেল।

নিয়াজি সই করলেন। অরোরার সঙ্গে হাত মেলাতে উঠে দাঁড়ালেন, হেঁটে হেঁটে তার গাড়ি পর্যন্ত গেলেন, ভারতীয় সৈন্যরা হাত ধরাধরি করে জনতাকে দূরে রাখতে তাকে কর্ডন করে রেখেছে।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল ‘টাইগার’ নিয়াজি, যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন- এভাবেই তার সমাপ্তি ঘটল।

প্যারিসের কমব্যাট : পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ

প্যারিসের বামঘেঁষা ইংরেজি দৈনিক কমব্যাট প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। শুরুতে প্রকাশনায় ও মুদ্রণে যথেষ্ট গোপনীয়তা অবলম্বন করা হতো। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু। এই পত্রিকার লেখকদের তালিকায় ছিলেন জাঁ পল সার্ত্রে, আদ্রে মালরো, র‌্যায়মন্ড ভ্যারন প্রমুখ। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ১৯৪৭-এর আগস্টে এটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকার অন্যতম কর্ণধার অঁরি স্মাজার আত্মহত্যা করে পত্রিকাটির বন্ধ হয়ে যাওয়া ত্বরান্বিত করেন। কমব্যাট বরাবরই গণমানুষের আন্দোলন, ছাত্রদের আন্দোলন, যেকোনো প্রগতিশীল আন্দোলন সমর্থন করে এসেছে।

জর্জ অ্যান্ডারসনের ‘পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ’ কমব্যাটে প্রকাশিত হয় ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭১। তার লেখাটি ভাষান্তরিত হলো :

আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিষয়ের বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয়ে ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করেননিÑ তারা সবাই বলেছেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হবে না, বড়জোর তিন সপ্তাহ যুদ্ধ চলতে পারে। যে দ্রুততার সঙ্গে পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভেঙে পড়েছে, এতে তাদের প্রায় সবাই বিস্মিত হয়েছেন- যা পেন্টাগন এবং ইউরোপের কিছুসংখ্যক জেনারেলের মতে, এটি ছিল এশিয়া মহাদেশের শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্তজ্ঞাপক যুদ্ধ। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার যে কটি ভুল, তার মধ্যে এটিই প্রথম নয়।

কেবল সৈন্যের সংখ্যাধিক্যের জোরে কিংবা আগ্নেয়াস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে ভারত একপক্ষকালের মধ্যে বিজয়ী হয়েছে, তা নয়। ভারতীয় দিক থেকে বিজয়ের নির্দেশক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিস্তারিত পরিকল্পনা, উন্নততর কৌশলগত ও রণবিজ্ঞানের সংগঠন, তিন বাহিনীর নিখুঁত পারস্পরিক সহযোগিতা। সোভিয়েত উপদেষ্টাদের দেওয়া কৌশলগত পরামর্শ গ্রহণে তৎপরতা এবং বাহিনীর শৃঙ্খলা ও হাইকমান্ডের প্রতি আস্থা।

এমনকি যুদ্ধপূর্ব বৈরিতা চলাকালে দিল্লি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে ভালোভাবে সংগঠিত করে, অস্ত্র সহায়তাও দিয়ে থাকতে পারে। মুক্তিবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের দখলদার সেনাবাহিনীকে অবিরাম লাঞ্ছিত করতে থাকে এবং তাদের জোরদার শক্তিমত্তার জায়গাগুলোকে তারা ধ্বংস করে, তাদের অস্ত্র ও পেট্রল ডিপোতে নাশকতা চালিয়ে তাদের মনোবল ভেঙে দেয়। ইসলামাবাদের অসংগঠিত অবস্থা একদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, জেনারেল আবদুল হাফিজ পীরজাদা ও জেনারেল আবদুল হামিদ খান এবং অন্যদিকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে বিরোধ ও বিসংবাদ প্ররোচিত করে; সবচেয়ে মারাত্মক দুর্বলতা ছিল ভণ্ড ও অযোগ্য জেনারেল স্টাফের কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দায়িত্ব তুলে দেওয়া।

অপারেশনের দায়িত্বে থাকা দুজন জেনারেলের দাবিকৃত যোগ্যতা হচ্ছে রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব। প্রথমজন জেনারেল টিক্কা খান, কাশ্মীর সেক্টরের কমান্ডার, মানুষ হত্যার জন্য যিনি ইতিমধ্যেই কুখ্যাত এবং ‘বালুচিস্তান এবং বাংলার কসাই’ হিসেবে পরিচিত। তার সামরিক যোগ্যতা নিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতির সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গোপনীয় প্রতিবেদনের কথা স্মরণ করা যেতে পেরে। তিনি লিখেছেন, ‘এই কর্মকর্তা উচ্চতর পদে দায়িত্ব পালনে নিজের অযোগ্যতা প্রমাণ করে ফেলেছেন।’

দ্বিতীয় জেনারেল হচ্ছেন ইয়াহিয়া খানের ডানহাত জেনারেল নিয়াজি, যদিও তাকে ‘টাইগার’ নামে অধস্তনরা চিহ্নিত করে থাকেন, কার্যত তিনি তার বন্ধু টিক্কা খানের চেয়ে বেশি কোনো কৌশলগত সমর্থন প্রদর্শন করতে পারেননি। নির্মম, নির্দয়, আহাম্মক এবং টিক্কা খানের কাজ থেকে পূর্ব বাংলার কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণে উৎসাহী নিয়াজি তার অধীনস্তদের সহিংস দৌরাত্ম্য প্রদর্শনে এবং লুটপাট করায় প্ররোচিত করেছেন। এ ধরনের অফিসার যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য বদনাম বয়ে এনেছে, তাদের বিপরীতে ভারতীয় বাহিনীর কৌশলী ও দক্ষ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা তাদের বিস্মিত করে হতবুদ্ধি করে উৎখাত করেছেন।