ভারতের পার্লামেন্টে যে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) পাস হয়েছে, রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ সেই বিলে স্বাক্ষর করেছেন গত বৃহস্পতিবার রাতে। এর মাধ্যমে ওই বিলটি এখন আইনে পরিণত হলো। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান নাগরিকরা সংসদে পাস হওয়া এই আইনের আওতায় এখন ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। কিন্তু এতে মুসলমানদের বাদ রাখা হয়েছে। গত সোমবার (৯ ডিসেম্বর) ও বুধবার (১১ ডিসেম্বর) পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিজেপি আনীত সংবিধান সংশোধনী বিলটি পাস হয়। এর মধ্য দিয়ে ভারতে এখন বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই আইনকে ‘মুসলমানবিরোধী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভিন্ন দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে। আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। তথাকথিত শরণার্থীদের স্বীকৃতি বাতিল ও এই অঞ্চলকে সিএবিমুক্ত করার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে তারা। রাষ্ট্রপতির সম্মতি দেওয়া আইন অনুযায়ী ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদের অবৈধ শরণার্থী হিসেবে গণ্য করা হবে না এবং তাদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। বিজেপি সরকার বলছে, এই আইনের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোতে তাদের ভাষায় নিপীড়নের শিকার হওয়া মানুষদের রক্ষা করা হবে। তবে বিরোধী দলগুলোর দাবি মুসলমানদের রক্ষার প্রস্তাব না দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই আইনটিতে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে হেয় করা হয়েছে।
কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এই আইনটি প্রণয়ন করলেও, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি বিজেপিশাসিত রাজ্যে এই আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। আসামের পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে কারফিউ উপেক্ষা করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের গুলিতে পাঁচজনের নিহত হওয়ার সংবাদও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। শুধু তাই নয়, আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনারের গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীরা হাইকমিশন থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরে দুটি পথনির্দেশক চিহ্নও ভেঙে ফেলে। বাংলাদেশ ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু যা আমাদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করেছে, তা হচ্ছে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিনই অনেক মানুষ ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এদের সবাই ভারতে দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে বসবাস করে আসছিলেন। বিবিসির বাংলার প্রতিনিধিকে তারা বলেছেন, পরিস্থিতি ভালো না থাকায় তারা বাংলাদেশে এসেছেন। তবে এটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি এরা আদৌ বাংলাদেশি কি না?
নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের পরিস্থিতি পুরো পাল্টে যায়। বিশেষ করে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর কাশ্মীরে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ৩৭০ অনুচ্ছেদ ছিল কাশ্মীরিদের জন্য আলাদা একটা রক্ষাকবচ। এই ধারা বলে কাশ্মীরিরা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন। সেই বিশেষ সুযোগকে এখন বাতিল করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, লাদাখকে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে আলাদা করা হয়েছে। লাদাখ এখন কেন্দ্রশাসিত একটি অঞ্চল। গেল আগস্ট মাসে কেন্দ্র সরকার যখন কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদটি বাতিল করে, তখনই মোদি সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বলা হচ্ছিল, মোদি সরকার ভারতকে একটি হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। এরপরই সরকার সংবিধানের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি পাস করল।
ভারতের নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বিষয়টি সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট ১৯৫৫-এর সঙ্গে জড়িত। পরে ১৯৮৬ সালে, ১৯৯২ সালে, ২০০৩, ২০০৫ ও ২০১৫ সালে তাতে কিছু কিছু পরিবর্তন আনা হয়। তবে এবার যে পরিবর্তন আনা হলো, তা মূল কাঠামোকে পরিপূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। এখন মুসলমান ধর্মাবলম্বী কেউ ভারতের নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারবেন না। অথচ হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বীরা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং তাদের নাগরিকত্বের আবেদন বিবেচনা করা হবে। সংবিধানের নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে, ভারত সরকার মূলত ইসলাম ধর্মের সঙ্গে অন্যান্য ধর্মের একটা ব্যবধান তৈরি করল। প্রশ্ন হচ্ছেÑ এই সংশোধনী ভারতের সংবিধানের পরিপন্থী কি-না?
