রোহিঙ্গারা স্থানীয় শ্রমবাজারে ভাগ বসাচ্ছে। তবে রোহিঙ্গারা আসার কারণে সেখানে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। ফলে কর্মের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। গত ১২ মাসে কক্সবাজারের স্থানীয় ৩২ শতাংশ শিশু স্কুলে অনুপস্থিত থেকেছে। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা আশপাশে কাজ করেছে। রোহিঙ্গরা সহিংসতার শিকার হয়ে এদেশে আশার কারণে পরিবেশসহ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতি হয়েছে।
সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় এসব ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করে ইয়েল ম্যাকমিলান সেন্টার, ইনোভেশন ফর প্রভার্টি অ্যাকশন এবং আইজিসি বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংস্থা। গতকাল মঙ্গলবার এই গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এটি উপস্থাপন করেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির প্রফেসর ড. আহমেদ মুশফিক মোবারক। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। আইজিসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ইমরান মতিনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার বরার্ট কারটন ডিকশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আসার আগে ২৮ শতাংশ রোহিঙ্গা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিল। ৬০ শতাংশ সহিংসতার অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেছে। এক-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা পরিবারের কেউ না কেউ মৃত্যুবরণ করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশ রোহিঙ্গা বলেছে, তাদের সামনে ধর্ষণ বা এ ধরনের ঘটনা ঘটতে তারা দেখেছে। চারভাগের একভাগ রোহিঙ্গা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১২ মাসে কক্সবাজারের স্থানীয় ৩২ শতাংশ শিশু স্কুলে অনুপস্থিত থেকেছে। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা আশপাশে কাজ করেছে। এছাড়া ২৬ শতাংশ রোহিঙ্গা কিশোর কোনো না কোনো কাজ করেছে। আরও বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের যে তেল, চাল বা পণ্যসামগ্রী সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয় তার একটি অংশ তারা স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করে। ফলে সেখানে এসব নিত্যপণ্যের দাম কম থাকে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আমরা মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। তাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহল অবগত আছে। আমরা এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান চাই। তবে এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভূমিকা আরও জোরালো হওয়া উচিত।
ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেন, রোহিঙ্গাদের সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে। রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়দের ওপর চাপ, নিরাপত্তা সমস্যা, শিবিরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, পরিবেশগত সমস্যা তো আছেই। সব কিছু মিলে রোহিঙ্গাদের দ্রুত শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, এই জরিপের মাধ্যমে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত ফলাফলগুলোকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বান্দরবান ও কক্সবাজারের শিবিরগুলোর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও তার আশপাশে অবস্থিত কমিউনিটির বাংলাদেশি পরিবারগুলো উভয়ের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৯ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে পরিচালিত এই জরিপে অংশগ্রহণ করা ৫ হাজার ২০টি পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে ডাটাসেট নির্মাণ করা হয়েছে। এই ডাটাসেটে ২৫ হাজারের বেশি ব্যক্তির তথ্য রয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়াদের কেউ কেউ বলেছেন, মিয়ানমারে একটি যুবতী মেয়ে দেখলে মগরা এসে তুলে নিয়ে যেত এবং ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হতো। একজন বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার সময় তার চোখের সামনেই একটি নাতি পাহার থেকে নিচে পড়ে যায়। ওনার মেয়েজামাই মারা যান। তিনি যে কীভাবে বাংলাদেশে এসেছেন তা বলতে পারেন না। আরেকজন বলেন, সহিংসতার সময় মিলিটারিরা খুব মারধর করে আমার বুকে জখম করে দিয়েছে।