দেশের হাওর অঞ্চলের শিক্ষা পরিস্থিতির উন্নতিতে ১২টি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে ৯৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে আসলেই শিক্ষার হার বাড়বে কিনা, তা নিয়ে করা হয়নি সম্ভাব্যতা যাচাই। যদিও সরকারি খাতে ২৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে ব্যয়-সম্পন্ন সব প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ করা হলে অর্থ অপচয়ের শঙ্কা থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা রয়েছে। তবু দ্রুত প্রকল্পটি অনুমোদনের বিষয় নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অধিশাখার উপপ্রধান মুহাম্মদ জহুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে গতকাল মোবাইলে বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত না। তবে এই প্রকল্প কেন নেওয়া হচ্ছে এটা বলতে পারব না। বিস্তারিত জানার জন্য তিনি তার সহকর্মী উপপ্রধান মোল্লা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। আনিসুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। ওপর মহলের নির্দেশে এই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা শিক্ষা বিভাগের স্থানীয় অফিস (মাঠ পর্যায়ের) থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।’ ওপর মহল বলতে কাকে বোঝাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা বলতে পারবে না। আমি আদিষ্ট হয়ে প্রকল্প তৈরি সংক্রান্ত কাজ করেছি।’
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার শিক্ষার মান বাড়াতে এ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রধিকার দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তবে তা বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অপ্রতুল। বিশেষ করে দেশের হাওর অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানের চেয়ে অত্যন্ত নাজুক। এজন্য ‘হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অনুমোদন পেলে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।
ডিপিপি থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলের প্রায় ১২টি উপজেলায় এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। যদিও দেশব্যাপী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩ হাজারটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১ হাজারটি দাখিল/ফাজিল/আলিম মাদ্রাসা, এক হাজার ৫০০টি বেসরকারি মহাবিদ্যালয়ের ভবনসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে একাধিক প্রকল্প চলমান আছে। কিন্তু হাওর এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আলাদা কোনো কার্যক্রম নেই। এটি প্রয়োজন। কারণ কিছু বিশেষ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।
প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের শিক্ষা উইংয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতি অনুযায়ী ২৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে ব্যয় সম্পন্ন সব প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। অথচ আলোচ্য এত বড় প্রকল্প তৈরির আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। এ প্রকল্পের ড়্গেত্রে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলে প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন, সুফলের সম্ভাবনা ইত্যাদি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তাই প্রকল্পটি গ্রহণের আগে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করা প্রয়োজন। নইলে অর্থ অপচয় হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। তদবিরের কারণে সঠিকভাবে প্রকল্প স্কোটিংও করা যাচ্ছে না।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পটি গ্রহণের পটভূমিসহ তথ্যভিত্তিক যৌক্তিকতা অত্যন্ত দুর্বল। ডিপিপিতে তথ্যভিত্তিক বিশেস্নষণ প্রমাণ হয়নি। প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভূমি-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিদ্যমান অ্যাকাডেমিক, প্রশাসনিক, আবাসিক অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যবহার সম্পর্কিত তথ্য ও প্রস্তাবিত ভৌত অবকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য চাহিদা কীসের ভিত্তিতে নিরূপণ করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সভায় হাওর ও জলাভূমি এলাকায় প্রকল্প গ্রহণে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের সুপারিশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ প্রকল্পটির ড়্গেত্রে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে কি না, তা সভাকে অবহিত করতে হবে। এ ছাড়া হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রণীত হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনায় এ ধরনের প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে কি না, সেটাও জানানো হয়নি পরিকল্পনা কমিশনকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হুসেইন বলেন, ‘হাওরের উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে প্রকৃত সুফল মিলছে না, যার জন্য প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই জরুরি।’