সংবিধানের অনেকগুলো ধারা ও প্রস্তাবনা (Preamble) সংবিধানের এই সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবিধান পরিপন্থীও বটে। ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর আর্টিকেলটি এই সংশোধনীর পরিপন্থী। এই আর্টিকেলে সমতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিভক্তি আনা যাবে না, সবাই সমান। এখানে বলা আছে ‘ The state shall not deny to any person equility before law or the laws within the territory of Inida।’ রাষ্ট্র কাউকে তার সম-অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। কিন্তু সংশোধনী এনে নাগরিকত্বের প্রশ্নের সম-অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে। আমরা সংবিধানের প্রস্তাবনার কথাও উল্লেখ করতে পারি।
প্রস্তাবনায় ভারত সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘a welfare state committed to secure justice, liberty and equility for the people and for promoting fraternity, dignity of the individuad, and unity and integrity of the nation.’ এখানে unity ও integrity’র কথা, অর্থাৎ ঐক্য ও সংহতির কথা বলা হয়েছে। এই সংশোধনী ঐক্য ও সংহতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা সংবিধানের আরও কয়েকটি ধারা উল্লেখ করব। যেসব সংবিধানের ৫ নম্বর ধারা, যেখানে বলা হয়েছে ভারত হবে একটি Secular state ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু সংবিধানের নাগরিকত্ব সংশোধনী ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পরিপন্থী। এই ধারায় প্রতিটি ধর্মের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংবিধান সংশোধনীতে ইসলাম ধর্মের সম-স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের সঙ্গে অন্যান্য ধর্মের পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যা সংবিধানের পরিপন্থী। সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে ছয়টি মৌলিক মানবাধিকারের (Fundamental Rights) কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র এই মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেবে। এখানে ৩ নম্বর উপধারায় আছে Right against Exploitation, ৪ নম্বর উপধারায় আছে Right to freedom of Religion-এর কথা। এখন একজন নাগরিক, যিনি ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবেন, কিন্তু তিনি মুসলমান হলে তা করতে পারবেন না। কিন্তু সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ তাকে সেই অধিকার দিয়েছে। সুতরাং, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যে রিট হয়েছে, তা যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই ভিজয়ন বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল সংবিধানের পরিপন্থী। সুতরাং কেরালাতে এটা কার্যকর হবে না বলেও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এনআরসি রুখতে গণ-আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। আসামে এনআরসি হলেও পশ্চিমবঙ্গে কোনো এনআরসি হবে না এটা জানাতেও তিনি ভোলেননি। পাঞ্জাব সরকারও এই আইন প্রত্যাখ্যান করেছে।
স্পষ্টতই এই এনআরসি কিংবা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ভারতকে বিভক্ত করে ফেলেছে। মজার ব্যাপার, আসাম ও ত্রিপুরাতে বিজেপি
নেতৃত্বাধীন সরকার রয়েছে। মণিপুরেও রয়েছে বিজেপি সরকার। তাহলে এই অঞ্চলগুলো অশান্ত কেন? এর কারণ হচ্ছেÑ এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ মনে করেন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস হওয়ার ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যাপকসংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পুনর্বাসন হবে। বাংলা ভাষাভাষীদের সংখ্যা এতে করে বৃদ্ধি পাবে। এই অঞ্চলে আদিবাসীদের যে জমিজমা ছিল, তা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা কিনে নেবে। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্য দিয়ে উপজাতীয়রা এই অঞ্চলে যে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেতেন, তা বাতিল হয়ে যাবে। আসামের ক্ষেত্রে ১৯৮৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ও ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত ‘আসাম মুভমেন্ট’-এর সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেই সমঝোতা মুখ থুবড়ে পড়বে। এ অঞ্চলে বাংলাভাষীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এ অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট হবে। তাদের আপত্তিটা এ কারণেই।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনটি ভারতকে এখন কোথায় নিয়ে যাবে বলা মুশকিল। তবে স্পষ্টতই এই আইন ভারতকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছে। আন্তর্জাতিকভাবেও ভারতকে বিতর্কিত করেছে। ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো থাকলেও, সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করার জন্য মোদি সরকারকে বার্তা দিয়েছে আমেরিকা (সাউথ এশিয়ান মনিটির, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯)। শুরু থেকেই এই বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন কয়েকজন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত কমিশনও বলছে, নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মানদণ্ড বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক। অমিত শাহসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো উচিত বলে মার্কিন বিদেশ দপ্তরের কাছে তারা সুপারিশও করেছে (একই সূত্র)। ইতিমধ্যে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সিনজো আবে তার ভারত সফর স্থগিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে ভারত বহির্বিশে^ বড় ধরনের একটি ইমেজ সংকটের মুখে পড়ল। এই ইমেজ সংকট একুশ শতকে ভারতকে কোথায় নিয়ে যায় সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক
প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক