আর্থিক সেবা খাতের পরিস্থিতি

সাম্প্রতিককালে দেশে ব্যাংক ও ব্যাংকের শাখা অনেক বেড়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়েরও প্রসার ঘটেছে। আর্থিক সেবা প্রদানের হারও বেড়েছে। তবে দেশের মোট জনসংখ্যা ও পরিধির তুলনায় আর্থিক সেবা প্রদানের এই হার পর্যাপ্ত নয়। দেশে পাঁচ হাজারের বেশি অধিক ইউনিয়নের তুলনায় ৫৫টি ব্যাংকের মোট নয় হাজার শাখা পর্যাপ্ত নয়। শহরকেন্দ্রিক ব্যাংকের শাখা বেশি হওয়ায় অনেক ইউনিয়নে কোনো ব্যাংকের শাখা নেই। প্রতিটি ইউনিয়নে ৭০০-৮০০ পরিবার বাস করলেও একটি বা দুটির বেশি ব্যাংকের সেবা তারা পায় না। বাংলাদেশে সেবাপ্রাপ্তির ব্যয়ও অনেক বেশি। আওতা অধিভুক্তি অন্তর্ভুক্তির বিচারে বাংলাদেশের ব্যাংকিং বা  আর্থিক সেবার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে এ কথা বলা বাহুল্য। 

ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে সম্পৃক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিধি কিছুটা বাড়লেও ব্যাংকিং কাঠামোয় মানুষকে সেবা দেওয়া পুরোপুরি সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে সব আর্থিক খাতকে ব্যাংকিং কাঠামোয় সেবা বাড়াতে মনোযোগী হওয়া দরকার। এতো অবকাঠামোগত বিষয়। আর্থিক সেবা খাতের কার্যকারিতার আরেকটি অন্যতম শর্ত হলো পারস্পরিক বিশ্বাস বা আস্থার অনিবার্যতা। ব্যাংকিং খাত মূলত গ্রাহকের আস্থা ও তাদেরে প্রদত্ত পরিষেবার গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, বিকশিত হয়, ফলবান হয়। আস্থায় চিড় ধরলে মানুষ ব্যাংক ব্যবস্থা তথা আর্থিক খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে যে কোনো সবল অর্থনীতিরও বিকাশ, বিশেষ করে সঞ্চয় বিনিয়োগ বা পুঁজি সৃষ্টি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

এটা সত্য যে ক্ষুদ্রঋণসহ অন্যান্য আর্থিক খাত মিলে দেশে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ আর্থিক সেবা গ্রহণ করছে। তবে অন্য আর্থিক খাতগুলোর সেবা ব্যাংকিং খাতের মতো না হওয়ায় মানুষ সঠিক সেবা পায় না। ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় একজন ঋণগ্রহীতাকে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হয়। ২৭ শতাংশ সুদ দিয়ে একজন মানুষের পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা করে এক বছরের মধ্যে তা পরিশোধ করা কষ্টকর ব্যাপার। এজন্য আর্থিক সেবা প্রদানের সব খাতকে ব্যাংকিং কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো অর্থায়নের প্রবৃদ্ধি। ঋণ, সঞ্চয় ও বীমার মাধ্যমে আর্থিক সেবা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থায়নের প্রবৃদ্ধি হয়ে থাকে। দেশে ব্যাংকের সংখ্যা ও শাখা বাড়লেও ব্যাংকের সঙ্গে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা না বাড়াতে পারলে কাি•ক্ষত সফলতা মিলবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং, পথশিশুদের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং ও ১০ টাকায় কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলার মাধ্যমে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিলেও তার সফলতা সময় ও শর্তসাপেক্ষ হয়ে পড়ছে। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণসেবা নেয়, সঞ্চয় ও অন্যান্য সেবাসহ যা ৫৪ শতাংশ। এর মধ্যে অধিকাংশই পেশাজীবী, উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত। তবে গ্রামীণ ব্যাংকসহ ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ অনেক বেড়েছে।

ক্ষুদ্রঋণে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে। তবে ক্ষুদ্রঋণের কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে তা দিয়ে ব্যবসা করে এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। সে কারণে ক্ষুদ্রঋণের পরিমাণ ও তা পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি বহুদিন থেকেই জোরালো হচ্ছে।

