সংকটে পেঁয়াজসংযমী ভোক্তা

বানু বেগম রাজধানীর মালিবাগে থাকেন। বিভিন্ন বাসা-মেসে রান্না করে সংসার চালান। গত সেপ্টেম্বরে সরকারের বিপণন সংস্থার (টিসিবি) ট্রাক থেকে তিনি ৪৫ টাকা দরে দুই কেজি পেঁয়াজ কেনেন। তা থেকে কিছু মেয়েকেও দেন। দাম অস্বাভাবিক বাড়ায় আর পেঁয়াজ কেনেননি তিনি। পেঁয়াজ ছাড়াই রান্না সারেন। তেল আগের চেয়ে একটু বেশি লাগে। ধনেপাতা দিয়েও কাজ চলে। এভাবেই চলছে বানুর রান্নাবান্না। তিনি বলেন, ‘পেঁয়াজ এখন বড়লোকের খাবার।’ শুধু বানু বেগমের মতো নিমœ আয়ের মানুষ নন, নিম্মমধ্যবিত্তদের অনেকেই পেঁয়াজ-সংকটকালে ব্যবহারে সংযমী হয়েছেন। রাজধানীর দক্ষিণখানের বাসিন্দা মনিরা জামান। স্বামীর জুতার শোরুম আছে। মনিরা পেঁয়াজ ব্যবহার আগের চেয়ে চার ভাগের এক ভাগে নামিয়ে এনেছেন। ব্যবহার করছেন পেঁয়াজের পাতা। তিনি বলেন, ‘রান্নায় পেঁয়াজ করতেই হবে এমন না। শুধু মাংসে প্রয়োজনমতো দিই। অন্য কিছুতে পেঁয়াজ পাতা দিয়ে কাজ সারি। দাম ৫০ টাকার নিচে নামলে আবার আগের মতো ব্যবহার করব।’ রাজধানীর কাঁঠালবাগানের বিসমিল্লাহ রেস্তোরাঁয় আগে সিঙাড়া-সমুচার সঙ্গে নিয়মিত অল্প সালাদ ও পেঁয়াজ দেওয়া হতো। কেজি ১০০ টাকার বেশি হওয়ার পর পেঁয়াজ না দিয়ে মুলা-পেঁপে কুচি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ডিম ভাজিতে সামান্য পেঁয়াজের সঙ্গে পেঁপে কুচি দিয়ে কাজ সারা হচ্ছে। পেঁয়াজের এই সংকটকালে এমন চিত্র সারা দেশের। নিরুপায় ভোক্তারা এখন উচ্চবাচ্য না করে বরং মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

আবদুল মাজেদ রাজধানীর শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহসভাপতি। পেঁয়াজ-সংকট নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে চাহিদা। অন্য বছর এ সময় শ্যামবাজারে প্রতিদিন ১ হাজার টনেরও বেশি পেঁয়াজ বিক্রি হতো। কিন্তু এখন দেড়-দুই শ টন বিক্রি হচ্ছে। এতে ব্যবসায়িকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমাদের তো খরচ আছে। কিন্তু বেশির ভাগ দোকানে এখন আর বেচাকেনা নেই। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই বাজার স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।’

পেঁয়াজের বর্তমান চাহিদা কত তার সঠিক তথ্য নেই কারও কাছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ধারণা, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৫ লাখ টন। চাহিদা বেশি থাকে জানুয়ারি-এপ্রিল ও রমজান মাসে। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর-মধ্য ডিসেম্বরে চাহিদা কিছুটা কমে আসে। তবে কখনই এর পরিমাণ দেড় লাখ টনের নিচে নামে না। কিন্তু চলতি বছর অস্বাভাবিক দামের কারণে বর্তমানে দৈনিক পেঁয়াজের চাহিদা ২ হাজার টনে নেমে এসেছে, যা আগে ছিল ৬ হাজার টনেরও বেশি।

দেশে ৮৪ দিন ধরে পেঁয়াজ-বাজার অস্থিতিশীল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য টনপ্রতি ৮৫২ ডলার নির্ধারণ করে। এরপরই পণ্যটির দাম বাড়তে থাকে। অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়ে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে দেশটি পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। এরপর দেশে পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা ছাড়ায়। ৩১ অক্টোবর দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশি পেঁয়াজের কেজি ১৬০ ও আমদানি পেঁয়াজ ১৪০ টাকা হয়। প্রশাসনের তৎপরতা ও সরকার মূল্য নির্ধারণ করে দিলে দাম কিছুটা কমে। তবে ৯ নভেম্বর মজুদদাররা জোটবদ্ধ হয়ে পেঁয়াজ সরবরাহ কমিয়ে দেন। এতে ফের দাম বাড়তে থাকে। ১৩ নভেম্বর দেশি পেঁয়াজ ১৯০ ও আমদানির ১৭০, ১৪ নভেম্বর দেশি পেঁয়াজ ২৩০ ও আমদানি ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। ১৫ নভেম্বর বিশ্বের সর্বোচ্চ দাম ২৬০ টাকা কেজি দরে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়, যা ১৪ সেপ্টেম্বরের চেয়ে ৫ গুণেরও বেশি।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেশির ভাগ দোকানে গতকাল রবিবার মিসর ও চীনের পেঁয়াজ ছিল বেশি। দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ ছিল খুবই কম। চীনা পেঁয়াজ আকারে বড় হওয়ায় অনেকের আগ্রহ ছিল। এ বাজার সাধারণত পাঁচ কেজির নিচে পেঁয়াজ বিক্রি না হলেও গতকাল আধা কেজিও বিক্রি হয়। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গতকাল দেশি পেঁয়াজের কেজি ২৬০, মিয়ানমার ২৪০, দেশি নতুন ১৭০-১৯০, মিসর ১৪০-১৫০ ও চীনা পেঁয়াজ ১১০-১৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, এক বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৪৫০-৫০০ গুণ। যদিও বাস্তবে তা আরও বেশি।

এদিকে পেঁয়াজের বাড়তি দামের কারণে অনেক কৃষক অপরিপক্ব পেঁয়াজ তুলে বাজারে আনছেন। যদিও এসব পেঁয়াজের কেজি এখনো ১৭০-১৯০ টাকা, যা আগের বছর ছিল ৫০-৬০ টাকার মধ্যে। বিভন্ন অঞ্চলের কয়েকজন কৃষক জানান, এ বছর বন্যার পানি নামতে বেশি দেরি হওয়ায় পেঁয়াজ বুনতে দেরি হয়েছে। সে হিসেবে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এসব আগাম জাতের পেঁয়াজ বাজারে আসার কথা। কিন্তু এখন এক কেজি পেঁয়াজ তারা পাইকারিতে এক শ টাকার ওপরে বিক্রি করতে পারছেন; যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তিন গুণ বা এর বেশি। এ জন্য বাড়তি লাভে আরও এক মাস আগে থেকেই তারা এসব পেঁয়াজ তোলা শুরু করেছেন। তবে এসব পেঁয়াজ অপরিপক্ব থাকায় আগামী মৌসুমে এর প্রভাব পড়বে বলে স্বীকার করেছন ওই সব কৃষকও।

কৃষকের আগাম পেঁয়াজ তোলায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গত শুক্রবার কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, পেঁয়াজ এখনো বড় হয়নি। আরও অনেক বড় হওয়া দরকার। কিন্তু কৃষক ছোট ছোট পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছেন। আমরা এটা নিয়ে শঙ্কিত আছি। জানুয়ারি মাসে কী উপায় হবে? পেঁয়াজের উৎপাদন তো কমে যাবে।