ঋণের বোঝা বাড়ছেই

চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা, সঞ্চয়পত্র ও বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকা। গত সাড়ে তিন বছরে বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া সরকারের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নাগরিকদের মাথাপিছু ঋণের বোঝা। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরা হলে এখন মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৭ হাজার ৬১১ টাকা। যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও ছিল ৩৪ হাজার ৫৩ টাকা। এদিকে, একমাত্র প্রবাসী আয় ছাড়া দেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই এখন নিম্নমুখী। রপ্তানি আয়ে কোনো প্রবৃদ্ধিই নেই, আমদানিতেও একই অবস্থা। রাজস্ব আয়ে চলছে বড় ধরনের ঘাটতি। বেসরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা স্থবিরতার কোনো অবসান হয়নি। বরং ব্যাংক থেকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ অনেক কমে গেছে। এর প্রভাবে মূলধনী-যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে কম, নিষ্পত্তিও কম। শেয়ারবাজারে কোনোভাবেই অচলাবস্থা কাটাতে না পারায় এখনো তা পতনের ধারাতেই আছে। সব মিলিয়ে বলা যায় দেশের অর্থনীতিতে কোনো সুখবর নেই।

এ পরিস্থিতিতে, বিপুল পরিমাণ ঋণ করেই সরকারকে বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ নানা খাতের ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় আশঙ্কাজনক কম হওয়া সরকারের ঋণের অন্যতম বড় কারণ। চলতি অর্থবছর বাজেটের আকার প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। এদিকে, দেখা যাচ্ছে গোটা অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে যে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, অর্থবছর শুরুর মাত্র পাঁচ মাসেই তার ৯০ শতাংশ নিয়ে ফেলেছে। রাজস্ব আয়ের প্রধান তিন খাতেই আদায় কমেছে। তিনটি খাত হলো– আমদানি ও রপ্তানি পর্যায়ে শুল্ককর, স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট এবং আয়কর। চলতি অর্থবছর থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হলো। কিন্তু দীর্ঘ প্রস্তুতির পর চালু হলেও দেখা যাচ্ছে, অনেক কিছুই ঠিকঠাক না থাকায় ভ্যাট আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কমে গেছে। বিশেস্নষকরা বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেখানে জাতীয় আয়ের ২০ শতাংশ রাজস্ব আয় করতে পারে, সেখানে বাংলাদেশ কেন ৯ শতাংশে পড়ে থাকবে? সরকারকে অবশ্যই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।

সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। গত অক্টোবরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ১০ শতাংশে, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিমœ। সরকারের অব্যাহত ঋণ গ্রহণের ফলে সুদহারও বেড়ে যাচ্ছে। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা বেড়ে এখন প্রায় ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে আমদানি ব্যয়েও প্রবৃদ্ধি হয়নি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তা আড়াই শতাংশ কমেছে। এ সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তি কমেছে সাড়ে ১২ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামালে কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রপ্তানি ও আমদানি কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মন্দার কারণেই ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমে গেছে আর এরই প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদবাবদ সরকারকে ৫৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১১ শতাংশ। সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়ায় বাজেটে চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস রপ্তানি খাত। এ খাতেই এখন প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সাড়ে ১২ শতাংশ কম। দেশে সর্বশেষ ২০০১-০২ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। উল্লেখ্য, রপ্তানি আয়ের ৮৫ ভাগেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এরপর বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসী আয়। আর এখন অর্থনীতিতে একমাত্র সুখবরটি এসেছে এই প্রবাসী আয়ের সূচকেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে নিম্নগতি নিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে মোট দেশজ উৎপাদন বা ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখবে। একইসঙ্গে এই প্রশ্নও জরুরি যে, বর্তমান ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ জিডিপি সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন শীর্ষ ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হয়েছে? একদিকে, ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা ঋণখেলাপি এবং আরও প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা অবলোপন করা ঋণ অনাদায়ী; অন্যদিকে, সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকা। অনাদায়ী ঋণ আদায় করা আর সরকারের ঋণ কমাতে না পারলে অর্থনীতিতে কোনো সুখবর আসবে কীভাবে?