অর্থায়নের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন কখনো প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে না। অর্থায়নের মাধ্যমে সর্বজনের জীবনমান উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে। কতিপয়ের হাতে হঠাৎ করে জমে ওঠা অধিক সম্পদ সৌভাগ্যকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি দেখালেই বা হলেই অর্থনীতি মোটা তাজা হয়েছে বলা যাবে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারায় নিয়ে আসার জন্য যেকোনো অর্থায়ন বাড়াতে হবে, করতে হবে। এক্ষেত্রে খোদ অর্থায়নকারী এবং ঋণগ্রহীতাদের কাজের ক্ষেত্র, ব্যবসা প্রসারের কৌশল ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক সেবায় নতুন নতুন পণ্য অর্থাৎ সেবার বৈচিত্রায়নে নজর দেওয়া দরকার। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, আর্থিকভাবে সচ্ছল অঞ্চলে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা বেশি এবং অপেক্ষাকৃত দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় তা আরও কম। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোকে নতুন গ্রাহক বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে দৃষ্টি রাখতে হবে ব্যাংকের সেবা নেন না, এমন গ্রাহকদের প্রতি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিস্তরতি ঘটাতে হবে অপেক্ষাকৃত দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায়। আর্থিক খাতের সুফল ও সংশ্লিষ্ট সেবা সমাজের পিছিয়ে পড়াদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সম্পদ বণ্টন থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতে অর্থনীতির গতি বাড়বে, যা প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।

এ প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অনাদায়ী ও খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। ফলে মূলধন ঘাটতিসহ নানামুখী সমস্যায় পড়ছে সোনালী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-বিডিবিএলসহ সরকারি মালিকানার সব ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ব্যাংকগুলো শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৩ ভাগ। রাষ্ট্রীয় মালিকানার ৪ বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি থেকে যে অর্থ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথম তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রার ২৫ ভাগ আদায়ের কথা ছিল। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৩ ভাগ। আর অন্য ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে প্রায় সাত  হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে এর মাত্র ১১ দশমিক ২৫ ভাগ। ব্যাংকগুলোর লোকসানি শাখা মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২৯৪টিতে গিয়ে ঠেকেছে বলে একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০১৬ সাল শেষে চার ব্যাংকের লোকসানি শাখা ছিল মাত্র ১৫৬টি। মার্চে সোনালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা বেড়ে হয়েছে ৮৭টি। গত ডিসেম্বরে ছিল ৪৩টি। রূপালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১৫টি থেকে বেড়ে ৪৫টিতে গিয়ে ঠেকেছে।

এসব ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে করা পারফরম্যান্স কন্ট্রাক্ট-এ দেওয়া প্রতিশ্রুতিও অর্জন করতে পারছে না। ফলে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকগুলো এক-চতুর্থাংশ লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করতে পারেনি। পারফরম্যান্স কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী সোনালী ব্যাংককে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ থেকে নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া ছিল দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বিবেচ্য সময়ে আদায় হয়েছিল মাত্র ৬২০ কোটি টাকা। একইভাবে রূপালী ব্যাংককে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল ২৮০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় করেছে মাত্র ৩০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। বেসিক ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছিল মাত্র ১৬৮ কোটি ৪৩ লাখ। বিডিবিএলের ৯০ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয় মাত্র ১০ কোটি ৩ লাখ টাকা।

ব্যাংকগুলোর এ অবস্থার জন্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, দুর্নীতি ও অনিয়মই দায়ী। যেসব ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি রয়েছে তার পুরোটাই হয়েছে লুটপাটের কারণে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক একক গ্রাহককে মোট মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারে না। তবে নিয়ম লঙ্ঘন করে এসব ব্যাংক ১৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক দিয়েছে ২টি প্রতিষ্ঠানকে। রূপালী ব্যাংক দিয়েছে ৪টি প্রতিষ্ঠানকে।

অর্থঋণ আদালতে মামলায় আটকে আছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ২১ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মার্চভিত্তিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ চার ব্যাংকের ১৬ হাজার ৫৯০টি মামলার বিপরীতে এই টাকাগুলো আটকে আছে। বছর দেড়েক  আগে  অর্থঋণ আদালতে ১৬ হাজার ৩৯১টি মামলায় আটকে ছিল ২১ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে সোনালী ব্যাংকের। এদিকে গত জানুয়ারি-মার্চ সময়ে মাত্র ২৭৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। যার বিপরীতে ১৯৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। আগের তিন মাসে ২৪২টি মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছিল ৩৪৯ কোটি টাকা।

আর্থিক খাতের বিদ্যমান হালচালকে সাময়িক কিংবা নিরবচ্ছিন্ন ভাবা যাবে না। দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা পরস্পর প্রযুক্ত সমস্যারই বহিঃপ্রকাশ। নানামুখী প্রয়াস প্রচেষ্টায় সবার সুচিিন্তত, সজাগ ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে।

লেখক

উন্নয়ন অর্থনীতি বিশেস্নষক ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর